প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিশ্বব্যাংকের ঋণ ও সরকারি অর্থায়নে হাজার হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে সংস্থাটি। কিন্তু এসব প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সেই সঙ্গে দীর্ঘ আড়াই দশকের কার্যক্রমে প্রতিষ্ঠানটির সুশাসন, জবাবদিহি, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সামগ্রিক কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে, যা বণিক বার্তার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসডিএফকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; বরং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালনা ও জনসম্পদ ব্যবস্থাপনাগত বিষয়গুলোকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসডিএফের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, তহবিলের অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, নিয়োগে অনিয়ম, দ্বৈত চাকরি, সম্পদ আত্মসাৎ ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার। এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তাধীন। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন হবে না। তবে অভিযোগগুলোর ব্যাপকতা এবং প্রকৃতি এমন যে এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। বিশেষ করে যখন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই প্রকাশ্যে শীর্ষ প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন এবং সরকারও আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে, তখন বিষয়টি ঘিরে উদ্বেগ আরো বেড়ে যায়।
তবে এ সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে, যা দুর্নীতির অভিযোগের বাইরেও বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। সেটি হলো এসডিএফের কার্যকারিতা। ২৫ বছরে প্রতিষ্ঠানটি যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে, তার বিপরীতে দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক ক্ষমতায়ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে প্রকৃত অবদান কতটা ছিল—সে প্রশ্নের একটি স্বাধীন ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নও জরুরি হয়ে পড়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান কত টাকা ব্যয় করেছে, সেটি সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, সে ব্যয়ের মাধ্যমে মানুষের জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
এখানে বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন এসডিএফের অধীন কার্যক্রমগুলোর অর্থায়নের উৎস। এসডিএফের অধিকাংশ বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে বৈদেশিক ঋণের অর্থে। সরকার উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে সে অর্থ এসডিএফকে অনুদান হিসেবে দিয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পের টাকা মাঠ পর্যায়ে ব্যয় হয়ে গেলেও ঋণ পরিশোধের দায় এসে পড়েছে রাষ্ট্রের ওপর। ফলে প্রকল্প ব্যর্থ হলে বা প্রত্যাশিত ফল না দিলেও তার মূল্য শেষ পর্যন্ত পরিশোধ করতে হয়েছে সরকার তথা জনগণকে। যে কারণে এ ধরনের প্রকল্পের ক্ষেত্রে ব্যয়ের বিপরীতে প্রত্যাশিত সুফল নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশে অতীতে দারিদ্র্য বিমোচনমূলক বিভিন্ন কর্মসূচির অভিজ্ঞতা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পসহ বিভিন্ন উদ্যোগে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর জন্য আরো শক্তিশালী জবাবদিহি ও মূল্যায়ন কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এসডিএফকে ঘিরে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখায় যে এ কাঠামো আজও অনুপস্থিত। বছরের পর বছর ধরে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জবাবদিহির বাইরে থেকে যাচ্ছে। প্রকল্প হয়ে উঠছে দুর্নীতির বড় উৎস।
এসডিএফের পরিচালন কাঠামো নিয়েও পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই এর বোর্ড ও শীর্ষ নেতৃত্বে আমলাতান্ত্রিক প্রভাব প্রবল। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ধীরে ধীরে লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক উদ্যোগের পরিবর্তে প্রকল্পনির্ভর প্রশাসনিক কাঠামোয় রূপ নেয়। তখন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব রক্ষা, জনবল ধরে রাখা এবং নতুন প্রকল্প সংগ্রহই অগ্রাধিকার পেতে শুরু করে। এসডিএফের ক্ষেত্রেও এমন প্রবণতা তৈরি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সরকার বর্তমানে অভিযোগগুলোর তদন্ত করছে। তদন্ত অবশ্যই নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও পেশাদার হতে হবে। কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব যেন তদন্তকে প্রভাবিত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে শুধু ব্যক্তি পর্যায়ের দায় চিহ্নিত করলেই চলবে না; প্রতিষ্ঠানটির কাঠামোগত দুর্বলতা, পরিচালন পদ্ধতি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের মডেলও মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে।
প্রয়োজনে এসডিএফের জন্য একটি স্বাধীন ফরেনসিক অডিট পরিচালনা করা যেতে পারে, যেখানে গত দুই দশকের প্রকল্পগুলোর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব, ব্যয়ের কার্যকারিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল পর্যালোচনা করা হবে। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমান কাঠামোয় চলবে, সংস্কার করা হবে, নাকি এর কার্যক্রম অন্য কোনো কাঠামোয় স্থানান্তর করা হবে। বিশেষ করে গত দুই দশকে দেশে নানা পর্যায়ে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু রয়েছে। নতুন সরকার আসার পর নতুনভাবে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো বহু উদ্যোগ নিয়েছে। সেসব কর্মসূচি থেকে এসডিএফের কার্যক্রম কীভাবে ভিন্ন সেটি স্পষ্ট করা জরুরি। যদি খুব বেশি ভিন্ন না হয়, তাহলে একই কাজের জন্য আলাদাভাবে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কেবল সরকারি কোষাগারের ওপরই চাপ বাড়ায়। সুতরাং সামগ্রিকভাবে এসডিএফের বিষয়ে পুনর্মূল্যায়নে যাওয়া সমীচীন হবে।
পাশাপাশি রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদ ও ক্রমবর্ধমান ঋণের বাস্তবতায় উন্নয়ন ব্যয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এটি সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়া প্রয়োজন। কেননা এসডিএফকে ঘিরে বর্তমান বিতর্ক তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নয়, বরং উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালনায় সুশাসন ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। যথাযথ তদন্ত ও কার্যকারিতা মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রকৃত পরিস্থিতি জেনে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। সে সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকবে প্রকৃত উপকারভোগীদের জীবনমানের উন্নয়ন।










