একেএম ওয়াহিদুজ্জামান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক। ২০১৭ সালে তিনি বিএনপির আইসিটি উইং প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন তিনি। সম্প্রতি দেশের আইসিটি খাতের ভবিষ্যৎ এবং বিএনপির প্রস্তুতি-পরিকল্পনা ঘিরে নানা কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিকা মাহজাবিন
আপনি বিএনপির আইসিটি দিকটি দেখছেন। রাজনীতিতে মিসইনফরমেশন এবং ডিসইনফরমেশন কীভাবে প্রভাব ফেলছে? এ নিয়ে বিএনপি কীভাবে কাজ করছে?
মিসইনফরমেশন ডিসইনফরমেশন এখন রাজনীতির এক বাস্তব সত্য। এটা আর শুধু দলীয় রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব পড়ছে সমাজের পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর, এমনকি সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ওপরও। ভুল তথ্য যখন বারবার ছড়ানো হয়, তখন মানুষ বিভ্রান্ত হয়, আতঙ্কিত হয় এবং অনেক সময় ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। আমরা এখন নিয়মিত দেখছি কীভাবে পরিকল্পিতভাবে প্রপাগান্ডা নেটওয়ার্ক তৈরি করা হচ্ছে। বট অ্যাক্টিভিটি ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে পোস্ট, কমেন্ট আর ভিডিও ভাইরাল করা হচ্ছে। একই কথা বা একই বার্তা শত শত পেজ, গ্রুপ আর অ্যাকাউন্ট থেকে একসঙ্গে ছড়ানো হচ্ছে, যাতে মিথ্যাকে সত্য বলে মনে হয় আর সত্যকে আড়াল করা যায়। এ ধরনের সমন্বিত অপতথ্য প্রচারণা গণতন্ত্রের জন্য খুবই ক্ষতিকর।
বিএনপি মনে করে, এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী ও কার্যকর জবাব হচ্ছে সত্যের শক্তি। মানে যাচাই করা তথ্য, প্রমাণভিত্তিক কনটেন্ট এবং ধারাবাহিকভাবে সত্য তুলে ধরা। একদিন বা এক পোস্টে নয়; নিয়মিত, দায়িত্বশীলভাবে ও বিশ্বাসযোগ্য কণ্ঠে সত্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। মানুষকে তথ্য দিতে হবে, যাতে তারা নিজেরাই বুঝতে পারে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্লাটফর্মগুলোর সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয়ও জরুরি। যাতে ফেক অ্যাকাউন্ট, বট নেটওয়ার্ক, সমন্বিত অপতথ্য প্রচারণা এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত শনাক্ত করা যায় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া যায়। এখানে লক্ষ্য হবে সমস্যা সমাধান, দমন নয়।
বিএনপি স্পষ্টভাবে বিশ্বাস করে—আমরা এমন কোনো ব্যবস্থা চাই না যা মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে দমন করবে। সমালোচনা, ভিন্নমত বা প্রশ্ন তোলার অধিকার গণতন্ত্রের অংশ। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের অধিকার রক্ষা করা এবং একটি তথ্যভিত্তিক, সুস্থ ও দায়িত্বশীল ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলা।
বাংলাদেশের আইসিটি খাতের পরিকল্পনা কেমন হওয়া উচিত?
আমাদের আইসিটি পরিকল্পনার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত মানুষের বাস্তব প্রয়োজন। সবকিছুর আগে থাকতে হবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এ চিন্তা। মানে আমরা এমন কোনো প্রযুক্তি বা প্রকল্পে যাব না যেগুলো দেখতে খুব ঝকঝকে, প্রেজেন্টেশনে ভালো লাগে, কিন্তু বাস্তবে মানুষের জীবন সহজ করে না। শুধু শো-অফ করার জন্য প্রযুক্তি নয়—প্রযুক্তি হতে হবে মানুষের সেবা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা, অর্থনীতি এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের জন্য বাস্তব উপকার বয়ে আনার মাধ্যম।
আমাদের সবার আগে স্বীকার করতে হবে, আমরা যে পরিস্থিতি বা অবকাঠামো উত্তরাধিকার হিসেবে পাচ্ছি, সেটার বাস্তবতা ভালো না। অনেক জায়গায় ভাঙা ব্যবস্থা, অসম্পূর্ণ প্রকল্প, আর ভুল অগ্রাধিকার রেখে যাওয়া হয়েছে। এ বাস্তবতা অস্বীকার করে আকাশকুসুম পরিকল্পনা করলে কাজ হবে না। সে কারণেই আমাদের আইসিটি পরিকল্পনা হতে হবে বাস্তবভিত্তিক এবং ধাপে ধাপে এগোনোর মতো।
প্রথম ধাপে আমাদের ঠিক করতে হবে দেশের বেসিক ডিজিটাল ভিত্তি—কানেক্টিভিটি, ডেটা ও কম্পিউটিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার। মানে ইন্টারনেট সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে কিনা, ডেটা নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য কিনা, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কম্পিউটিং সক্ষমতা আছে কিনা—এ বিষয়গুলো আগে ঠিক করতে হবে। এই ভিত্তি দুর্বল থাকলে বড় কোনো প্রযুক্তি উদ্যোগই টেকসই হবে না।
এর পরের ধাপে আমাদের গড়ে তুলতে হবে মানুষের সক্ষমতা। ট্যালেন্ট পাইপলাইন মানে শুধু কোডার নয়; ডেটা, ডিজিটাল সার্ভিস, সাইবার সিকিউরিটি, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টসহ নানা দক্ষ মানুষের ধারাবাহিক সরবরাহ। একই সঙ্গে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে শক্ত করতে হবে, যাতে নতুন উদ্যোক্তারা আইডিয়া থেকে বাস্তব ব্যবসায় যেতে পারে। পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রির সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যেন দেশীয় কোম্পানিগুলো নিজেরাই বড় কাজ নিতে পারে।
এসব ভিত্তি তৈরি হওয়ার পরই আমরা বড় আকারে এআই, অটোমেশন, ডিজিটাল সার্ভিস এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে পারব। তার আগে এসব নিয়ে শুধু ঘোষণা দিলে বা নাম লাগালে কোনো লাভ হবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শুধু ভবন বানানো, প্রকল্পের নাম ঘোষণা করা বা ফিতা কাটা দিয়ে সফলতা মাপা যাবে না। আমরা চাই ফলাফলভিত্তিক কাজ। এমন ডেলিভারি, যেখানে বাস্তবে দেখা যাবে কত মানুষের চাকরি হয়েছে, কত রফতানি বেড়েছে, কত সেবার মান উন্নত হয়েছে, আর সাধারণ মানুষ কীভাবে উপকৃত হচ্ছে। আইসিটি খাতের সাফল্য মাপা হবে কাগজে নয়, মানুষের জীবনে পরিবর্তনের মাধ্যমে।
ডিজিটাল লার্নিং বা ই-লার্নিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বৈশ্বিক পর্যায়ে এখনো নিম্নমুখী। এক্ষেত্রে উত্তরণের উপায়গুলো কী?
এ জায়গা থেকে সামনে এগোতে হলে আমাদের একসঙ্গে তিনটি কাজ করতে হবে। আলাদা করলে চলবে না, তিনটিকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে এগোতে হবে।
প্রথমত, সবার জন্য মানসম্মত ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ইন্টারনেট আছে বললেই হবে না—ইন্টারনেট হতে হবে স্থিতিশীল, দ্রুত ও সাশ্রয়ী। শহর আর গ্রামের মধ্যে যেন এ ব্যবধান না থাকে। একটা অনলাইন ক্লাস চলার সময় যদি বারবার নেট বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে শেখার কোনো মানে থাকে না। তাই শিক্ষার জন্য নির্ভরযোগ্য কানেক্টিভিটি নিশ্চিত করা খুবই জরুরি।
দ্বিতীয়ত, কনটেন্ট আর লার্নিং প্লাটফর্মগুলোকে আমাদের দেশের বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই করতে হবে। বিদেশী কনটেন্ট কপি করে আনলে হবে না। বাংলা ভাষায় মানসম্মত কনটেন্ট থাকতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা সহজে বুঝতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষক-সহায়তা থাকতে হবে—শুধু ভিডিও দেখালেই শিক্ষা হয় না, প্রশ্ন করার সুযোগ, গাইডলাইন আর ফিডব্যাক দরকার। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শেখার ফলাফল কী হচ্ছে, সেটা মাপার ব্যবস্থা। মানে, শিক্ষার্থী আসলেই কী শিখছে, কোন জায়গায় পিছিয়ে আছে—এ তথ্যগুলো পরিষ্কারভাবে জানা দরকার।
তৃতীয়ত, ডিভাইস অ্যাকসেস আর শিক্ষক প্রশিক্ষণকে বাস্তব ক্লাসরুমের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, শিক্ষকরা ট্রেনিং নেন, সার্টিফিকেট পান, কিন্তু ক্লাসে গিয়ে আগের মতোই পড়ান। আমরা চাই না ট্রেনিং শুধু কাগজে থাকুক। ট্রেনিং এমন হতে হবে, যেটা শিক্ষক সরাসরি ক্লাসে ব্যবহার করতে পারেন। একইভাবে শিক্ষার্থীদের হাতে ডিভাইস থাকলেও যদি সেটা শেখার কাজে না লাগে তাহলে কোনো লাভ নেই।
এ জায়গাতেই আমাদের ‘Connected School’ উদ্যোগটা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে স্কুলগুলোকে ডিজিটালি কানেক্টেড করা। প্রতিটি স্কুলে একটি আধুনিক লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস) চালু করা, যেখানে পাঠ্যসূচি, ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষা আর অগ্রগতি সবকিছু এক জায়গায় থাকবে।
আমরা চাই এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে, যেখানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক আর অভিভাবক সবাই সংযুক্ত থাকবে। শিক্ষার্থী কী শিখছে, শিক্ষক কীভাবে পড়াচ্ছেন, অভিভাবক সন্তানের অগ্রগতি কতটুকু—সবাই যেন নিয়মিত জানতে পারে। এতে শেখা হবে ধারাবাহিক, মূল্যায়ন হবে স্বচ্ছ, আর দক্ষতা উন্নয়ন হবে বাস্তবভিত্তিক।
লক্ষ্য শুধু অনলাইন ক্লাস চালু করা নয়। লক্ষ্য হলো একটি জাতীয় পর্যায়ের স্কেলযোগ্য ডিজিটাল লার্নিং ইকোসিস্টেম তৈরি করা, যা দেশের স্কিল পাইপলাইন ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকবে। আজ যে শিক্ষার্থী স্কুলে পড়ছে, কাল সে যেন এ ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই কাজের জন্য প্রস্তুত হতে পারে—এইটাই আমাদের আসল উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশে গ্লোবাল টেকগুলোকে আনার জন্য কোনো উদ্যোগ নেয়া হবে কিনা?
হ্যাঁ, অবশ্যই এ ধরনের উদ্যোগ থাকবে। আমরা চাই গ্লোবাল টেক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে আসুক, বিনিয়োগ করুক, আর এখান থেকে কাজ পরিচালনা করুক। কিন্তু গ্লোবাল টেক আনা মানে শুধু কয়েকটা অফিস খুলে ফিতা কাটা না। বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তখনই আসে, যখন তারা দেখে যে একটা দেশে নীতিগত স্থিতিশীলতা আছে, নিয়ম-কানুন হঠাৎ হঠাৎ বদলায় না, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা নেই।
তারা আরো দেখে রেগুলেটরি প্রক্রিয়াগুলো কতটা সহজ। মানে, লাইসেন্স নিতে, অনুমোদন পেতে, ট্যাক্স বা কমপ্লায়েন্স বুঝতে গিয়ে যেন মাসের পর মাস ঘুরতে না হয়। কোথায় কোন কাগজ লাগবে, কে অনুমোদন দেবে, কত সময় লাগবে—এ সবকিছু আগেই পরিষ্কার থাকতে হবে।
ডেটা সিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্কও তাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। গ্লোবাল টেক কোম্পানিগুলো জানতে চায়,
তাদের ডেটা কতটা নিরাপদ থাকবে, ব্যবহারকারীর তথ্য কীভাবে সুরক্ষিত হবে, কোনো সমস্যা হলে আইনি সুরক্ষা কী। এ জায়গাগুলো স্পষ্ট না হলে তারা বড় বিনিয়োগে যেতে চায় না।
একই সঙ্গে ব্যবসা করার পরিবেশ হতে হবে স্বচ্ছ ও পূর্বানুমেয়। মানে, নিয়ম সবার জন্য এক রকম হবে, অঘোষিত বাধা থাকবে না, সিদ্ধান্তগুলো যুক্তির ভিত্তিতে হবে—ব্যক্তি বা সম্পর্কের ওপর নয়।
এ কারণেই আমরা চাই একটি বাস্তব ওয়ান স্টপ ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন ব্যবস্থা। শুধু নামের ওয়ান স্টপ নয়, সত্যিকারের ওয়ান স্টপ যেখানে একজন বিনিয়োগকারী এক জায়গা থেকেই জানতে পারবে, কোন খাতে কী অনুমোদন লাগবে, কোথায় আবেদন করতে হবে, আর কত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে। এতে সময় নষ্ট হবে না, দৌড়ঝাঁপও কমবে।
আমরা জানি, লোকাল ইকোসিস্টেম শক্ত না হলে গ্লোবাল টেকও পুরো আস্থা পায় না। তাই দেশীয় স্টার্টআপ, প্রযুক্তি কোম্পানি, দক্ষ জনবল আর সাপ্লাই চেইনকে শক্ত করা খুব জরুরি। যখন তারা দেখবে স্থানীয়ভাবে কাজ করার মতো সক্ষমতা আছে, তখন তারা আরো আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বাংলাদেশে আসবে, বড় বিনিয়োগ করবে, আর দীর্ঘমেয়াদে থাকার সিদ্ধান্ত নেবে।
সরকারের কিছু উদ্যোগ নিয়ে সমালোচনা আছে। যেমন ফাইভজির অকশনে শুধু গ্রামীণফোন ছিল। অন্য দুটি অপারেটরকে বাদ দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে জানতে চাই।
আমি বিষয়টিকে শুধু একটা অকশন বা লাইসেন্স বিক্রির ইস্যু হিসেবে দেখি না। এটা আসলে অনেক বড় প্রশ্ন: স্পেকট্রাম পলিসি কেমন হবে, বাজারে সত্যিকারের প্রতিযোগিতা থাকবে কিনা, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রেগুলেটরের ওপর অপারেটরদের আস্থা থাকবে কিনা। যদি এ তিন জায়গায় সমস্যা থাকে তাহলে যত বড় অকশনই হোক, সেটার ভালো ফল পাওয়া যাবে না।
ভবিষ্যতে আমাদের এমন অকশন ডিজাইন দরকার, যেখানে সব মোবাইল অপারেটরের অংশগ্রহণ বাস্তবসম্মত হবে। মানে, এমন দাম বা শর্ত দেয়া যাবে না, যেগুলো শুধু এক-দুটি বড় অপারেটরই নিতে পারে, বাকিরা বাইরে ছিটকে যায়। স্পেকট্রাম প্রাইসিং হতে হবে যুক্তিসংগত, যাতে অপারেটররা সব টাকা লাইসেন্স কিনতেই শেষ করে না ফেলে, বরং নেটওয়ার্কে বিনিয়োগ করতে পারে। কারণ শেষ পর্যন্ত গ্রাহক ভালো সার্ভিস পাবে কিনা সেটা নির্ভর করে ওই বিনিয়োগের ওপর।
একই সঙ্গে বাজারে প্রতিযোগিতা টিকে থাকা খুব জরুরি। যদি প্রতিযোগিতা না থাকে তাহলে দাম বাড়ে, সার্ভিসের মান পড়ে যায়, নতুন প্রযুক্তির সুবিধা সাধারণ মানুষ পায় না। তাই স্পেকট্রাম নীতিতে এমন ভারসাম্য থাকতে হবে যাতে বাজার সুস্থ থাকে এবং সব অপারেটরের জন্য খেলাটা ফেয়ার হয়।
আর ফাইভজি সফল হয় শুধু লাইসেন্স দিলেই না। ফাইভজি তখনই বাস্তবে কাজ করে যখন কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে এগোয়। প্রথমত, কাভারেজ অবলিগেশন— মানে, অপারেটররা শুধু শহরের কয়েকটি জায়গায় ফাইভজি চালিয়ে দায়িত্ব শেষ করবে না, ধাপে ধাপে মানুষের কাছে সেবা পৌঁছাতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাকহল ফাইবারাইজেশন—ফাইভজি চালাতে হলে শক্ত ফাইবার নেটওয়ার্ক দরকার, না হলে স্পিড আর ল্যাটেন্সির সুবিধা পাওয়া যাবে না।
তৃতীয়ত, ইনফ্রাস্ট্রাকচার শেয়ারিং। আলাদা করে সবাই যদি টাওয়ার, ফাইবার বা ইনফ্রা বানাতে যায়, তাহলে খরচ বাড়বে আর অগ্রগতি ধীর হবে। শেয়ারিং হলে খরচ কমে, দ্রুত নেটওয়ার্ক ছড়ানো যায়। আর চতুর্থত, সার্ভিস কোয়ালিটি—গ্রাহক আসলে কী পাচ্ছে, কল ড্রপ কমছে কিনা, ইন্টারনেট স্পিড ঠিক আছে কিনা...এ বিষয়গুলো নিয়মিতভাবে মনিটর করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, শুধু কাগজে লাইসেন্স দিয়ে বা বড় ঘোষণা দিয়ে ফাইভজি সফল করা যাবে না। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে বাস্তব ডেলিভারি—মানুষ যেন সত্যিকার অর্থেই ভালো নেটওয়ার্ক, ভালো সার্ভিস আর নতুন প্রযুক্তির সুবিধা পায়। সেটাই হবে সাফল্যের আসল মাপকাঠি।
আওয়ামী লীগ আমলে মন্ত্রী ও আমলাদের যোগসাজশে কোটি কোটি টাকা খরচ করে হাই-টেক পার্ক করা হয়েছে। কিন্তু উদ্যোক্তা তৈরিতে আউটপুট আসেনি। বিএনপি এখানে কী পরিকল্পনা করছে?
এই যে বিশাল ধ্বংসযজ্ঞ আর অগোছালো অবস্থা আমরা উত্তরাধিকার হিসেবে পাচ্ছি, এটা একদিনে বা এক সিদ্ধান্তে ঠিক করা যাবে না। এগুলো পরিষ্কার করতে সময় লাগবে, সঠিক অডিট লাগবে, সবচেয়ে বেশি লাগবে যোগ্য ও সাহসী নেতৃত্ব। কারণ এগুলো কাগজের কোনো ধারণা না—এগুলো বাস্তব সম্পদ। ভবন আছে, জমি আছে, বাজেট খরচ হয়েছে, জনবল যুক্ত আছে। আমরা এগুলোকে এড়িয়ে যেতে পারি না, আমাদের যতটা সম্ভব এগুলো নিয়েই কাজ করতে হবে।
এজন্যই আমাদের প্রথম কাজ হবে একটি বাস্তব ও সৎ পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করা। মানে, কোথায় কী কাজ করছে, কোনো প্রকল্পে আসলেই কোনো আউটপুট আছে কিনা, কোথায় শুধু টাকা খরচ হচ্ছে কিন্তু ফল পাওয়া যাচ্ছে না—এ বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত করা। কাউকে খুশি করার জন্য রিপোর্ট বানানো নয়, বাস্তব অবস্থা বোঝার জন্য এ মূল্যায়ন দরকার।
এরপর যেসব প্রকল্প বা স্থাপনার মধ্যে সম্ভাবনা আছে, যেগুলো ঠিকভাবে চালালে কাজে লাগতে পারে, সেগুলোকে দ্রুত রিবুট করতে হবে। প্রয়োজনে রিপারপাস করতে হবে। মানে, যে উদ্দেশ্যে বানানো হয়েছিল সেটাতে কাজ না করলে নতুন বাস্তব প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে। সময় নষ্ট করে ফেলে রাখলে ক্ষতিই বাড়বে।
আর যেগুলোতে ধারাবাহিকভাবে অর্থ ও মানবসম্পদ অপচয় হচ্ছে, বছরের পর বছর শুধু বাজেট খাচ্ছে কিন্তু কোনো উপকার দিচ্ছে না, সেখানে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। এ জায়গায় আবেগ বা রাজনৈতিক হিসাব চলবে না। জনগণের টাকার দায়িত্ব আমাদের নিতে হবে, সেটার জন্য কখনো কখনো অপ্রিয় সিদ্ধান্তও নিতে হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হলো পার্ক মানে শুধু চারটা বিল্ডিং বা সাইনবোর্ড না। একটা পার্ক তখনই সফল হয়, যখন সেটা একটা জীবন্ত ইকোসিস্টেমে পরিণত হয়। সেখানে বিনিয়োগ আসে, দক্ষ মানুষ কাজ করে, স্টার্টআপ জন্ম নেয়, আর ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সরাসরি সংযোগ থাকে। গবেষণা, ব্যবসা, চাকরি আর উদ্ভাবনা সবকিছু একসঙ্গে চলতে হবে।
আমাদের লক্ষ্য হবে এসব পার্ককে এমন জায়গায় রূপান্তর করা, যেখানে শুধু জায়গা পড়ে থাকে না, বরং যেখানে বাস্তব অর্থনৈতিক কার্যক্রম হয়, কর্মসংস্থান তৈরি হয়, আর দেশ বাস্তবভাবে উপকৃত হয়। সেখানেই হবে এ সংস্কারের আসল সাফল্য।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে পরিকল্পনা কী?
আমরা এ বিষয়ে একদম পরিষ্কার ও স্পষ্ট অবস্থানে আছি। বিদেশী বিনিয়োগ এমনিতেই আসে না। বিদেশী বিনিয়োগ আসে তখনই, যখন একটি দেশে কাজ করার প্রক্রিয়া সহজ হয়, নীতিমালা বারবার বদলায় না, আর সিদ্ধান্তগুলোর ফলাফল আগেই কিছুটা অনুমান করা যায়। মানে, আজ যে নিয়মে বিনিয়োগ করা হচ্ছে, কাল হঠাৎ করে সেই নিয়ম বদলে যাবে—এমন অনিশ্চয়তা থাকলে কোনো বিনিয়োগকারীই বড় সিদ্ধান্ত নেন না।
এ কারণেই আমরা চাই বিনিয়োগকারীর জন্য দ্রুত অনুমোদনের ব্যবস্থা। কে কোথায় আবেদন করবে, কত দিনের মধ্যে অনুমোদন পাবে—এ বিষয়গুলো আগেই নির্ধারিত থাকতে হবে। সময়সীমা বেঁধে দেয়া সার্ভিস দরকার, যাতে ফাইল পড়ে থাকে না এবং বিনিয়োগকারীদের মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে না হয়। একই সঙ্গে কমপ্লায়েন্সের পথ হতে হবে স্পষ্ট ও সহজ। মানে, কোন নিয়ম মানতে হবে, কী রিপোর্ট দিতে হবে, কী করলে সমস্যা হবে—সবকিছু পরিষ্কারভাবে লেখা ও বোঝানো থাকতে হবে।
ইনসেনটিভ অবশ্যই থাকবে, কিন্তু সেটা ঢালাওভাবে দেয়া হবে না। শুধু নামের জন্য বা সম্পর্কের কারণে ইনসেনটিভ নয়। ইনসেনটিভ দেয়া হবে তখনই, যখন তার বিনিময়ে দেশের বাস্তব উপকার হবে। যেমন কত মানুষের নতুন চাকরি তৈরি হচ্ছে, স্থানীয় মানুষের দক্ষতা কতটা বাড়ছে, বিদেশী কোম্পানি লোকালভাবে কতটা ভ্যালু অ্যাড করছে, বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনে কী পরিমাণ প্রভাব ফেলছে।
আমরা চাই ইনসেনটিভ এমনভাবে ডিজাইন করতে, যাতে বিনিয়োগকারী ও দেশ দুপক্ষই লাভবান হয়। বিনিয়োগকারী সুবিধা পাবেন, আর দেশ পাবে কর্মসংস্থান, দক্ষ মানবসম্পদ, শক্ত লোকাল ইকোসিস্টেম এবং বাড়তি রফতানি আয়। এ ভারসাম্যটাই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ডিজিটাল স্পেসকে নিরাপদ করার জন্য কী ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে?
ডিজিটাল স্পেসকে নিরাপদ করতে হবে—এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু এ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে যেন সাধারণ নাগরিকের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, এই ব্যালান্সটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তার নামে যদি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, প্রশ্ন করার অধিকার বা ভিন্নমত দমন করা হয়, তাহলে সেটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এ কারণেই আমরা চাই, যেসব আইন বা বিধান অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে, সেগুলো নতুন করে রিভিউ করা হোক। কোন আইনে কোথায় অস্পষ্টতা আছে, কোন জায়গায় ক্ষমতার অপপ্রয়োগের ঝুঁকি আছে—এ বিষয়গুলো খোলাখুলিভাবে দেখা দরকার। লক্ষ্য হবে আইনকে আরো স্পষ্ট, ন্যায্য ও নাগরিকবান্ধব করা, যেন কেউ হয়রানির শিকার না হয়।
একই সঙ্গে আমাদের দরকার একটি স্পষ্ট অনলাইন স্ট্যান্ডার্ড ও সেফটি ফ্রেমওয়ার্ক। এই ফ্রেমওয়ার্ক একা কোনো দপ্তর বানাবে না। এখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকবে, সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিত্ব থাকবে, সিভিল সোসাইটির মানুষ থাকবে, এমনকি সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল প্লাটফর্ম কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরাও থাকবে। কারণ ডিজিটাল স্পেস সবার—এটা শুধু সরকারের বা শুধু কোম্পানির জায়গা নয়। এ ফ্রেমওয়ার্কের লক্ষ্য হবে তিনটি বিষয়।
প্রথমত, প্রিভেনশনস। মানে, সমস্যা হওয়ার আগেই ঝুঁকি কমানো। যেমন অপতথ্য ছড়ানোর পথ চিহ্নিত করা, অনলাইন হয়রানি বা সহিংসতার আগাম সংকেত বোঝা।
দ্বিতীয়ত, দ্রুত রেসপন্স—কোনো সমস্যা হলে যেন মাসের পর মাস সময় না লাগে। স্পষ্ট প্রটোকল থাকবে, কে কী করবে, কত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তৃতীয়ত, ট্রান্সপারেন্সি। মানে, কী কারণে কোনো কনটেন্ট বা অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলো, সেটার ব্যাখ্যা থাকবে, আপিলের সুযোগ থাকবে, পুরো প্রক্রিয়াটা হবে স্বচ্ছ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো—এখানে মূল লক্ষ্য ‘পুলিশিং’ করা নয়। মানে, ভয় দেখিয়ে বা দমন করে ডিজিটাল স্পেস চালানো নয়। বরং লক্ষ্য হবে স্পষ্ট স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করা, সবার জন্য এক রকম প্রটোকল রাখা, আর নাগরিকের অধিকার সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে কাজ করা। নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা—এ দুটির মধ্যে ভারসাম্য রেখেই একটি সুস্থ, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলাই আমাদের উদ্দেশ্য।
দেশে উৎপাদিত মোবাইল এখনো বৈশ্বিক পর্যায়ের মোবাইল ব্র্যান্ডের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে যেতে পারেনি। এক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে?
বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদের আগে পরিষ্কারভাবে দেখতে হবে—এখানে আসলে দুটি আলাদা স্তর আছে।
প্রথম স্তর উৎপাদন সক্ষমতা। এখন দেশে যে মোবাইল তৈরি হচ্ছে, তার বড় একটা অংশই মূলত অ্যাসেম্বলি-ভিত্তিক। মানে, বাইরে থেকে প্রায় সব যন্ত্রাংশ এনে এখানে শুধু জোড়া লাগানো হয়। এতে কিছু কর্মসংস্থান হয় ঠিকই, কিন্তু প্রযুক্তিগত সক্ষমতা খুব বেশি বাড়ে না। এ অবস্থায় গ্লোবাল ব্র্যান্ডের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রতিযোগিতা করা খুব কঠিন।
দ্বিতীয় স্তর ভ্যালু অ্যাড। শুধু ফোন জোড়া লাগালেই ভ্যালু অ্যাড হয় না। ভ্যালু অ্যাড বাড়াতে হলে আমাদের যেতে হবে ধাপে ধাপে। যেমন লোকালি কম্পোনেন্ট তৈরি করার সক্ষমতা গড়ে তোলা, ব্যাটারি, চার্জার, প্যাকেজিং, পরে ধীরে ধীরে ডিসপ্লে বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশে যাওয়া। পাশাপাশি দরকার শক্ত টেস্টিং ও সার্টিফিকেশন সুবিধা, যাতে দেশে তৈরি পণ্যের মান আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
আরেকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো ডিজাইন সক্ষমতা। গ্লোবাল ব্র্যান্ডগুলো শুধু হার্ডওয়্যার বিক্রি করে না, তারা ইউজার এক্সপেরিয়েন্স, সফটওয়্যার অপটিমাইজেশন এবং ডিজাইনের মাধ্যমে আলাদা পরিচয় তৈরি করে। আমাদেরও ধীরে ধীরে সেই জায়গায় যেতে হবে—লোকাল ইঞ্জিনিয়ার, ডিজাইনার আর প্রডাক্ট টিম তৈরি করে।
পুরো প্রক্রিয়াটি একদিনে সম্ভব নয়। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত ধাপে ধাপে লোকাল ভ্যালু অ্যাড বাড়ানো। আজ ১০-১৫ শতাংশ, কাল ২৫-৩০ শতাংশ—এভাবে বাস্তবসম্মতভাবে এগোতে হবে।
এখানে সরকারের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের কাজ হবে সরাসরি ব্যবসা করা নয়, বরং একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা। ট্যাক্স ও কাস্টমস নীতিমালা এমন হতে হবে, যাতে কাঁচামাল আনা সহজ হয় কিন্তু লোকাল উৎপাদনে উৎসাহ থাকে। মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্ত হতে হবে, যাতে নিম্নমানের পণ্য বাজার নষ্ট না করে। একই সঙ্গে এক্সপোর্ট সক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য নীতিগত সহায়তা দরকার, যাতে দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো শুধু দেশের বাজারেই আটকে না থাকে।
সব মিলিয়ে বলতে গেলে দেশে উৎপাদিত মোবাইলকে বৈশ্বিক পর্যায়ে নিতে হলে শুধু অ্যাসেম্বলি নয়—কম্পোনেন্ট, ডিজাইন, মান নিয়ন্ত্রণ আর ভ্যালু অ্যাড—পুরো চেইনটিকে ধাপে ধাপে শক্ত করতে হবে। সরকার পরিবেশ তৈরি করবে, শিল্প খাত সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে স্কেল করবে—এটিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।
টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিটিআরসির পদক্ষেপগুলো কতটুকু সহায়ক?
এক্ষেত্রে রেগুলেটরের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পুরো টেলিকম ইকোসিস্টেমের ভিত্তিটাই এখানে। মোবাইল অপারেটর, ইন্টারনেট সার্ভিস, নতুন প্রযুক্তি—সবকিছুর ওপরই রেগুলেটরের সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই বিটিআরসি কীভাবে কাজ করছে, সেটার ওপরই নির্ভর করে খাতটা কতটা সুস্থভাবে এগোবে।
আমরা চাই বিটিআরসি আরো প্রেডিক্টেবল হোক। মানে, হঠাৎ করে নিয়ম বদলে যাবে বা সিদ্ধান্ত আসবে—এমন অনিশ্চয়তা যেন না থাকে। অপারেটররা যেন আগে থেকেই জানে কী নিয়ম, কী শর্তে বিনিয়োগ করলে কী ফল পাওয়া যাবে। এতে করে তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারে।
একই সঙ্গে বিটিআরসিকে হতে হবে আরো টেকনিক্যালি সক্ষম। এখন টেলিকম শুধু কল বা এসএমএসে সীমাবদ্ধ না। ডেটা, ফাইভজি, আইওটি, সাইবার সিকিউরিটি—এসব বিষয়ে গভীর টেকনিক্যাল বোঝাপড়া দরকার। রেগুলেটর যদি এ জায়গায় শক্ত না হয়, তাহলে অপারেটরদের সঙ্গে যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত নেয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা রক্ষা করাও বিটিআরসির বড় দায়িত্ব। যদি প্রতিযোগিতা না থাকে, তাহলে গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হয়; দাম বাড়ে, সার্ভিসের মান কমে। তাই স্পেকট্রাম ম্যানেজমেন্ট এমন হতে হবে, যাতে সব অপারেটর অংশ নিতে পারে। একইভাবে ইনফ্রাস্ট্রাকচার শেয়ারিংয়ে উৎসাহ দিতে হবে, যাতে খরচ কমে আর নেটওয়ার্ক দ্রুত ছড়ায়।
সার্ভিস কোয়ালিটির বিষয়টাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। শুধু কাগজে লাইসেন্স দিলেই হবে না, বাস্তবে গ্রাহক কী সার্ভিস পাচ্ছে, কল ড্রপ কতটা কমছে, ইন্টারনেট স্পিড ঠিক আছে কিনা—এসব নিয়মিত মনিটর করা দরকার। পাশাপাশি কনজিউমার প্রটেকশন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে গ্রাহকরা প্রতারণা বা হয়রানির শিকার না হয়।
আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে আছে ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট। টেলিকম এখন শুধু ব্যবসা নয়, এটা জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি আর ডিজিটাল সার্ভিসের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই বিটিআরসিকে এসব দিক মাথায় রেখে আরো শক্তিশালী ও স্বচ্ছভাবে কাজ করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য একটাই—সাধারণ মানুষ যেন ভালো মানের, সাশ্রয়ী এবং নিরাপদ কানেক্টিভিটি পায়। রেগুলেটর যদি এ লক্ষ্য সামনে রেখে দায়িত্বশীল ও পেশাদারভাবে কাজ করে, তাহলেই পুরো টেলিকম খাত টেকসইভাবে এগোতে পারবে।










