আজ বিশ্ব খাদ্য দিবস। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ১৯৪৫ সালের এ দিনে প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠা দিবসকে স্মরণ করে ১৯৭৯ সাল থেকে দিবসটি পালন শুরু হয়। বিশ্ব খাদ্য দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘হাত রেখে হাতে, উত্তম খাদ্য ও উন্নত আগামীর পথে’। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো বৈশ্বিকভাবে ক্ষুধা, অপুষ্টি ও দারিদ্র্য দূর করা ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা।
বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এখনো ক্ষুধা, অপুষ্টি ও খাদ্য অপচয়ের মতো সমস্যা বিদ্যমান। একদিকে খাদ্যের প্রাচুর্য, অন্যদিকে অভাব—এ বৈষম্যই বর্তমান খাদ্য ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট। এফএওর তথ্যমতে, বর্তমানে প্রায় ৬৭৩ মিলিয়ন মানুষ নিয়মিত ক্ষুধায় ভুগছে। আরো কোটি মানুষ পুষ্টিকর খাদ্য পাচ্ছে না। জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, খাদ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও কৃষিজমি হ্রাস—সব মিলিয়ে বিশ্ব খাদ্যনিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলেছে। এমন বাস্তবতায় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
সবার জন্য খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষিতে উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। এজন্য কৃষিতে অগ্রসর প্রযুক্তির প্রয়োগ ও উদ্ভাবনে জোর দেয়া প্রয়োজন। আর টেকসই খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন বৈশ্বিক সহযোগিতা ও অংশীদারত্ব বাড়ানো। তবে টেকসই খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে কৃষক, গবেষক, সরকার, ব্যবসায়ী, তরুণ ও ভোক্তা—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সহিংস সংঘাত, মানবিক সহায়তায় কাটছাঁট, জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা খাদ্য সংকটের মূল কারণ। বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকট ক্রমেই ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। তাছাড়া জাতিসংঘের ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) মধ্যে দ্বিতীয়টি হলো ‘ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী’। নানা কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে এটি অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘ সমর্থিত গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিসের সর্বশেষ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বের ৫৩টি দেশের প্রায় ৩০ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখে। যাদের অনেকেই ক্ষুধা ও অপুষ্টিজনিত মৃত্যুর সরাসরি ঝুঁকিতে রয়েছেন। এমনকি ছয় বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে খাদ্য সংকট বাড়ছে। শুধু গত বছরেই নতুন করে ১ কোটি ৩৭ লাখ মানুষ চরম খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় পড়েছে।
খাদ্যনিরাপত্তা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেস ক্লাসিফিকেশনের (আইপিসি) তথ্য অনুযায়ী সবচেয়ে সংকটাপন্ন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত গতিতে বাড়ছে। এদের অধিকাংশই গাজা উপত্যকা ও সুদানে অবস্থান করছে। এছাড়া হাইতি, মালি ও দক্ষিণ সুদানের পরিস্থিতিও ভয়াবহ। সুদানে চলমান গৃহযুদ্ধের ফলে বর্তমানে দুই কোটিরও বেশি মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে, যাকে ‘দুর্ভিক্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। গাজা উপত্যকায়ও অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। মার্চে সব সীমান্ত বন্ধ করে দেয়ার পর এবং যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার কারণে সেখানে খাদ্য প্রবেশ একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া মিয়ানমার, নাইজেরিয়া ও কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে চলমান সহিংসতা খাদ্য সংকট আরো তীব্র করে তুলেছে। ইতালির রোমে খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সদর দপ্তরে বিশ্ব খাদ্য ফোরাম (ডব্লিউএফএফ) ফ্ল্যাগশিপ ইভেন্ট ২০২৫—এ তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। সেগুলো হলো যুব অংশগ্রহণ, বিজ্ঞান ও উদ্ভাবন এবং সহযোগিতামূলক বিনিয়োগ।
গত কয়েক দশকে কৃষি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি হ্রাস, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, আমদানি নির্ভরতা ও মূল্যস্ফীতির কারণে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। অতি দারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্য ক্রয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এমনকি মৌলিক চাহিদা পূরণেও তারা হিমশিম খাচ্ছে। এছাড়া খাদ্য অপচয় ও খাদ্যে ভেজাল বাড়ছে।
বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে খাদ্য উৎপাদন ও মাথাপিছু আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবু খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এখনো একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধির পরও তা মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। জনগণের একটি বড় অংশ এখনো পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্যের নাগালের বাইরে। খাদ্যপণ্যের ন্যায্য বাজারমূল্য নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। জাতিসংঘের এফএও, ইফাদ, ডব্লিউএফপি, ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফ প্রকাশিত ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস ২০২৫’ প্রতিবেদন অনুসারে, তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকা বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে চতুর্থ স্থানে আছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) দেয়া ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’ শীর্ষক পৃথক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে তীব্র খাদ্য সংকটে থাকা ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ চতুর্থ। দুই প্রতিবেদন অনুসারে, শুধু খাদ্যনিরাপত্তার সংকটেই নয়, স্বাস্থ্যকর বা সুষম খাদ্য গ্রহণের দিক থেকেও বাংলাদেশ পিছিয়ে। এ বিষয়ে সাত বছরে অনেকটা উন্নতি হলেও এখনো দেশের ৭ কোটি ৭১ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পায় না। দেশের ১০ শতাংশের বেশি মানুষ অপুষ্টির শিকার। জাতিসংঘের পাঁচ সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের ৫৩টি খাদ্য সংকটপীড়িত দেশ ও অঞ্চলের প্রায় ২৯ কোটি ৫০ লাখ মানুষ চরম খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি। এর মধ্যে তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার শিকার মানুষের সংখ্যা অনুযায়ী শীর্ষ পাঁচটি দেশ হচ্ছে—নাইজেরিয়া, সুদান, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, বাংলাদেশ ও ইথিওপিয়া।
দেশে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের অভাব। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা থেকে নিয়মিত যে পরিসংখ্যান দেয়া হচ্ছে তা অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্নবিদ্ধ। আমাদের জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধির হার, মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন, ভোগ ও বণ্টনের ক্ষেত্রে যে পরিসংখ্যান পাওয়া যায়, তাতে সাধারণ মানুষের পুরোপুরি আস্থা থাকে না। দেশের পণ্য উৎপাদন, চাহিদা এবং স্থিতির পরিসংখ্যান সম্পর্কে অতীতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার দৃষ্টান্ত রয়েছে। এক্ষেত্রে কৃষি পরিসংখ্যানের কথা উল্লেখ করা যায়। প্রায়ই বলা হয়েছে, বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। অথচ প্রায় প্রতি বছরই গড়পড়তা ৬০-৭০ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়েছে বিদেশ থেকে।
দেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ। প্রথমত, কৃষি উৎপাদন বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তি ও জলবায়ু সহনশীল বীজের ব্যবহার জরুরি। ক্ষুদ্র কৃষকের প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি করলে উৎপাদন ও আয় দুটোই বাড়বে। উদ্ভাবনে জোর দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, খাদ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো উন্নত করতে হবে, যাতে উৎপাদিত খাদ্য অপচয় না হয়। কৃষি শিল্পায়ন ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে কৃষিকে কৃষকের জন্য লাভজনক খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে কৃষকরা বাঁচলেই আমাদের খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তা সুসংহত ও শক্তিশালী থাকবে। তৃতীয়ত, বাজার ব্যবস্থা ও মূল্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কৃষক ও ভোক্তা উভয়ই ন্যায্য সুবিধা পান। চতুর্থত, পুষ্টি সচেতনতা বৃদ্ধি ও নিরাপদ খাদ্য প্রদানের কার্যক্রম চালু রাখতে হবে। পঞ্চমত, পরিবেশবান্ধব কৃষি ও টেকসই উৎপাদন পদ্ধতি গ্রহণে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্পর্ক ও সহযোগিতা জোরদার করতে হবে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও শিল্পায়নের ফলে তৃতীয় বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই কৃষিজমি কমছে। এতে অল্প জমিতে অধিক উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। অতি ফলনশীল কৃষিপণ্য উদ্ভাবন থেকে শুরু করে শহুরে কৃষি (আরবান এগ্রিকালচার) বা ছাদ কৃষি, জলজ কৃষি, ভার্টিকাল এগ্রিকালচারসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে হচ্ছে। কৃষিতে বিদ্যমান শ্রমিক সংকট মোকাবেলায় প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশকেও সেদিকে অগ্রসর হতে হবে। উন্নত বীজ উৎপাদনে গবেষণা বৃদ্ধি, ন্যানো টেকনোলজিসহ অগ্রসর প্রযুক্তির সহায়তা গ্রহণ, কৃষিকে তরুণদের কাছে আকর্ষণীয় পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাসহ সময়োপযোগী বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে হবে।










