এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ১০ শতাংশ বেড়েছে এবং সামনে আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে এমন ধারণা ঠিক নয়। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, দেশে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দাম বাড়বে না। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিচার করেই জ্বালানির বিকল্প বাজার উৎস খোঁজা হচ্ছে। তবে আমরা মনে করি, জ্বালানির বিকল্প বাজার খুঁজলেই দীর্ঘমেয়াদে ভবিষ্যতের জটিলতা দূর হয় না। এ মুহূর্তে জ্বালানি খাতের রূপান্তর জরুরি।
জ্বালানির বহুবিধ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সুযোগ থাকার পরও আমরা আমদানিনির্ভর। বণিক বার্তার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে বিগত এক দশকে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। দেশে প্রতি বছর জ্বালানি তেল, কয়লা ও এলপিজিসহ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার জ্বালানি পণ্য আমদানি করা হয়। নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই আমদানি বাড়ানোর কারণে এ খাত দিন দিন ঋণ ও দেনার ভারে জর্জরিত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, বিগত দুই দশকে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং একমুখী নীতি বাস্তবায়নের কারণে দেশের জ্বালানি খাত ভঙ্গুর দশা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। এসবের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশে।
আমাদের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের গতি শ্লথ হয়ে যাওয়ার পেছনে জ্বালানি সংকটের বড় ভূমিকা আছে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য দেশীয় উৎস থেকে জ্বালানি অনুসন্ধান ও আহরণ বাড়ানো জরুরি ছিল। তা না করে অতীতে সরকার উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, বিশ্ববাজারে এলএনজির দামের অনিশ্চয়তা ও অবকাঠামোগত সক্ষমতার ঘাটতিতে চাহিদামতো এলএনজি আমদানি সম্ভব হচ্ছে না। যখনই জ্বালানি খাতে দামের অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, তখন সরকার মূল্য সমন্বয়ের চেষ্টা করে। মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে সাময়িক সমাধান পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি কার্যকর নয়।
আমদানিনির্ভরতা বাড়ায় ব্যাহত হচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তা। আবার ভর্তুকির চাপ সামলানো সরকারের জন্য অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতি বছরের শুরুতে এবং বাজেট ঘোষণার আগে জ্বালানি রূপান্তরে, জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে এবং খরচ কমাতে নানা উদ্যোগের কথা আলোচনায় আসে। তবে এসব আলোচনা বাস্তব কর্মপদ্ধতির রূপ পায় না। বরং বিশ্ববাজারে প্রতিনিয়ত নানা সংকটের কারণে জ্বালানির দাম হু হু করে বাড়ে। সংকট উত্তরণে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করেই জ্বালানি রূপান্তরের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
দেশের অর্থনীতির প্রাণ ফেরাতে এবং শিল্প ও বিনিয়োগের স্থবিরতা কাটাতে হলে জ্বালানি খাতে সরবরাহ বাড়ানোর বিকল্প নেই। তবে আমদানির মাধ্যমে এ সরবরাহ বাড়ালে সমাধান পাওয়া যাবে না। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় উৎস থেকে জ্বালানি আহরণই সবচেয়ে ভালো পন্থা। এজন্য স্থল ও সমুদ্রে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান এবং পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোয় নতুন কূপ খনন সমানতালে করা প্রয়োজন। সংকটে বাপেক্স, বিজিএফসিএলসহ গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের সঙ্গে যুক্ত দেশীয় কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর কথা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু কোনো সরকারই তাতে কর্ণপাত করেনি। এদিকে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে সবার আগ্রহ বাড়তে শুরু করেছে। নিয়মিত খরচ কমাতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ঝুঁকছেন অনেকেই। দেশে তাই সৌরবিদ্যুৎ যন্ত্রপাতি তৈরি করছে কেউ কেউ।
জ্বালানিনীতিতে অবশ্যই জাতীয় সক্ষমতা ও দেশীয় উৎস থেকে জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। স্থল ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান, কূপ খনন, উন্নয়ন ও সরবরাহের অবকাঠামো তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। জ্বালানি খাতে প্রত্যাশিত নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা তৈরিতে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেয়া হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা একটি মারাত্মক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ দেশে জ্বালানি রূপান্তরে ভূমিকা রাখতে পারত। তবে এখানেও অস্বাভাবিক রকমের ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। মূলত নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণে ধীরগতি রয়েছে। তাছাড়া অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আমরা পিছিয়ে আছি। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়াতে হয়। এ ক্ষেত্রে বাষ্পীয় জেনারেটর, ট্রান্সফরমার, পাম্প ও কুলিং টাওয়ার ইত্যাদি ব্যবহার করা যায়। জ্বালানি অবকাঠামো উপকরণ পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। তাই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সুনাম আছে এমন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশের সক্ষম কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে কাঁচামাল বিনিময়, প্রযুক্তি রপ্তকরণ ও হস্তান্তরের কথা ভাবা যায়।
দেশের বিভিন্ন খাতে জ্বালানি ব্যবহারের পদ্ধতি বিবেচনায় নিয়ে টেকসই ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ-জ্বালানির পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। জ্বালানি খাতে স্বল্পকালীন সংকট দূর করার জন্য মূল্য সমন্বয়ের পথ থেকে নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের সরে আসতে হবে। এ মুহূর্তে জ্বালানি খাতে রূপান্তর আনতে হবে। এ রূপান্তরের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে গ্রিডের আধুনিকায়ন, গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর শিল্প খাতের নির্ভরশীলতা বাড়ানো, খরুচে এলএনজিতে নির্ভরশীলতা নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাস সঞ্চালন এবং বিতরণে বাড়তি অর্থ অপচয় কমাতে হবে। জ্বালানি রূপান্তরে পরিকল্পনা প্রণয়নের সঙ্গে তা বাস্তবায়নে যে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা দূর করতে হবে। গ্রিড আধুনিকায়নে এবং এলএনজি আমদানি কমাতে নিজস্ব গ্যাস উৎপাদনে সরকারি বরাদ্দ বাড়াতে হবে। মূলত জ্বালানি অবকাঠামো শক্তিশালী করার মাধ্যমেই জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। মনে রাখতে হবে, যে দেশগুলো শূন্য কার্বন নির্গমনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তারা সবাই জ্বালানি দক্ষতায় বেশ গুরুত্ব দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য শক্তির ওপরই নির্ভরশীলতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা বেশি দেখা গেছে। শ্রীলংকায় ৭৫ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। ভারতে আসে ৪০ শতাংশ। উল্লেখ্য, নবায়নযোগ্য উৎস থেকে প্রায় শতভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদনে এগিয়ে আছে আইসল্যান্ড, ভুটান, প্যারাগুয়ে এমনকি কঙ্গোর মতো আফ্রিকার রাষ্ট্র। সীমিত সম্পদ থাকার পরও এ দেশগুলো নবায়নযোগ্য উৎসের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার করছে। অর্থাৎ আমাদের সামনেও উদাহরণ হয়েছে। আমাদের অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রয়েছে এমন দেশগুলো নবায়নযোগ্য শক্তির সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে পারলে আমরা কেন পারব না? এজন্য চাই সদিচ্ছা এবং কাঠামোগত সংস্কার।










