জ্বালানি তেলের সরবরাহের ওপর পরিবহন, বিদ্যুৎ সরবরাহ, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে যাপিত জীবনের নানা অনুষঙ্গ জড়িত। তাই জ্বালানি পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে এর নেতিবাচক প্রভাব হয় বহুমুখী। এরই মধ্যে সরবরাহ ঘাটতির কারণে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপতে শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতিতে নানা মহলে অভ্যন্তরীণ তেল-গ্যাসের উৎস অনুসন্ধান এবং তার সক্ষমতা ব্যবহারের তাগাদা আসতে শুরু করে। বিষয়টিকে ১৮০ দিনের পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার দিয়েছে সরকারও। গ্যাসের স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে এবং ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি কমাতে স্থলভাগ ও সাগরের ব্লকগুলোয় আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে চায় সরকার। এজন্য প্রস্তুত রয়েছে পেট্রোবাংলাও। এখন অনুমতির অপেক্ষা। এমন এক জটিল সংকটে আশু সমাধানের লক্ষ্যে নেয়া সরকারের এ উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। বিষয়টিকে আগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে হবে।
স্বাধীনতা অর্জনের দুই বছর পর আরব-ইসরায়েল (ইয়োম কিপুর) যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে প্রথম তেল সংকট দেখা দিয়েছিল। সদ্য স্বাধীন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হিসেবে পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া তখন বড় ধাক্কা খায়। পরবর্তী সময়ে আশির দশকের শেষ পর্যায়ে ইরান বিপ্লবের সময় তেলের দাম দ্বিগুণ হওয়ায় দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কৃষি অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়ে। সেখান থেকেও কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর পর আবার পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় কুয়েত থেকে জ্বালানি পণ্য সরবরাহ কমে যায়। এ সময় সরকারকে বাধ্য হয়ে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি ও কঠোর বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী নীতি অবলম্বন করতে হয়েছিল।
যখনই মধ্যপ্রাচ্য বা অন্য জ্বালানি তেল রফতানিকারক অঞ্চলগুলোয় সংঘাত ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়, তার প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতিতে। কারণ জ্বালানি পণ্যের চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে আমরা এখনো পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। বাংলাদেশের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি পণ্যের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর জন্য অতীতে সব সরকারই আমদানির দিকে ঝুঁকেছে। জ্বালানি সংকট নিরসন ও জ্বালানি নিরাপত্তা বিধানে অনেক পদক্ষেপ নেয়া হলেও সেগুলো ছিল আমদানিনির্ভর। বিভিন্ন বড় প্রকল্পের মূল কাঁচামাল হিসেবে যেসব জ্বালানি পণ্য (এলএনজি, এলপিজি, কয়লা) ব্যবহার করা হয়, সেগুলোও আমদানির মাধ্যমেই আনা হয়। আমদানিনির্ভরতা বাড়তি ব্যয় আকারে অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ায়। তা সামলাতে হয় সাধারণ মানুষকে। তাই ব্যয়বহুল জ্বালানিনির্ভরতা টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সহায়ক নয়। সরকার যেখানে রফতানিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে অগ্রসর হচ্ছে, সেখানে উৎপাদন ব্যয়কে আন্তর্জাতিক মানের পর্যায়ে রাখতে হবে। সেটি অর্জন করতে অবশ্যই প্রতিযোগিতামূলক দামে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, যা আমদানিনির্ভরতার মাধ্যমে সম্ভব নয়। এতে জাতীয় অর্থনীতির ওপর যে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে, তা মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
আমদানিনির্ভর বাস্তবতা বিবেচনায় আমাদের অভ্যন্তরীণ তেল-গ্যাসের উৎস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করতেই হবে। বর্তমানে জ্বালানি পণ্যের সরবরাহ ঘাটতির আশু সমাধানে সরকার বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। পেট্রোবাংলার সক্ষমতা ঘাটতির কারণে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বহুজাতিক সংস্থার দারস্থ হতে হচ্ছে। তৈরি পোশাক খাত ও সড়ক অবকাঠামো নির্মাণে যেমন আমরা বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দক্ষতা রপ্ত করেছি, তেমনি তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে নিজস্ব দক্ষতা বাড়াতে হবে।
জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা থেকে সহসাই হয়তো আমরা বের হতে পারছি না, কিন্তু তার ওপর অতিনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে হবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ও সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) পূরণে আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দিতে হবে। স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সরকারের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। এরই মধ্যে সরকার সমুদ্রের তলদেশের জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধানে মাল্টি ক্লায়েন্ট সাইসমিক সার্ভে পরিচালনা করছে। নিজস্ব এ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দেয়া হচ্ছে। কেবল ড্রিলিং নয়, নতুন নতুন সম্ভাব্য ক্ষেত্র খুঁজে বের করতে সাইসমিক সার্ভেতে জোর দেয়া হচ্ছে। এসব অনুসন্ধানের মাধ্যমে আমাদের সম্ভাবনা শনাক্ত করা গেলেও পরিকল্পনার ফল বাস্তবায়নের কার্যক্রম সীমিত। তেল-গ্যাসের উৎসের সম্ভাবনা খুঁজলেই সমাধান হবে না। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ও আগ্রহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। সেক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো সমন্বয়ের মাধ্যমে বাণিজ্যিক কূটনীতি পরিচালনা করতে পারে।
দেশীয় সম্পদ আহরণে নীতিগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। তবে অনুসন্ধানের পর একটি পরিকল্পনার আলোকে সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। এক্ষেত্রে জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগের রাজনৈতিক সদিচ্ছা আবশ্যক। নীতিমালা প্রয়োগ করে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সফলভাবে জ্বালানি সক্ষমতা অর্জনের উদাহরণ আমাদের সামনেই রয়েছে। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশ ভিয়েতনাম ‘মডেল পিএসসি’ সংস্কার করে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় মুনাফা নিশ্চিত করে। পরবর্তী সময়ে রাশিয়ার মতো দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় দক্ষিণ চীন সাগরে দ্রুত অনুসন্ধান চালায়। দেশটি এভাবেই নিজস্ব খনি থেকে জ্বালানি গ্যাসের চাহিদা পূরণ করতে পেরেছে। বর্তমানে তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহারে আরো বেশি জোর দিয়েছে। একইভাবে কম্বোডিয়াও নবায়নযোগ্য জ্বালানি তথা সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ ও জলবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে শিল্প খাতের জ্বালানি চাহিদা মেটাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ায়ও সমরূপ অবস্থা। দেশটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার প্রাধান্য থাকলেও ধীরে ধীরে জলবিদ্যুৎ ও জিওথার্মালের ব্যবহার বাড়ছে। এসব ক্ষেত্রে তারা দেশীয় উৎসনির্ভর। ফলে সেসব দেশে জ্বালানি ব্যয় আপেক্ষিকভাবে কম। এটি তাদের অর্থনীতিকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশ ভারত ‘হেল্প’ পলিসির মাধ্যমে তাদের তেল-গ্যাস ব্লকগুলোয় আমদানিনির্ভরতা কমিয়েছে। এজন্য দেশটি ‘ওপেন অ্যাক্রেজ লাইসেন্সিং’ পদ্ধতি চালু করে বিনিয়োগকারীদের পদ্ধতিগত জটিলতা কমিয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারও নীতিমালা পর্যায়ে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, যা আশাব্যঞ্জক। পেট্রোবাংলা ‘মডেল পিএসসি ২০২৬’-এ গ্যাসের দাম ব্রেন্ট ক্রুডের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের অংশ হিসেবে শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের হার কমানোর মতো সংস্কার এনেছে। নীতিগত এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করলে বিদেশী কোম্পানিগুলো এখানে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে। তবে কেবল দরপত্র আহ্বানই যথেষ্ট নয়, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। বাংলাদেশের নিজস্ব অনবায়নযোগ্য জ্বালানি আহরণের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও সেগুলো বরাবরই আলোচনায় সীমাবদ্ধ ছিল। বিভিন্ন সময়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে তেল-গ্যাস বা জ্বালানি সম্পদ আহরণের পরিকল্পনা নেয়া হলেও সেগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতি নেই। কেন এমনটি হয়েছে তার জবাব কোনো সরকারই দেয়নি। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা প্রসঙ্গে সাধারণ মানুষের মনেও এক ধরনের অনাস্থা কাজ করে। এ জটিলতা কাটাতে তথ্যের স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দেয়ার বিষয়েও সরকারকে ভাবতে হবে। অতীতের সরকার বা সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতা বা ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারকে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। নানা কারণে সরকারের পক্ষে এখনই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের আশু সমাধান সম্ভব নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার ব্যবহার এবং একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য উৎস ব্যবহারের পথে আমাদের হাঁটতেই হবে। সে পথ যেন সুগম হয়, সেজন্য এখন থেকেই তোড়জোড় শুরু করতে হবে।










