ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। নির্বাচন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পথ ও মত ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের চিন্তাভাবনাও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আর কোনো অপশক্তি যাতে দেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে না পারে এবং দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে এজন্য আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’

জনগণের প্রত্যাশাও এটি যে দেশের প্রতিটি স্তরে ঐক্য বজায় থাকবে। দেশকে এগিয়ে নেয়ার পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের বিকাশেও এটি জরুরি।

জাতীয় ঐক্য বলতে যেকোনো বিষয়ে সবার একমত পোষণ করা বোঝায় না। বরং ভিন্নমত ও পথের প্রতি সহিষ্ণুতা ও সম্মান প্রদর্শন করা এবং যৌক্তিক সমালোচনা করা এর অংশ। সহিংসতা ও বিভাজনের পথে হাঁটা থেকে বিরত থাকা প্রকৃত ঐক্য প্রতিষ্ঠায় জরুরি।

সবাইকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে হলে নতুন সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। সেই সঙ্গে বিরোধী দলকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। সরকার ও বিরোধী দলের আচরণ, পারস্পরিক সহনশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য রক্ষার চর্চা এক্ষেত্রে জরুরি। রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকার কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থাকে। তবে বিরোধী দলও সরকারকে জবাবদিহির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি বর্তমানে সবচেয়ে জরুরি। দেশবাসী আবারো কোনো স্বৈরশাসন প্রত্যক্ষ করতে চায় না। দমন-পীড়নের রাজনীতি চায় না। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি ছাড়া জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা কঠিন হবে। এর বাইরে প্রয়োজন গণতন্ত্রের বিকাশ নির্ভর করে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর পেশাদার ও নিরপেক্ষ ভূমিকা। প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো স্বাধীনভাবে কাজ না করলে বৈষম্য ও নাগরিক বিভাজন রোধ করা যাবে না।

দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দমন-পীড়ন, ভয়-ভীতি দেখানো, সহিংসতা ও সংঘর্ষ দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। যে কারণে দেশের গণতন্ত্রের ভিত ক্রমেই দুর্বল হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রায় সব প্রতিষ্ঠান অকার্যকর হয়ে পড়েছে। প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করার সক্ষমতা হারিয়েছে। ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার রাজনীতি এর জন্য বিশেষভাবে দায়ী। আর এটি দেশকে এক প্রকার বিভাজন ও সহিংসতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ আবশ্যক। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়া এক্ষেত্রে দেশকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে। বাকি দায়িত্ব পালন করতে হবে নতুন সরকার ও বিরোধী দলকে। তাদের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে দেশের গণতন্ত্র কতটা মজবুত ও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে।

সরকার ও বিরোধী দল যদি একে অন্যকে ‘শত্রু’ হিসেবে বিবেচনা করে, তবে সংসদ অকার্যকর হয়ে পড়বে। সংসদের কার্যক্রম যদি রাজপথে নেমে আসে তবে তা দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলবে, যা অতীতেও দেখা গেছে।

সংসদকে হতে হবে রাজনৈতিক ঐক্যের প্রধান মঞ্চ। বিরোধী দলের প্রধান দায়িত্ব হবে সংসদে সক্রিয় ভূমিকা রাখা। সরকারের নীতি, বাজেট ও আইন প্রস্তাবের গঠনমূলক সমালোচনা করা এবং বিকল্প প্রস্তাব তুলে ধরা। সংসদ বর্জন কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক দায়িত্ব পালনের পথ হতে পারে না। বরং এতে সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনার পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, সরকারের দায়িত্ব হবে বিরোধী দলকে নিজেদের ও গণতন্ত্রের অংশীজন হিসেবে বিবেচনা করা। বিরোধী দলের মতপ্রকাশ, সমালোচনা কিংবা আন্দোলনের অধিকার রুদ্ধ করা যাবে না, যেমনটা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের শাসনামলে করা হয়েছিল। তাহলে জাতীয় ঐক্য তৈরির পথ অনেকটাই মসৃণ হয়ে উঠবে।

পাশাপাশি জরুরি হলো জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়, যেমন সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি—এসব ক্ষেত্রে অধিকাংশের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে বিরোধী দলের সহযোগিতা সরকারের জন্য সহায়ক হতে পারে, আবার সরকারকেও বিরোধী দলের প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। এতে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ আরো গ্রহণযোগ্য ও টেকসই হয়। এক্ষেত্রে বিরোধী দলের ভূমিকা শুধু না বলায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। একই সঙ্গে বিকল্প নীতি ও কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরতে হবে, যাতে জনগণ বুঝতে পারে—বিরোধী দল কেবল বিরোধিতা নয়, শাসনের জন্যও প্রস্তুত। অন্যদিকে সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে—বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন সংস্থা ও গণমাধ্যম যেন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করতে পারে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হলেই প্রকৃত অর্থে চেক অ্যান্ড ব্যালান্স বজায় থাকে।

আগামীকাল বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের শপথ পাঠ অনুষ্ঠিত হবে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি এ শপথ পড়াবেন। এ সরকার দেশের ক্ষমতার মেরুকরণ নয়, বরং বিপরীত দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে—এ প্রত্যাশা। তিনি ওই সংবাদ সম্মেলনেও বলেছেন, ‘যেকোনো মূল্যে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে।’ শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা ছাড়া জাতীয় ঐক্যও প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হবে। এক্ষেত্রে শপথ পাঠ ও সংসদ কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে মনোযোগ দিতে হবে। কেননা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণের পরবর্তী দুইদিনে চার জেলায় সংঘর্ষে দুজন নিহত এবং অর্ধশতাধিক আহত হওয়ার খবর বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে সব সংঘর্ষ রাজনৈতিক না হলেও জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদরে বোমা বানানোর সময় বিস্ফোরণে দুজন নিহত হয়েছেন। আবার একই সময়ে দেশের ৩০টি জেলায় দুই শতাধিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে বলে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যে উঠে এসেছে। সংস্থাটির তথ্যে উল্লেখ রয়েছে, এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন তিনজন। আহত হয়েছেন তিন শতাধিক। সুতরাং দেশের সর্বস্তরে যেকোনো অপরাধ দমনে সর্বদা সজাগ থাকতে হবে সরকারকে। বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য হুমকি, তা বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।