স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় থেকে এ পর্যন্ত চিকিৎসা অবকাঠামোর বেশ উন্নয়ন ঘটেছে। স্বাস্থ্যসেবা খাতের আকার সম্প্রসারণ হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে প্রান্তিক পর্যায়ের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোয় বরাবর দেখা গেছে জনবল সংকট। বিশেষত চিকিৎসক সংকটে রোগীরা মানসম্মত সেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন। বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ৫০ শয্যাবিশিষ্ট রংপুর বিভাগের দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন গড়ে ৮০-৯০ রোগী ভর্তি থাকে। এর বিপরীতে নিয়মিত চিকিৎসক রয়েছেন কেবল তিনজন। তাদের মধ্যে আবার কেউ না কেউ প্রায়ই ছুটিতে কিংবা অন্যান্য কারণে অনুপস্থিত থাকছেন। যদিও ফুলবাড়ীর ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক, নার্স ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীসহ সরকারি মঞ্জুরীকৃত পদ ১৮২টি। কিন্তু এর প্রায় অর্ধেক পদই বছরের পর বছর ধরে ফাঁকা রয়েছে। রংপুর বিভাগের অন্যান্য উপজেলার স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোরও প্রায় একই অবস্থা পরিলক্ষিত হয়েছে। এদিকে খুলনা বিভাগের উপজেলাভিত্তিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ১ হাজার ৩২৭টি চিকিৎসক পদের মধ্যে ৮৯৬টিই শূন্য। আবার বান্দরবান জেলার সদর হাসপাতালসহ ছয় উপজেলা স্থাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকসহ তিন শতাধিক জনবল সংকট রয়েছে।

কেবল রংপুর, খুলনা বা বান্দরবানের উপজেলাভিত্তিক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর এমন দশা নয়, দেশের প্রায় সব উপজেলার স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিত্র এমনই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য থেকে তা আরো বেশি প্রতীয়মান হয়। সংস্থাটির তথ্যমতে, দেশের উপজেলাভিত্তিক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর প্রায় ৫৯ শতাংশ চিকিৎসক পদই ফাঁকা। সবচেয়ে বেশি পদ শূন্য বরিশাল ও রংপুর বিভাগে। বরিশালে ৭৩ দশমিক ৬ শতাংশ পদই শূন্য। রংপুরে ৭০ শতাংশ পদের বিপরীতে চিকিৎসক নেই। এছাড়া খুলনা বিভাগে ৬৭ দশমিক ৫ শতাংশ, রাজশাহী বিভাগে ৬৩ দশমিক ৭ শতাংশ, সিলেট বিভাগে ৬১ দশমিক ৬ শতাংশ চিকিৎসক পদ ফাঁকা পড়ে আছে। সে তুলনায় ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম বিভাগের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর চিত্র কিছুটা ভালো। এ দুই বিভাগে চিকিৎসকের শূন্য পদের হার যথাক্রমে ৫৮ দশমিক ৩ ও ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ।

অভিযোগ রয়েছে, পদায়ন করা হলেও এসব অঞ্চলের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোয় চিকিৎসকরা বেশি দিন থাকতে চান না। চিকিৎসকসহ প্রায় সব সরকারি চাকরিজীবীর বিরুদ্ধেই প্রধান অভিযোগ, তারা ঢাকায় থাকতে চান। যে কারণে ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোর অনেক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পদের তুলনায় বেশি চিকিৎসক কর্মরত। এর পরও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ পদই শূন্য পড়ে আছে।

সাদা চোখে দেখে বলা যায়, অর্ধেকেরও কম চিকিৎসক নিয়ে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা বেশ কঠিন। উপরন্তু দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় এমন জনবল সংকট প্রান্তিক মানুষের সুচিকিৎসা পাওয়াকে দুর্লভ করেছে। এমনকি বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কোনো বিশেষজ্ঞ নেই। সেখানে জুনিয়র চিকিৎসকরা প্রাথমিক চিকিৎসার জন্যও অনেক সময় রোগীদের জেলা সদর হাসপাতাল কিংবা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। যে কারণে সদর হাসপাতালগুলোয় সবসময়ই সক্ষমতার বেশি রোগী ভর্তি থাকে। অন্যদিকে কিছু ক্ষেত্রে রোগীর তাৎক্ষণিক চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। কিন্তু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে প্রায়ই চিকিৎসক না থাকায় অনেক রোগীর মৃত্যুও হয়।

দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসক সংকট দূর করতে গত ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। বিসিএসের মাধ্যমে দুই হাজার চিকিৎসক নিয়োগের জন্য এরই মধ্যে পাবলিক সার্ভিস কমিশনে চিঠি দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বিসিএস থেকে আরো সাড়ে তিন হাজার চিকিৎসক নেয়ার পরিকল্পনা। সেই সঙ্গে একাডেমিক পদায়নের জন্যও সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি করছে বলে স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়। তবে সংশ্লিষ্টদের থেকে এ উদ্যোগের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ চিকিৎসক নিয়োগের গতি কেমন তা নিয়ে এক প্রকার ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। তাছাড়া নতুন নিয়োগের বিষয়টি সময়সাপেক্ষও বটে। এমন পরিস্থিতিতে বরং প্রয়োজন দায়িত্বপ্রাপ্ত সব চিকিৎসকের নির্দিষ্ট কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করা। চিকিৎসকের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত সব কর্মীর উপস্থিতিও নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য পেশাদার চর্চা ও জবাবদিহিতা থাকতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিরা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারলেও স্বল্প আয়ের মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা সরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো। কিন্তু পর্যাপ্তসংখ্যক চিকিৎসক ও কর্মীর অনুপস্থিতিতে এসব হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের ভোগান্তি বহুলাংশে বেড়ে যায়। দেশের স্বাস্থ্য খাতে এমনিতেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও কর্মীর অভাব রয়েছে, যা বিগত সরকার পতনের প্রেক্ষাপটে আরো তীব্র হয়েছে। এর মধ্যে হাসপাতালগুলোয় প্রায় অর্ধেক জনবলই যদি অনুপস্থিত থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই কেবল নিয়োগ নিয়ে এ সংকট মোকাবেলা করা যাবে না। তাই সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোয় চিকিৎসক, নার্স এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুপস্থিতি সমস্যা কাটাতে জোরালোভাবে তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের আরো কঠোরতা আবশ্যক। যারা দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও নিতে হবে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছেন, দায়িত্ব পালনে অবহেলাকারীদের শাস্তি না হওয়ায় উদ্বেগজনক এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে শক্ত তদারকির অভাব। দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের দক্ষতায়ও ঘাটতি রয়েছে। এমন অনুপস্থিতি গ্রহণযোগ্য নয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উচিত সব চিকিৎসক ও সেবাদানকারীর যথাসময়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করা।

উপস্থিতি নিশ্চিতের পাশাপাশি খুঁজে বের করতে হবে কেন চিকিৎসকরা প্রান্তিক এলাকায় গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দিতে উৎসাহ পাচ্ছেন না। কেনই-বা তাদের বিরুদ্ধে কর্মস্থলে না থেকে বেশির ভাগ সময় ঢাকা বা ঢাকার আশপাশের জেলায় থাকার অভিযোগ উঠছে। আবার ঢাকার আশপাশে চিকিৎসকের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও সেটিও পর্যাপ্ত নয়। সুতরাং উপজেলাগুলোয় চিকিৎসকদের সেবা প্রদানের অন্তরায়গুলো চিহ্নিত করা আবশ্যক এবং সে অনুযায়ী সমাধানের পথে হাঁটতে হবে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় জনবল সংকটের সমস্যা দীর্ঘদিনের। যার ফলে গ্রামাঞ্চলের মানুষ যথাযথ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হন, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।