রমজানের আগে থেকেই বাড়তি চাহিদার নামে প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়, যা রোজার শুরুর দিকেও বজায় ছিল। পরবর্তী সময়ে বাজারদর কিছুটা স্থিতিশীল হলেও বর্তমানে আবারো দাম বাড়তির দিকে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ আশপাশের কয়েকটি মুরগি ও গরুর মাংসের বাজারে গত সপ্তাহের তুলনায় উল্লেখযোগ্য দাম বেড়েছে, কেজিপ্রতি ৪০-৫০ টাকা। এতে চলমান উচ্চ মূল্যম্ফীতির সময়ে নতুন করে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে, যা একেবারেই কাম্য নয়। সরকারের উচিত বাজার ব্যবস্থাপনায় বিশেষভাবে নজর দেয়া।

এক সপ্তাহের ব্যবধানে দামের এ উল্লম্ফনের পেছনেও রয়েছে আসন্ন ঈদুল ফিতর ঘিরে তৈরি বাড়তি চাহিদা। যদিও বিক্রেতারা দাবি করছেন চাহিদার পাশাপাশি দাম বাড়ার আরেকটি কারণ হলো সরবরাহ সংকট। রমজানের আগে বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার পেছনেও সরবরাহ সংকটের কথা উল্লেখ করেছিলেন বিক্রেতারা। তবে বাস্তবতা হলো সেই সময়, অর্থাৎ গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তৎকালীন বাণিজ্য উপদেষ্টার বরাতে জানা গিয়েছিল রমজান উপলক্ষে পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। এমনকি বিগত সময়ের তুলনায় রমজান উপলক্ষে আমদানিও প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি করা হয়েছিল। সম্প্রতি বিএনপি সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীও এক সংবাদ সম্মেলনে পর্যাপ্ত মজুদ থাকার দাবি করেছেন। এর পরও মাংসের মতো প্রয়োজনীয় আমিষের বাজারদর কেন বাড়ছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। আর এর উত্তর অনুসন্ধানে বাজার অব্যবস্থাপনাই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সরবরাহ সংকট হোক বা বাড়তি চাহিদার সুযোগ কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা লাভ, যে কারণেই দাম বাড়ুক না কেন, উভয়ই মূলত অদক্ষ বাজার ব্যবস্থাপনাকেই নির্দেশ করে।

বাজার ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো চাহিদামাফিক সরবরাহ শৃঙ্খলে জোগান নিশ্চিত করা। এজন্য প্রয়োজন যথাসময়ে পর্যাপ্ত উৎপাদন ও আমদানি। সেই সঙ্গে কেউ যেন সরবরাহ শৃঙ্খলে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে সেটিও নিশ্চিত করা। এটি করতে প্রয়োজন তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা। এক্ষেত্রে দুর্বলতা থাকলে পুরো বাজার ব্যবস্থাপনা অকার্যকর হয়ে পড়ে। বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে শক্তিশালী বাজার তদারকি কাঠামো। এর অভাবে অনেক ক্ষেত্রে বাজারে বিশৃঙ্খলা বাড়ে। সিন্ডিকেট শক্তিশালী হয়। অসাধু ব্যবসায়ীরা দামকে প্রভাবিত করতে পারে। এতে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের নিত্যপণ্যের দামে অস্বাভাবিক ব্যবধান তৈরি হয়। অন্যদিকে কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবও বাজারে অস্থিরতার একটি বড় কারণ। উৎপাদক পর্যায়ে দাম কম থাকলেও ভোক্তা পর্যায়ে তা কয়েক গুণ বেশি হয়ে যায়। এতে কৃষক যেমন ন্যায্য দাম পান না, তেমনি ভোক্তাকেও অতিরিক্ত দাম দিতে হয়। ফলে পুরো বাজার ব্যবস্থাই অকার্যকর ও অস্বচ্ছ হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে পুরোপুরি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন নজরদারি জোরদার করা।

রমজান শুরুর আগে দেশে জাতীয় নির্বাচনের আমেজ ছিল। সেই সময়ও তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে বাজারদর নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। আবার রমজান শুরু হলে তখন সবে নবনির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেয়। সংগত কারণে সেই সময় বাজার তদারকি কার্যক্রম শিথিল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু এ শিথিলতা বর্তমানে গ্রহণযোগ্য নয়। যেহেতু ক’দিন পরই ঈদুল ফিতর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তাই বাজারদর স্থিতিশীল রাখতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে পুরোপুরি সক্রিয় হতে হবে।

সরকারকে দক্ষ বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য বাজার তদারকি জোরদার করা, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে মূল্য পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। একই সঙ্গে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থায় কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি হচ্ছে কিনা সেটিও নজরে রাখতে হবে। এক্ষেত্রে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে খোলা বাজারে ন্যায্যমূল্যে কিছু পণ্য সরবরাহের উদ্যোগও নেয়া যেতে পারে, যাতে বাজারে একটি ভারসাম্য তৈরি হয়। পাশাপাশি বাজারে মূল্যতালিকা প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা এবং তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাও প্রয়োজন। তবে এগুলো স্বল্পমেয়াদের জন্য করলে চলবে না। বাজারে অব্যবস্থাপনা বহু পুরনো সংকট। মূল্যস্ফীতি ক্রমেই স্ফীত হওয়ার পেছনেও এ অব্যবস্থাপনার বড় ভূমিকা রয়েছে। যে কারণে দেখা যায় বিশ্ববাজারে কোনো পণ্যের দাম বাড়লে এখানেও সে পণ্যের দাম বেড়ে যায়, কিন্তু বিশ্ববাজরে কমলেও এখানে কমার গতি হ্রাস পায়। আবার সরকারি তথ্যে পর্যাপ্ত খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও আমদানির কথা উল্লেখ থাকলেও মাঠের চিত্রে তার প্রতিফলন দেখা যায় কদাচিৎ।

যেকোনো সুযোগে দেশের বাজারে কৃত্রিম সরবরাহ সংকট তৈরির নজির হরহামেশাই দেখা যায়। দীর্ঘদিনের এ অব্যবস্থাপনাগত সংকট তাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দাবি করে। সরকারকে বাজার ব্যবস্থাপনা দক্ষ করার পাশাপাশি টেকসই করায়ও মনোযোগ দিতে হবে। তাতে হয়তো সাধারণ মানুষকে ৯ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতির অভিঘাত থেকে সুরক্ষা দেয়া সম্ভব হবে।

ঈদ আনন্দ ও সম্প্রীতির উৎসব। কিন্তু এ উৎসব ঘিরে বাজারে অস্থিরতা ও মূল্যবৃদ্ধি যদি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস করে তবে সেই আনন্দ অনেকটাই ম্লান হয়ে যেতে পারে। উৎসবের আমেজ কারো জন্য আর্থিক চাপের কারণ না হোক এটাই প্রত্যাশা। এ প্রত্যাশা পূরণে বাজারে শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। কার্যকর তদারকি, স্বচ্ছ সরবরাহ ব্যবস্থা ও দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণ নিশ্চিতের মাধ্যমে ঈদের বাজার স্বস্তিদায়ক হোক।