যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, জ্বালানি, পরিবেশ, খাদ্যনিরাপত্তা, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন খাতে দীর্ঘদিন ধরে অর্থায়ন করে আসছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক নির্বাহী আদেশের পর ২৬ জানুয়ারি থেকে ওই সব প্রকল্পে অর্থায়ন স্থগিত করা হয়েছে। ৷ট্রাম্প প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তে বড় ধরনের অভিঘাত পড়ে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) ওপর। আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত সব কর্মসূচির প্রায় ২০ শতাংশের অর্থায়ন করত ইউএসএআইডি। ফলে অর্থায়ন স্থগিত ও নতুন সহায়তা বন্ধের কারণে এ সংস্থা পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পে কর্মরত এক হাজারেরও বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরিচ্যুত হয়েছেন। আইসিডিডিআর,বি সূত্র বলছে, সবচেয়ে বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ হারিয়েছেন সংক্রামক রোগ বিভাগের যক্ষ্মাবিষয়ক কর্মসূচি থেকে। যক্ষ্মা কর্মসূচির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দেশের সরকারের জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সঙ্গে কাজ করতেন।
ইউএসএআইডির অর্থায়ন বন্ধে কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরিচ্যুত হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে যক্ষ্মার ওষুধ সংকটের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দেশে গত তিন বছরে নতুন করে আরো প্রায় এক লাখ যক্ষ্মা রোগী বেড়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে সারা দেশে চার লাখের মতো যক্ষ্মা রোগী আছে এবং এর মধ্যে প্রতি বছর চার হাজারের মতো রোগীর মৃত্যু হয়। এমন পরিস্থিতিতে ওষুধ সংকট তৈরি হলে যক্ষ্মার প্রাদুর্ভাব বাড়তে পারে। তাছাড়া ইউএসএআইডি যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য খাতে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা করেছে, সংস্থাটির এ খাতে সব ধরনের সহযোগিতা স্থগিতের কারণে যক্ষ্মার পাশাপাশি মা ও শিশু মৃত্যুহার, অপুষ্টিজনিত রোগের প্রাদুর্ভাবও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এমন পরিস্থিতি দুটি বিষয়কে স্পষ্ট করে—স্বাস্থ্য খাতে নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি হয়নি এবং একটি উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিনির্ভরতা। অত্যন্ত দুঃখজনক যে যক্ষ্মার মতো প্রাচীন একটি রোগের চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সক্ষমতা এ দেশে গড়ে ওঠেনি। সেই সঙ্গে স্বাধীনতার সুদীর্ঘ বছর অতিক্রম করেও স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলার প্রয়োজনীয় সক্ষমতা তৈরি হয়নি। বরং অন্য দেশের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে বর্তমানে স্বাস্থ্য খাত আরো অরক্ষিত হয়ে পড়েছে, যার বড় উদাহরণ জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল।
জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, টিবির ওষুধ ইউএসএআইডি থেকে সরবরাহ করা হতো। একজন যক্ষ্মা রোগীকে টানা ছয় মাস ধরে এ ওষুধ সেবন করতে হয়। বর্তমানে হাসপাতালটিতে যথেষ্ট পরিমাণ ওষুধ রয়েছে। তবে ইউএসএআইডির অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ভবিষ্যতে এ ওষুধের সংকট তৈরি হতে পারে। অথচ এখন পর্যন্ত এর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা করা হয়নি। আবার ৬৭০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালটির বহির্বিভাগে গড়ে ৭০০ রোগী সেবা নেয়। তবে হাসপাতালে শয্যা পেতে দালালদের টাকা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি হাসপাতাল ভবনটি বর্তমানে অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। জানা গেছে বৃষ্টি হলে ভেতরে পানি পড়ে। এতে রোগীদের ভোগান্তি আরো বেড়ে যায়। অন্যদিকে দেশে এ ধরনের বিশেষায়িত হাসপাতালের সংখ্যা কম হওয়ায় বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এখানে চিকিৎসা নিতে আসে। প্রতিদিন আনুমানিক ১০০ রোগীর ভর্তির প্রয়োজন হলেও এর বিপরীতে মাত্র চার-পাঁচজনকে ভর্তি করানো যায়।
এটি কেবল একটি হাসপাতালের চিত্র নয়, পুরো স্বাস্থ্য খাতে এমন ভঙ্গুর অবস্থা বিরাজমান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ প্রয়োজন। অথচ দেশের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ প্রায় ১ শতাংশেই আটকে থাকে। প্রায় ৭৩ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় মানুষ নিজের পকেট থেকে মেটায়। অন্যদিকে রয়েছে প্রশাসনিক সুশাসনের অভাব, নানা অনিয়ম-দুর্নীতি, চিকিৎসকদের মূল্যবোধের অভাব, বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় অতিরিক্ত অর্থ নেয়া প্রভৃতি। এছাড়া রয়েছে পর্যাপ্ত চিকিৎসকের অভাবও। বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) তথ্যমতে, দেশে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের সংখ্যা ১ লাখ ২৬ হাজার। বিশ্লেষকদের মতে, এ সংখ্যা বাস্তবে আরো কম। কারণ অনেক চিকিৎসক সেবায় যুক্ত নন, অনেকে অবসর নিয়েছেন, আবার অনেকে বিদেশে রয়েছেন। যার কারণে অনেক মানুষ চিকিৎসাসেবার বাইরে থেকে যাচ্ছে। আবার সেবা পেলেও মানসম্মত সেবা না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। রয়েছে সরঞ্জাম সংকটের অভিযোগও। উপরন্তু ৫ আগস্ট বিগত সরকার পতনের পর ওই দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত চিকিৎসক ও কর্মচারীরা আত্মগোপনে চলে গেলে এসব সংকট তীব্রতর হয়ে পড়ে। এমনকি ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়লে ভিসা জটিলতায় পড়েন সেখানে চিকিৎসা নেয়া অধিকাংশ রোগী। এতে ব্যাহত হয়েছে অনেকের চিকিৎসা গ্রহণ।
নিজস্ব সক্ষমতা না বাড়িয়ে এভাবে একক কোনো দেশের অর্থায়ন ও কোনো দেশের চিকিৎসাসেবার ওপর নির্ভর করলে স্বাস্থ্যসেবার পরিসর বাড়ানো সম্ভব হবে না। এ খাত আরো ভঙ্গুর হয়ে পড়বে। সরকারের তাই বিকল্প অর্থায়নের ব্যবস্থা ও ধীরে ধীরে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোয় নজর দেয়া প্রয়োজন। দেশের সর্বস্তরের জনগণ সুলভ ও সহজে চিকিৎসা পাবে, এমন স্বাস্থ্যনীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন আবশ্যক।










