বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, বিশেষত যখন শাসকগোষ্ঠী দিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। চীন-ভারত দ্বন্দ্বও অনেকটা আলো কেড়ে নিচ্ছিল বাংলাদেশের নিরাপত্তা আলোচনার। তবে সম্প্রতি নিরাপত্তা প্রেক্ষাপট পরিবর্তিত হয়েছে, বিশেষ করে মিয়ানমার ও অন্যান্য অ-রাষ্ট্রীয় শক্তির ক্রমবর্ধমান হুমকির ফলে। সীমান্তে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর তৎপরতা, সীমান্ত লঙ্ঘন, বঙ্গোপসাগরে নতুন নিরাপত্তা হুমকি এবং ওই অঞ্চলগুলোয় বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বিঘ্ন বাংলাদেশের দক্ষিণ সীমান্তকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। পুরনো কাঠামোকে হিসাবে রেখে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ক্রমেই দুরূহ হয়ে উঠছে। এ নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একটি সুসংগঠিত নিরাপত্তা নীতি ‘সাউদার্ন কন্টিনজেন্সি ফ্রেমওয়ার্ক (এসসিএফ)’ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চীন-ভারত প্রতিযোগিতা ও বাংলাদেশের কৌশলগত দোলাচল
বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান চীন-ভারত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব বিস্তারে উভয় দেশই সক্রিয়। চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) মাধ্যমে বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) ২৬টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করেছে, যার মধ্যে ১৮টি চীনের। অন্যদিকে ভারত ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও কূটনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। মিয়ানমার সংকট এ প্রতিযোগিতাকে আরো জটিল করেছে। চীন যেখানে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার ঘনিষ্ঠ মিত্র, সেখানে ভারত ঐতিহাসিকভাবে দেশটির কিছু বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রতি সহানুভূতিশীল থেকেছে। ফলে বাংলাদেশকে এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে হবে, যা নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয় এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশীলতা বজায় রাখে।
দক্ষিণ সীমান্তে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সংকট
মিয়ানমার ও অন্যান্য গোষ্ঠীর সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলে উত্তেজনা নতুন নয়, তবে ২০২৩ সাল থেকে পরিস্থিতি গুরুতর আকার ধারণ করেছে। ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর তিন বিদ্রোহী গোষ্ঠী—আরাকান আর্মিসহ (এএ) থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স (৩বিটিএ)—মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ‘অপারেশন ১০২৭’ চালিয়ে রাখাইন রাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে নেয়। পরিস্থিতি আরো জটিল হয় ২০২৪ সালের ৪-৫ ফেব্রুয়ারি, যখন শতাধিক মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) সদস্য বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। তাদের নিরস্ত্র করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) আটক করে। ২০২৪ সালের ২২ মে মংডুতে আরাকান আর্মির হামলায় ১০টির বেশি সামরিক ক্যাম্প দখল ও ২০০ মিয়ানমার সেনার মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করে তোলে।
নৌ-সীমান্তেও উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। ২০২৪ সালের ৬ জুন টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, মিয়ানমার থেকে আসা গুলির কারণে খাদ্য সংকটে পড়ে ১০ হাজারের বেশি বাসিন্দা। একই মাসে আরাকান আর্মি একাধিকবার বাংলাদেশী ট্রলার লক্ষ্য করে গুলি চালায়। অক্টোবরে মিয়ানমার নৌবাহিনী সেন্ট মার্টিন দ্বীপের কাছে ছয়টি বাংলাদেশী মাছ ধরার ট্রলারে হামলা চালালে একজন নিহত ও দুজন আহত হয়।
২০২৪ সালের শেষ দিকে পরিস্থিতি আরো অশান্ত হয়ে ওঠে। ৫ নভেম্বর আরাকান আর্মি ২০ জন বাংলাদেশী জেলে আটক ও ১৫টি নৌকা জব্দ করে। পরে ৭ নভেম্বর আলোচনার মাধ্যমে তাদের মুক্তি দেয়া হয়। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটে ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর যখন আরাকান আর্মি ঘোষণা দেয় যে তারা সম্পূর্ণ ২৭১ কিলোমিটার বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং নাফ নদীতে সব ধরনের নৌযান চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
২০২৫ সালে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসা পণ্যবাহী জাহাজও হামলার শিকার হয়। ১৬ জানুয়ারি আরাকান আর্মি তিনটি কার্গো জাহাজ আটক করে, যেখানে ৫০ হাজার ব্যাগ শুকনো ফল, সুপারি, কফি এবং অন্যান্য পণ্য ছিল। এর মধ্যে দুটি জাহাজ ২০ জানুয়ারি ছাড়া হলেও তৃতীয়টি ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আটক থাকে। ১০ ফেব্রুয়ারি শাহ পরীর দ্বীপের কাছে তারা কাঠ বোঝাই ট্রলার দখল করে।
২০২৫ সালের ১ মার্চ বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, আরাকান আর্মি এখন মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসা পণ্যের ওপর ‘অনানুষ্ঠানিক শুল্ক’ আদায় করছে। ৫-৬ মার্চ মিয়ানমার নৌবাহিনী সেন্ট মার্টিন দ্বীপের কাছে ৫৬ জন বাংলাদেশী জেলেকে আটক করে এবং মুক্তির আগে মাছ, জ্বালানি ও খাদ্যসামগ্রী লুট করে। ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জে আরসা প্রধান আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনির গ্রেফতারের পর শরণার্থী শিবিরগুলোয় প্রতিশোধমূলক হামলার আশঙ্কা বাড়ে, যা নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে। এ পরিস্থিতিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শিবিরগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে। এরই মধ্যে ২১ মার্চ বান্দরবানের তুমব্রু সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমারের দিক থেকে গুলি ছোড়া হলে এক বাংলাদেশী নাগরিকসহ দুজন আহত হন। অভিযোগ উঠেছে যে এ হামলা আরাকান আর্মি চালিয়েছে, যা সীমান্ত অঞ্চলের নিরাপত্তা সংকটকে আরো গভীর করে তোলে।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার বাণিজ্যের ওপর এ অস্থিরতার প্রভাব সুস্পষ্ট। টেকনাফ স্থলবন্দরের শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের প্রথম আট মাসে আমদানি হয়েছে ৮০৮ কোটি ৪০ লাখ টাকার পণ্য। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ স্থলবন্দর দিয়ে মিয়ানমার থেকে আমদানি হয়েছে ১ হাজার ৫৪৫ কোটি ৮১ লাখ টাকার পণ্য।
‘সাউদার্ন কন্টিনজেন্সি ফ্রেমওয়ার্ক’: নতুন নিরাপত্তা কৌশল
নিরাপত্তা ও কৌশলগত অধ্যয়নের কয়েকটি মূল তত্ত্ব—বাস্তববাদ, সিকিউরিটাইজেশন থিওরি এবং রিজিওনাল সিকিউরিটি কমপ্লেক্স থিওরি—গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে। তবে বাংলাদেশের দক্ষিণ সীমান্তে উদ্ভূত হুমকি মোকাবেলায় এসব তত্ত্বের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
বাস্তববাদ রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ক্ষমতার রাজনীতি ও সামরিক প্রস্তুতিকে অগ্রাধিকার দেয়। এটি মূলত প্রচলিত রাষ্ট্রীয় শক্তির ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, ফলে আরাকান আর্মির মতো অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং অসমমিত নিরাপত্তা হুমকিগুলো বিশ্লেষণের জন্য এটি খুব একটা কার্যকর নয়। অন্যদিকে সিকিউরিটাইজেশন থিওরি ব্যাখ্যা করে যে কীভাবে রাজনৈতিক বয়ান তৈরির মাধ্যমে নিরাপত্তা হুমকি গঠিত হয়, যা বাংলাদেশের নিরাপত্তা উদ্বেগের কাঠামো বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক। তবে এটি বহুলাংশে বয়ানভিত্তিক বিশ্লেষণে সীমাবদ্ধ।
রিজিওনাল সিকিউরিটি কমপ্লেক্স থিওরি (আরএসসিটি) বাংলাদেশের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলোকে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে চীন-ভারত-মিয়ানমার ত্রিভুজের মধ্যে বুঝতে সাহায্য করে। তবে এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে মূলত রাষ্ট্রীয় মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে গঠিত বলে ধরে নেয়, যা আন্তঃসীমান্ত বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা উপেক্ষা করে প্রায় ক্ষেত্রেই।
এসব সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশকে আরো বিস্তৃত ও অভিযোজনযোগ্য নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করতে হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে সাউদার্ন কন্টিনজেন্সি ফ্রেমওয়ার্ক (এসসিএফ) একটি কার্যকর মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে, যা সামরিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সম্প্রদায়ভিত্তিক কৌশলকে সমন্বিতভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবর্তিত নিরাপত্তা হুমকি মোকাবেলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে বলাই যায়, এসসিএফ বাংলাদেশের দক্ষিণ সীমান্তে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য একটি সমন্বিত কৌশল প্রদান করে।
প্রথমত, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে নিরাপত্তা হুমকি দিন দিন বাড়ছে। বিশেষত আরাকান আর্মি ও অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং সীমান্ত লঙ্ঘনের ঘটনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। এ পরিস্থিতিতে উন্নত প্রযুক্তিগত নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা অত্যন্ত জরুরি। সীমান্ত অঞ্চলে ড্রোন ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। আগাম সতর্কতা পেলে নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে, যা অনুপ্রবেশ, চোরাচালান ও সামরিক উত্তেজনা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বিজিবির সদস্য সংখ্যা ও কার্যক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ও টেকনাফ উপকূলীয় এলাকায় নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের উপস্থিতি বাড়ানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, সীমান্ত ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করা অপরিহার্য। মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া বাড়ানো হলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরো উন্নত হবে। বাংলাদেশকে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সামরিক প্রস্তুতি নিতে হবে, যাতে প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবেলায় দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া যায়। বিশেষ করে সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সেন্ট মার্টিন ও নাফ নদী এলাকায় নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের টহল আরো জোরদার করতে হবে। সাম্প্রতিক হামলা ও জলদস্যুদের হুমকি রোধ করতে এ ধরনের ব্যবস্থা নেয়া এখন সময়ের দাবি।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসিয়ান ও জাতিসংঘের মাধ্যমে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যেতে পারে। আসিয়ানের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে বাংলাদেশ মিয়ানমারের ওপর আঞ্চলিক রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। জাতিসংঘের মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মিয়ানমার সংকট সমাধানের জন্য একটি কার্যকর কৌশল গড়ে তোলা দরকার। পাশাপাশি চীন ও ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল গ্রহণ করতে হবে। কারণ এ দুই দেশ মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে। বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে এমন একটি অবস্থান তৈরি করতে হবে, যাতে চীন ও ভারত উভয়ই মিয়ানমার সংকট নিরসনে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে এবং বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়।
চতুর্থত, সীমান্তবর্তী বাণিজ্যের ওপর মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশের উচিত মিয়ানমারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুট খুঁজে বের করা। বিশেষ করে নাফ নদী ও স্থলপথে বাণিজ্যের বিকল্প হিসেবে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য সম্প্রসারণ করা দরকার। সীমান্ত অস্থিরতার কারণে ব্যবসায়িক ক্ষতি এড়াতে বাণিজ্যনীতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে নতুন বাণিজ্য রুট ও কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুললে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে আরো স্থিতিশীল অবস্থানে যেতে পারবে।
পঞ্চমত, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয় স্থানীয় জনগণকে নিরাপত্তা কাঠামোর অংশীদার করা গেলে নজরদারি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরো কার্যকর হবে। এজন্য জনগণের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। এতে নিরাপত্তা বাহিনী আগাম সতর্কতা পাবে এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ সহজেই শনাক্ত করতে পারবে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, বিজিবি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া ইউনিট গঠন করা উচিত, যা সীমান্ত লঙ্ঘন বা নিরাপত্তা হুমকির ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হবে।
ষষ্ঠত, মিয়ানমারের অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সরাসরি ও কূটনৈতিক সংলাপ করাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘ সনদের আলোকে শান্তিপূর্ণ সংলাপ ও মধ্যস্থতা উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। জাতিসংঘের ধারা ৩৩ ও অধ্যায় VIII অনুসারে, বাংলাদেশ কৌশলগত সংলাপ আয়োজনের মাধ্যমে সংকট নিরসনের চেষ্টা করতে পারে। মিয়ানমারের জাতিগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে মধ্যস্থতা করে বাংলাদেশ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ নিলে সীমান্ত অঞ্চলে সংঘাত ও চোরাচালানের মতো সমস্যা কমবে এবং বাংলাদেশ আরো কার্যকরভাবে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে।
সাম্প্রতিক নিরাপত্তা হুমকির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতি পুনর্বিন্যাসের সময় এসেছে। এসসিএফের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত, সামরিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এটি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ শুধু নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতেই সক্ষম হবে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কৌশলগতভাবে আরো শক্তিশালী অবস্থানে যেতে পারবে।
আলাউদ্দীন মোহাম্মদ: যুগ্ম সদস্য সচিব, জাতীয় নাগরিক কমিটি (এনসিপি)










