নানা সমস্যায় জর্জরিত স্বাস্থ্য খাতের ওপরও পড়ে বাড়তি চাপ। গত বছর ডেঙ্গুর দাপট ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বিশেষত নভেম্বর মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছে। সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা মশক নিধন ও মশার উৎস ধ্বংসে নানা পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। কিন্তু সেসব বরাবরই ব্যর্থ হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপের লক্ষ্যে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের তত্ত্বাবধানে টাস্কফোর্সটি মাঠপর্যায়ে কার্যকর তদারকি, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়া, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো ও জরুরি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের কাজ করবে। ডেঙ্গু মোকাবেলায় আগে থেকেই এমন উদ্যোগ নেয়ার বিষয়টি প্রশংসনীয়। তবে এক্ষেত্রে শুধু সদিচ্ছার প্রকাশই যথেষ্ট নয়। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জনগণের সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিতের বিষয়টিও যেন কার্যক্রমে গুরুত্ব পায়।
গত দেড় দশকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বারবার বিশেষ অভিযান, মশক নিধন কার্যক্রম এবং সচেতনতামূলক প্রচারণা পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু ফলাফল হতাশাজনক থেকেছে। এর মূল কারণ ছিল কার্যক্রমের খণ্ডিত প্রকৃতি। অর্থাৎ মশক নিধন শুধু সিটি করপোরেশনকেন্দ্রিক উদ্যোগেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। শহরতলি, পৌরসভা এলাকা ও নগর-সীমান্তের জলাভূমিতে এডিস মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের কার্যক্রম ভূমিকা রাখতে পারেনি। একই সঙ্গে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং জবাবদিহির অভাব এ উদ্যোগগুলোকে কার্যত কাগুজে অভিযানে পরিণত করেছে। এছাড়া মশক নিধনের কার্যক্রম পরিচালনায় অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। ভেজাল ওষুধ কেনা ও ধারাবাহিকভাবে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা না করায় এমন সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে এবার সরাসরি একটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী পুরো কার্যক্রমের নেতৃত্বে থাকায় ইতিবাচক ফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নতুন এ টাস্কফোর্সের কাঠামো পূর্ববর্তী উদ্যোগ থেকে কিছুটা আলাদা। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে কেবল সিটি করপোরেশন নয়, বরং পৌরসভা ও জেলা পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধের কার্যক্রমে এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নজরদারি ও তত্ত্বাবধানের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় কমিটির প্রথম সভায় সভাপতিত্বকারী মন্ত্রী নিজেই সমন্বিত কার্যক্রম ও জনসম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। মশক নিধনের রসদ ও ওষুধ কেনার পর তার গুণগত মানও এ কমিটির দায়িত্বশীলরা পর্যবেক্ষণ করবেন বলে জানানো হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম তদারকি, বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় এবং জরুরি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব অর্পণও এটিকে কার্যকর করার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এ উদ্যোগকে সফল করতে হলে কতগুলো সুনির্দিষ্ট বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে।
প্রথমত, শুধু টাস্কফোর্স গঠন করলেই হবে না। প্রতিটি সংস্থার জন্য পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। কতটি এলাকায় কতদিনের মধ্যে প্রজননস্থল ধ্বংস করা হবে, কতটি পরিবারে সচেতনতা কার্যক্রম পৌঁছাবে, হাসপাতালে ভর্তির হার কতটা কমানোর লক্ষ্য রয়েছে—এ তথ্যগুলো প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে হবে। তথ্য সংগ্রহের পর নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে। ব্যর্থতার জন্য দায়বদ্ধতা না থাকলে টাস্কফোর্স শুধু বৈঠক করা একটি কমিটিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এডিস মশার প্রজনন ম্যাপিং এখনো দেশে পদ্ধতিগতভাবে হয় না। কোন এলাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, কোন সময়ে প্রজনন হার বাড়তে শুরু করে—এ তথ্য জিআইএস প্রযুক্তির মাধ্যমে সংগ্রহ করা যায়। এ তথ্যের ভিত্তিতে লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করতে পারলে সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হবে। এমনকি জনবল সংকট থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে সফলতা শতভাগ নিশ্চিত করা যাবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব বিভাগের সঙ্গে সরাসরি তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা থাকলে টাস্কফোর্স প্রতিক্রিয়ামূলক নয়, প্রতিরোধমূলকভাবে কাজ করতে সক্ষম হবে।
ডেঙ্গু মোকাবেলায় শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোয় নির্মাণাধীন ভবনের খোলা ছাদ, জমে থাকা পানি এবং পরিত্যক্ত কনটেইনার এডিস মশার প্রধান প্রজননস্থল। রিয়েল এস্টেট কোম্পানি, নির্মাণ ঠিকাদার এবং বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত পরিদর্শন ও জরিমানার আওতায় আনা ছাড়া প্রজননস্থল নির্মূল সম্ভব নয়। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে ডেঙ্গু রোগী তথ্য রিপোর্টিংয়ে বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করাও জরুরি। কারণ বর্তমানে ব্যক্তিগত খাতের চিকিৎসা তথ্যের বড় অংশ জাতীয় তদারকি কাঠামোর আওতায় আসে না।
এসব বাদেও স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার জন্য আগে থেকেই প্রচারণা চালাতে হবে। সরকারি অভিযান মৌসুমভিত্তিক হলেও মশার প্রজনন সারা বছর চলে। তাই মহল্লা পর্যায়ে ওয়ার্ড কমিশনার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দির এবং স্থানীয় এনজিওদের সক্রিয় করে একটি কমিউনিটি-চালিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ‘আমার বাড়ি আমার দায়িত্ব’—এ মনোভাব তৈরিতে সচেতনতামূলক প্রচারণাকে শুধু পোস্টার বিতরণে সীমাবদ্ধ না রেখে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণে রূপ দিতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রতি বছর কত অর্থ ব্যয় হয় এবং তার ফলে রোগের বোঝা কতটা কমেছে—এ তথ্য জনসমক্ষে আসে না। টাস্কফোর্সের কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত ও সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে এবং ব্যয়ের হিসাব পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করতে হবে। কীটনাশক ক্রয় ও বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ বারবার উঠেছে; এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা না এলে বরাদ্দ বাড়ালেও প্রভাব পড়বে না।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে এবারের টাস্কফোর্স গঠনের উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে বাংলাদেশে সমস্যা সমাধানের পথে ‘কমিটি গঠন’ একটি পরিচিত পদক্ষেপ। কমিটি বা টাস্কফোর্সের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ থেকেছে বারবার। এবার যদি সত্যিই ভিন্ন ফলাফল চাওয়া হয়, তাহলে দরকার জবাবদিহির কাঠামো, তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, বেসরকারি খাতের অন্তর্ভুক্তি এবং সক্রিয় কমিউনিটি অংশগ্রহণ। সদিচ্ছা প্রয়োজনীয় শর্ত, কিন্তু যথেষ্ট নয়। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এবার কার্যকর কাঠামোর প্রমাণ রাখুক টাস্কফোর্স।










