২০২৬-২৭ অর্থবছরের বিশাল বাজেটে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে জোর দেয়ার কথা বলছে। এ খাতের জন্য বাজেটের প্রস্তাবনাগুলোকে কীভাবে দেখছেন?
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বাজেট ঘিরে আমাদের অনেক আগ্রহ ছিল। সবকিছু গোলমেলে হয়ে গেল এসআরও পড়ে। প্রতি বছরই বাজেটে এ খাত নিয়ে সরকারের পরিকল্পনাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখানো হয়। এ খাতে দীর্ঘদিন কাজ করছি। এটিকে বাণিজ্যিকীকরণের আঙ্গিকে এখনো দেখি না। আগ্রহের জায়গা থেকে কাজ করছি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি আমাদের অর্থনীতির ভবিষ্যতের জন্য বড় সুযোগ। এটিকে জনপ্রিয় করতে পারলে অর্থনীতি লাভবান হবে। জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর জরুরি। সরকারও সম্ভবত সেটাই চাচ্ছে।
লক্ষ্যমাত্রা এখনো ঠিক পথেই রয়েছে। মূল প্রশ্ন হচ্ছে, এ লক্ষ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমরা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যাচ্ছি কিনা। আমলাতন্ত্রকে অনেকে গালমন্দ করলেও আমি সেভাবে ভাবি না। প্রশাসন এসআরও দেবে। এখানে একটা বিষয় লক্ষ করা জরুরি। জীবাশ্ম বা অনবায়নযোগ্য জ্বালানি আমদানিতে আমাদের কর দিতে হয় না। সরকার উল্টো ভর্তুকি দেয়। অনেক সময় শুল্কছাড় দেয়া হয়। অথচ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে এমন একটা এসআরও থেকে কিছু কিছু মানুষ ভর্তুকি পাবেন আর তারাই সুবিধাভোগী হবেন। অর্থাৎ করপোরেট পর্যায়ে যারা আছেন তারা শুল্ক ছাড়াই নবায়নযোগ্য জ্বালানির জিনিসপত্র আমদানি করতে পারবেন। ট্যাক্স হলিডেও পাবেন। এগুলো লক্ষ্যমাত্রার মাধ্যমে আসবে। এদিকে প্রান্তিক পর্যায়ে যদি সাধারণ মানুষের কাছে এটিকে জনপ্রিয় করা যায় তাহলে অন্তত ৫-১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করার সুযোগ আছে। ক্ষেত্রবিশেষে তা বেশিও হতে পারে। এজন্য তাদের নেট মিটারিং প্রয়োজন হয়তো হবে না। অনেককে আর সরকার থেকেও বিদ্যুৎ কিনতে হবে না। বিকল্প এসব উপায়েও সরকার সাধারণ মানুষের সহযোগিতা আদায় করে নিতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের ওপর কর বসিয়ে দেয়া হয়েছে। অন্তত এ সরকারের পুরো সময়টা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট যত পণ্য আছে সেগুলোর ওপর যদি কর শূন্য রাখা হয় তাহলে নানা খাতে ইতিবাচক ফল মিলবে। সাধারণ মানুষের জন্যও এর কেনা সহজ করলে সুফল আরো বড় পরিসরে মিলবে।
সাধারণ মানুষের মনে এটাই ক্ষোভ। ধনী গোষ্ঠীকে কোনো ধরনের কর দিতে হচ্ছে না। অথচ সাধারণ মানুষকে নানা ধরনের কর দিতে হচ্ছে। এ নিয়মটা কে তৈরি করছে? নিশ্চয়ই সরকারকে কেউ হয়তো ভুল পরামর্শ দিয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে আমার একটিই কথা, আমরা এটিকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চাই।
প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের মাঝে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটাতে হলে আমরা কী করতে পারি?
প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি কাঠামো নির্মাণে আর্থিক সুবিধা দিতে হবে। এমনিতে বড় বড় পক্ষ বা প্রতিষ্ঠান চাইলে ঋণসুবিধা পাবে। তাদের নানা ধরনের নমনীয় শর্তে ঋণ দেয়ার পাশাপাশি ক্রেডিট দেয়া হয়। এটা সত্য, বড় প্রতিষ্ঠান ৫ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন করার সক্ষমতা রাখে। এর বেশি সম্ভব নয়, কারণ তাদের পর্যাপ্ত ভূমি নেই। রেস্কো, আইপিপি ও পিপিপি মডেলেও করতে পারে। এর বাইরে আনুমানিক দেড়-দুই হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি গ্রামাঞ্চল থেকে উৎপাদনের সুযোগ দেখা যাচ্ছে। সেটা সাধারণ গ্রাহকদের মাধ্যমে উৎপাদন করার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে লাভবান হওয়া যাবে। এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জায়গায় উৎপাদনের গতি আনলে জ্বালানি খাতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের যে চাপ তা কিছুটা হলেও আমরা কমিয়ে আনতে পারি। সাধারণ মানুষের উপকার হবে। সবার জন্য শুল্কছাড় দিলে কোনো ক্ষতি নেই, বরং লাভের পাল্লা বড়। আগামী আট-দশ বছরের হিসাবেও এ খাত থেকে আনুমানিক ২০০-২৫০ কোটি টাকার বেশি কর আদায় হবে বলে এখনো মনে হচ্ছে না। যা-ই আদায় হবে সেটিও আমাদের রাজস্বে বেশি মূল্য সংযোজন করবে না। তাই সব পর্যায়েই নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামোতে অর্থায়ন নিশ্চিত করলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর বাড়বে।
প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে ট্যাক্স হলিডে দেয়ার দরকার নেই। এ সুবিধা বড় গোষ্ঠীগুলো নেবে। তবে সমহারে কর যেন নিশ্চিত হয় সেদিকে নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ দেয়া দরকার। গ্রামাঞ্চলে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট সোলার হলে ধরে নেয়া যায়, আগামী ২৫ বছর জীবাশ্ম জ্বালানি আর আমদানি করতে হবে না। এভাবে খরচ কমিয়ে রিজার্ভ বাড়ানোর সুযোগ আমাদের হাতে থাকবে।
এ কর ছাড় দেয়ার ফলে রাজস্ব আয় বাড়ানোর সুযোগটা কি থাকবে?
নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামোয় শুল্কছাড় দিলে অন্য অনেক খাতে অর্থ সাশ্রয়ের সুযোগ মিলবে। বরং সরকারের হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের সুযোগ বাড়বে। কৃষি খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার থাকলে সেচের জন্য ডিজেল কিনতে হবে না। তখন বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়ও হবে। জ্বালানি নিরাপত্তাও নিশ্চিত হচ্ছে। মানুষ নিজ অর্থায়নেই করে ফেলছে। তাই এমন উদ্যোগ নেয়ার ক্ষেত্রে শুল্ক আরোপের মতো বাধা রাখা ঠিক হবে না।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে পাকিস্তান, ভারত এমনকি ভিয়েতনাম যে সাফল্য দেখিয়েছে তা আমরা কেন দেখাতে পারলাম না?
আমরা উদাহরণ দিতে ভালোবাসি। সেটা থেকে শিক্ষাটা নিই না। পাকিস্তান কি এ খাতে কোনো শুল্ক আরোপ করেছে? বরং তারা উৎসাহ দিয়েছে। নানা পক্ষকে বুঝিয়েছে, যেভাবেই পারেন আপনারা অবকাঠামো গড়েন। আমাদের ওপর থেকে চাপ সরান। জ্বালানি চাহিদা মেটাতে গিয়ে তো তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছিল। সরকার যখন এমন ফ্রি অ্যাকসেস দিয়ে দিল তখন পাকিস্তানের মানুষও আগ্রহী হয়েছে। সেখানে কিন্তু সরকার কোনো বিনিয়োগও করেনি। তবুও এটি জনপ্রিয় হয়েছে। এখন তারা ৩০ গিগাওয়াট পিক বিদ্যুতের চাহিদা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের মাধ্যমে পূরণ করে। বাংলাদেশেও এমনটি করলে অসুবিধা কোথায়? আমরা এখনো সিদ্ধান্তহীনতার স্থবিরাবস্থা থেকে বের হতে পারছি না। সমস্যাটি কি রাষ্ট্রযন্ত্রের নাকি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার, এ বিষয়টাও স্পষ্ট নয়। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর ৩১ দফাতে স্পষ্ট বলা আছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরের জন্য সব ধরনের উদ্যোগ নেয়া হবে। এমন স্পষ্ট বক্তব্য থাকার পর এসআরওর মাধ্যমে শুল্ক আরোপ উচিত হবে না। সরকারের টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) নামে একটি সংস্থাও আছে। স্রেডাও এখন এই এসআরওর কারণে বিপদে পড়েছে। কারণ ব্যয় তো বাড়ছে। সুযোগ দেয়া হলেও সেটা সীমিত। এখানে কোথাও না কোথাও সমন্বয়ের বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরে আগ্রহের কমতি আছে বলে মনে হয় না। সমস্যাটা অন্য কোথাও।
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্বজুড়েই জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। তখন আমাদেরও নানা আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে পড়ার শঙ্কা জেগেছিল। তখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরের আলোচনা অনেক গুরুত্ব পায়। ওই সময় কি এ খাতের বাণিজ্যিকীকরণ বেড়েছে? কোনো উদ্যোগ কি দেখেছেন?
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত কিছুটা হলেও গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রতিদিনই কেউ না কেউ জানতে চান কীভাবে তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। অবকাঠামো স্থাপনের খরচ নিয়ে অনেকের কিছু দ্বিধা আছে। কিন্তু এখন অনেকেই এ নিয়ে কাজ করছে। ওই সময় আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের অনেক মেম্বারের কাছে কিছু মজুদ ছিল, সেগুলো শেষ হয়ে গেছে। এখন আবার কিছুটা শিথিল অবস্থায় রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এমনকি গ্রাহকরাও ভেবেছিল বাজেটে কোনো শুল্ক রাখা হবে না। অর্থমন্ত্রী সেটাই তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন। কিন্তু এসআরওতে গিয়ে দেখা গেল, এ শূন্য একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য। সাধারণ গ্রাহকের ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানি পণ্যের দাম আগের চেয়ে বেড়েছে। যেমন সোলার প্যানেলে আগে ১৩ শতাংশ শুল্ক ছিল, এখন ১৭ শতাংশ। ওয়েট বেসিসে সম্ভবত ৩০-৩২ শতাংশে যেতে পারে। আবার ইনভার্টারে শুল্ক গত বছর ২৮ শতাংশ ছিল, এ বছর তা ৩৮ শতাংশ। এদিকে যারা এসআরওর অধীনে তাদের ওপর শুল্ক নেই। পুরোপুরি ভজঘট পাকানো অবস্থা। এজন্য আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের অংশীজনরা হতাশ। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রতি ভালোবাসা থাকায় আমরা এ বাণিজ্যে আছি। ফলে আমরা সুযোগ-সুবিধা বেশি পাব—এমনটা প্রত্যাশা করাটা দোষের নয়। কিন্তু যখন একটা গোষ্ঠীকেই সুবিধা দিতে দেখি, তখন হতাশ হতে হয়।
সোলার স্থাপনের ক্ষেত্রে ভূমি সংকট আমাদের জন্য চিন্তার বিষয়। এ স্বল্পতার মধ্যেও সোলার স্থাপনে আমাদের করণীয় কী কী?
এটা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। ভূমি সংকট থাকলেও যে যার সুযোগ অনুযায়ী সোলার প্যানেল স্থাপন করার বিষয়ে ভাবছে, কৌশল নির্ধারণ করছে। ভূমি স্বল্প অজুহাত দিয়ে তাই বাধা দেয়ার প্রয়োজন কোথায়? এসআরওতে সবার জন্য সমান অধিকার কেন এল না? দেশে যদি বিদ্যুতের চাহিদা ৫০ গিগাওয়াট হয়ে থাকে তার ৩০-৪০ শতাংশ আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে পূরণের চিন্তা করছি। অর্থাৎ অন্তত ২০ গিগাওয়াট সোলার বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে আনব। যখন সেটা করতে পারব তখন সুবিধা মিলবে। বর্তমানে আমরা প্রায় ১০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে পাই। এটারই পূর্ণাঙ্গ ব্যবহারে বাধা কোথায়? আমাদের ভূমি নেই এ চিন্তা আরো পাঁচ-দশ বছর পর করতে হতে পারে। আপাতত অফশোর এলাকাগুলো তো আমরা অনুসন্ধান করতে পারি। কোনো না কোনো সুযোগ তো আমরা খুঁজে বের করতেই পারব। আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগে গ্রামের কেউ কি সোলার প্যানেল কিনতে পারতেন? এখন তো পারছেন। প্রযুক্তিতে পরিবর্তন আসছে বলে গ্রাহকের ক্রয়সাধ্যের মধ্যে আনা যাচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে আরো উন্নতি হবে। হয়তো নদীর পাড়ঘেঁষে আমরা সোলার স্থাপন করে ফেলতে পারব।
শহরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো গড়ার সম্ভাবনা কেমন? মানে বিভিন্ন অবকাঠামোর ফাঁকা জায়গা ব্যবহার কিংবা অবকাঠামোকে এ কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ক্ষেত্রে কী উদ্যোগ নেয়া যায়?
শহরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে স্বয়ংসম্পূর্ণতা পাওয়া কঠিন। কারণ শহরে জায়গা অনেক কম। পাঁচ কাঠা জমির কোনো ভবনে ২০০ কিলোওয়াট লোড থাকলে সেখান থেকে অন্তত ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ সোলার থেকে মিলবে। সেটাও তো জ্বালানি উৎপাদনে কিছুটা হলেও সহযোগিতা করবে। বাংলাদেশের নগরাঞ্চল উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের সময় ভবন অবকাঠামোকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সঙ্গে সমন্বয়মূলক রাখা হয়নি। এক্ষেত্রে আমি বরাবরই রাজউকের কথা বলি। রাজউক কিছু নিয়ম বেঁধে দিতে পারে। শহরে কোনো ভবন নির্মাণ করা হলে তার ছাদে যেন অন্তত ১০-১৫ কিলোওয়াটের সোলার প্যানেল সহজেই বসানোর সুযোগ থাকে। নকশাটা সেভাবে করতে হবে। স্থাপত্যবিদ্যার আঙ্গিকে ছাদের নান্দনিক সৌন্দর্য নষ্ট না করেও এটা করা যায়। এখানে সুবিধা হবে, প্লাগ অ্যান্ড প্লের মতো। এভাবে প্রতিটি ভবনে এমন সুবিধা দিলে ঢাকার বিদ্যুৎ চাহিদার বড় অংশ পূরণ হয়ে যাবে।
আবার অনেক বাড়িতে আনুমানিক ১০-২০ লাখ টাকা খরচে জেনারেটর বসানো হয়। জেনারেটরে অর্থায়ন না করে আমরা সোলারে বিনিয়োগ করলে আরো বেশি সুবিধা পাওয়া যাবে। জেনারেটর পরিচালনার খরচ আছে। আর নবায়নযোগ্য জ্বালানি স্থাপনের পর খরচ প্রায় নেই বললেই চলে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে আমরা শুধু সোলার নিয়েই আলোচনা করছি। অন্যান্য উৎসের সম্ভাবনা কেমন?
অন্য কিছু উৎসের সম্ভাবনা আছে। সোলারে যতটা সম্ভাবনা সে তুলনায় কম বলে এটা নিয়ে আলোচনা বেশি। বায়ুর কথাই যদি ধরি। এ উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমাদের সক্ষমতা কম বা আমরা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারিনি। একটা উইন্ডমিলের জন্য ধারাবাহিক বায়ুপ্রবাহ দেশে নেই। দু-তিনটি পাইলটিং প্রকল্প আছে। সেগুলো খুব ভালো ফল দিতে পারেনি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে সহজলভ্য জলবিদ্যুৎ। এক্ষেত্রেও আমাদের খুব বেশি সুযোগ নেই। নেই বলেই এখন তিস্তা আর পদ্মার জলস্রোত ব্যবহারের আলাপ হচ্ছে। কিন্তু ওখানে স্রোতের ধারাবাহিকতা তো নেই। এজন্য বড় পরিসরে জলবিদ্যুতের সুবিধা নেয়ার সুযোগ আমাদের নেই। তবে উইন্ডমিলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটা সুবর্ণ সুযোগ অচিরেই আসবে। বাসাবাড়ির ছাদে ছোট ছোট উইন্ডমিল স্থাপন করা যাবে। তাতে ৫-১০ কিলোওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো যাবে। গোটা বিশ্বেই এটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে চালু আছে। বাণিজ্যিকভাবে আগামী দু-তিন বছরে পণ্যটি চালু হবে বলে বিশ্বাস। এমন হলে জায়গাও কম লাগবে আর সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। এটা আগামীতে আমাদের জন্য বড় সম্ভাবনা।
বর্জ্য রিসাইকেলের মাধ্যমে জ্বালানি উৎপাদন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ব্রাজিলে আখের বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন হচ্ছে। আমাদের এখানেও ইক্ষুর চাষ হয়। কৃষিবর্জ্যও কম নয়। এগুলো থেকে জ্বালানি আহরণের সুযোগ কতটা?
একেবারেই নেই বলা যাবে না। সব খাতেই কিছু না কিছু সম্ভাবনা থাকে। আমাদের এখানে যত্রতত্র বর্জ্য ফেলার প্রবণতা আছে। আমরা বর্জ্য সংরক্ষণ করি না, করতে জানিও না। দেশে এজন্য দুটি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। একটি মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল আরেকটা আমিনবাজার। দুটি দুই পদ্ধতিতে কাজ করবে। একটাতে মিথেন উৎপাদন হবে। অন্যটিতে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। এটার ব্যয় অনেক বেশি। তাও উদ্যোগটা ইতিবাচক। এখন ব্যয় বেশি হলেও করা দরকার। আমাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্যও তো কিছু উদ্যোগ নিতে হবে।
বর্জ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা কেমন হওয়া উচিত? বিশেষত শহরাঞ্চলের ড্রেনেজ সিস্টেমে যেন বর্জ্য না জমে এবং এগুলোর সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানি চাহিদা আমরা কীভাবে পূরণ করতে পারি?
অবশ্যই। আমাদের ভূমি অল্প। চাইলেই বড় জায়গাজুড়ে বর্জ্য সংরক্ষণ করতে পারব না। তাই বর্জ্য থেকে যদি জ্বালানি আহরণ করা যায় তাহলে ক্ষতি কি? উৎপাদনে আমার দু-তিন গুণ বেশি খরচ হোক। তাতেও তো ক্ষতি নেই। বাণিজ্যিকভাবে চিন্তা করলে এগুলো লাভজনক কিছু না। ফলে সরকারকেই এ ধরনের উদ্যোগ চালু রাখতে হবে। সরবরাহটাও তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ব্যবস্থাপনা সঠিক হলে এটাও একটা সম্ভাবনা।
আমাদের আখ শিল্পের অধিকাংশই উত্তরবঙ্গে। উত্তরবঙ্গকে কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করে বর্জ্য থেকে ২০ কিলোওয়াটের মতো বিদ্যুৎ আমরা উৎপাদন করব—এমন একটা লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। এভাবে ধীরে ধীরে উদ্যোগের প্রসার করতে হবে। এ উদ্যোগ বছরব্যাপী করা যায় না। নির্ধারিত মৌসুমে করতে হয়। মৌসুমে বর্জ্য সংগ্রহের জন্য সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। সরকার এ ধরনের উদ্যোগে ভর্তুকি ও আর্থিক সুবিধা দিলে অনেক প্রতিষ্ঠান আগ্রহী হবে। প্রাথমিক উদ্যোগ সরকারকে নিতে হবে। দক্ষিণ কোরিয়ায় যেমন ডাস্টবিনে নির্ধারিত বর্জ্য ফেলে আর্থিক প্রণোদনা মেলে। বাংলাদেশেও এমন কিছু করলে বর্জ্য সংরক্ষণের সুযোগ বাড়বে। নাগরিক কিছু সুবিধা না দিলে এমন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত কঠিন।
সরকার ২০৪০ সাল নাগাদ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায়। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রাথমিক অগ্রাধিকার কী হতে পারে?
নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো স্থাপনের যেকোনো পণ্যের ওপর শুল্ক একেবারেই রাখা যাবে না। অন্তত আগামী দুই বছর। জ্বালানি রূপান্তরের লক্ষ্যের কথা ভেবেই এমনটা করতে হবে। আগামী দুই বছরে বিনা শুল্কে পণ্য আনতে হবে। সরকার এর রিটার্ন অবশ্যই পাবে। অন্তর্বর্তী সরকার বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রথা বন্ধ করে গেছে। তাই গত দুই-এক বছরে কোনো ধরনের বৈদেশিক বিনিয়োগ আমরা পাচ্ছি না। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন নেই, সম্প্রসারণও ঘটছে না। সম্প্রসারণের আগ্রহ থাকলেও করা যাচ্ছে না। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে এখনো আমাদের সুযোগ কম। তাই প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বানের পথে হাঁটতে হবে। পেমেন্ট নিশ্চিত করে বিনিয়োগকারী আনতে হবে।
শিল্প খাতের বহুমুখীকরণ জরুরি। শুধু তৈরি পোশাক খাতই রফতানি আয় আনবে এমন নির্ভরতা ভবিষ্যতের জন্য টেকসই নয়। অর্থনীতির গতি বাড়ানোর জন্য আর শিল্পের প্রসারের জন্য জ্বালানি স্বনির্ভরতা অনেক জরুরি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি বড় সুযোগ। কার্বন ক্রেডিট নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করবে। আমাদের অর্থনীতি নাজুক অবস্থানে আছে। তাই এখন আস্থা ফেরানোর উদ্যোগ নিতে হবে আর বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে।










