দেশের সড়কে বিশৃঙ্খলা-যানজট, দুর্ঘটনা ও মৃত্যু নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর অন্যতম কারণ ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধ চলাচল। মূলত মেয়াদোত্তীর্ণ ও ফিটনেসবিহীন বাস-মিনিবাস, মাইক্রোবাস, সিএনজি অটোরিকশা ও প্রাইভেট কারের মতো বিভিন্ন যানবাহনের সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, প্রায় ১৭ লাখ যানবাহনের ফিটনেস সনদ থাকা বাধ্যতামূলক হলেও নিবন্ধিত ৩৬ শতাংশের বেশি গাড়ি আনফিট। ব্রেক, চাকা, স্টিয়ারিং, গিয়ারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পার্টস দুর্বল থাকায় নিয়ন্ত্রণ হারান চালক। মাঝ সড়কে যখন কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তখন সেখানে তীব্র হয়ে ওঠে যানজট। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তথ্য বলছে, দেশে প্রতিদিন যত সড়ক দুর্ঘটনা হয়, তার প্রায় ২০ শতাংশের জন্য দায়ী ফিটনেসবিহীন যান। বুয়েটের ভিন্ন এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনাগুলোর অন্যান্য কারণের মধ্যে ছিল ৬৬ হাজার ৬৬১টি ফিটনেসবিহীন যানবাহন। এদিকে ক্রমেই ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এমন পরিস্থিতিতে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে দুর্ঘটনা ঝুঁকি কমাতে হলে প্রয়োজন এসব যানবাহনের চলাচল বন্ধ করা।

  • তবে রাতারাতি ত্রুটিযুক্ত যান চলাচল বন্ধ করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে প্রতি বছর ঈদের সময় ফিটনেসবিহীন গাড়ির ব্যবহার আরো বেড়ে যায়। পুরনো ও ফিটনেসবিহীন বাস রঙ করে সড়কে নামানো হয়। স্বাভাবিকভাবে ঈদের সময় যাত্রীর চাপ থাকে। চাহিদার তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা কম থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়েই ত্রুটিপূর্ণ গাড়িগুলো বের করে মালিক পক্ষ। তাই কত মানুষ ঈদ যাত্রায় ভ্রমণ করে, সেই চাহিদা অনুযায়ী সড়কে ত্রুটিমুক্ত গাড়ি নামাতে না পারলে ফিটনেসবিহীন গাড়ির নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। আবার এসব যানবাহনে নিরাপত্তার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও দেশের বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন যাতায়াত প্রয়োজন এবং জীবিকার বিষয়টি এক্ষেত্রে অন্যতম বিবেচ্য বিষয়।
  • ঈদ সামনে রেখে বরং সরকারের কিছু আশু পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। কারণ এ সময় যাত্রীর চাপ বেশি থাকার কারণে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়ে যায়। গত বছরের ঈদুল ফিতরের আগে ও পরে, ৪ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ১৫ দিনের সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের তুলনায় গত বছর ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা ৩৯ দশমিক ২০ শতাংশ এবং প্রাণহানি ২০ দশমিক ১৯ শতাংশ বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদেরও আশঙ্কা রয়েছে, বর্তমানে দেশে বিদ্যমান ছয় লাখের বেশি ফিটনেসবিহীন গাড়ি আসন্ন ঈদুল ফিতরে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও বিশৃঙ্খলা বাড়াতে পারে। অবশ্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) দাবি করেছে, এবার তারা ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলাচল করতে দেবে না। বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত ও পুলিশ প্রশাসনের মাধ্যমে সড়কে ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। সবাই এ বিষয়ে আশ্বস্ত হতে চাই। কেননা উৎসব পালনের যাত্রা এমন অনিরাপদ হবে তা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
  • ঈদযাত্রা নিরাপদ করতে সরকারের দ্রুত কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা আবশ্যক। যেমন ফিটনেসবিহীন যানবাহনকে কাঠামোগত একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানোন্নয়ন, সেগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা এবং নিবন্ধিত করে এগুলোকে অনুমোদনের ব্যবস্থার আওতায় আনা প্রয়োজন। সর্বাপেক্ষা প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ। বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১২ মার্চ পর্যন্ত দেশে আনফিট গাড়ির সংখ্যা ৬ লাখ ১১ হাজার ১৪১। যদিও দেশের প্রচলিত আইনে ফিটনেসবিহীন যানবাহন রাস্তায় চালানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তার পরও অবাধে এসব যান চলাচল আইনের অকার্যকর প্রয়োগকে প্রতিফলিত করছে।
  • ট্রাফিক আইনের কার্যকর প্রয়োগের কারণে বিদেশে তুলনামূলক কম সড়ক দুর্ঘটনা হয়। যানবাহনে চলন্ত অবস্থায় মোবাইলে কথা বলা ও মাদকাসক্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। চালকরা ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলেন। আবার সেখানে ত্রুটিযুক্ত যান চলাচলের অনুমোদন নেই। যানবাহন ত্রুটিমুক্ত আছে কিনা তা তারা প্রতি বছর যাচাই করে। সেই সঙ্গে চালককে লাইসেন্স পেতে হলে দক্ষতা প্রমাণ করতে হয়। দক্ষতা প্রমাণে ব্যর্থ হলে তাকে লাইসেন্স দেয়া হয় না। এসব ক্ষেত্রে বিদেশে দুর্নীতি কিংবা ঘুসের প্রচলনও নেই। কিন্তু আমাদের দেশে তার উল্টো চিত্র। যানবাহন চলাচলের আইন মানা হয় না। উল্টো প্রতি স্তরে দুর্নীতি-ঘুসের মাধ্যমে ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলতে দেয়া হয়। ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করলেও চালকের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না। ট্রাফিক আইন অমান্য করলে চালকরা জরিমানা এড়াতে পুলিশের সঙ্গে রফাদফা করে পার পেয়ে যাওয়ারও ঘটনা ঘটছে। সেই সঙ্গে সড়কে চাঁদাবাজি এক ধরনের সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। এ চাঁদার ভাগ পান দলীয় পরিচয়ধারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ, বিআরটিএর কর্মকর্তা-কর্মচারী, মালিক-শ্রমিক সংগঠন ও পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিরা। একদিকে এ চাঁদাবাজির সংস্কৃতি, অন্যদিকে আইন না মানার প্রবণতা, ফিটনেসবিহীন যান, চালকের বেপরোয়া মনোভাব—সব মিলিয়ে সড়কপথে যাতায়াত অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
  • দুঃখজনকভাবে এসব ঝুঁকি এড়াতে বিআরটিএর দায়িত্বশীল হওয়ার অবকাশ রয়ে গেছে। সাধারণত সড়কে যানবাহন চালানোর জন্য যেসব অনুমতিপত্র প্রয়োজন হয়, তার একটি ফিটনেস সনদ, যা বিআরটিএ ইস্যু করে। এজন্য যানবাহনের এক্সেল লোড, টায়ারের বিড, স্পিড, ব্রেক, ধোঁয়া নির্গমন, হেডলাইট, অ্যালাইনমেন্ট, রঙ, আসনসহ ইঞ্জিন ও বডির বিভিন্ন বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। তাতে সবকিছু ঠিক থাকলে তবেই মেলে রাস্তায় নামার অনুমতি। অথচ একদিকে সনদ নেই এমন গাড়ির যেমন আধিক্য রয়েছে, তেমনি সঠিকভাবে ফিটনেস পরীক্ষা না হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। আবার সনদ থাকলেও তা নিয়মিত হালনাগাদ করা হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এসব যান যাতে চলাচল করতে না পারে তা নিয়ে বিআরটিএর আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। কোনোভাবেই ত্রুটিযুক্ত যান যেন সনদ না পায়, সড়কে না নামে সে বিষয়ে তৎপর থাকা প্রয়োজন। কেবল ঈদের সময় নয়, সারা বছর সড়কপথ নিরাপদ থাকুক, এটাই প্রত্যাশা।