ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্র সংস্কার-সংক্রান্ত গণভোটের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ভোটারদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এরপর শপথ নেন নতুন সরকারের ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী। এর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হলো। একই সঙ্গে প্রায় দুই যুগ পর বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের যাত্রা শুরু হলো। গতকাল বিকালে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাদের শপথ পড়ান। নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়ে চলমান নানা অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে বিচক্ষণতা ও জবাবদিহির সরকার পরিচালনার সংস্কৃতি সুদৃঢ় করবে বলে আশাবাদ সব মহলের।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরই অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। করোনা মহামারীর পর থেকেই দেশের অর্থনীতিতে মন্দাভাব, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে ভাটা চলছিল। তারপর সরকারের বিভিন্ন অংশে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা জনভোগান্তির কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক টানাপড়েনের প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। ভূরাজনৈতিক টানাপড়েন সামলে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক কী হবে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কী হবে, দেশীয় স্বার্থবিরোধী পুরনো চুক্তিগুলোর কী হবে সেদিকে তাকিয়ে থাকবেন পর্যবেক্ষকরা।

চব্বিশের অভ্যুত্থানে প্রায় দেড় সহস্রাধিক মানুষ প্রাণ দিয়েছে। আহত হয়েছে ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হারিয়েছে আরো ৩০ হাজার। অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ছিল দেশের সর্বস্তরে বৈষম্যের অবসান ও ফ্যাসিবাদী কাঠামোর বিলোপ। অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ নির্মাণের আকুতি নিয়ে আগামীর সংসদের দিকে তাকিয়ে থাকবে জুলাইয়ে রাজপথে নামা ছাত্র-জনতা, শ্রমিক-মজুর। সংসদে সরকারি ও বিরোধী দল—উভয়ের ভূমিকাই সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি, সরকারকে প্রশ্নের মুখে রেখে জনগণের স্বার্থ সুরক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে বিরোধী দল ও জোট।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পরই বেশকিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। দেশের অর্থনীতি বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগের মতো জটিল সমস্যার মুখোমুখি। এ পরিস্থিতিতে জনগণের প্রত্যাশা শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ নয়; তারা অর্থনৈতিক স্বস্তি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন দেখতে চায়। গণতান্ত্রিক রূপান্তরের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, রাজনৈতিক স্বাধীনতার স্থায়িত্ব অনেকাংশে নির্ভর করে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও বাস্তব উন্নয়নের ওপর। ফলে নতুন সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা।

এক্ষেত্রে সরকারের নীতি ও কর্মসূচির পাশাপাশি মন্ত্রিসভার দায়িত্বশীল পারফরম্যান্সও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। দক্ষতা, সততা ও পেশাগত সক্ষমতার ভিত্তিতে মন্ত্রিসভা কাজ না করলে সরকারের নীতিগত অঙ্গীকার বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। অতীত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, অদক্ষতা ও অনিয়ম সরকারের গ্রহণযোগ্যতাকে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত করে।

একই সঙ্গে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেমন নীতি বাস্তবায়নে সহায়ক, তেমনি এটি ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। এ কারণে গণভোটের মাধ্যমে যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পক্ষে জনগণ মত দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা নতুন সরকারের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও কার্যকর করা, ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা এবং সংসদকে কার্যকর বিতর্ক ও জবাবদিহির কেন্দ্রে পরিণত করা গণতন্ত্রের স্থায়িত্বের জন্য অপরিহার্য।

নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সহনশীলতা বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জয়ী ও পরাজিত—উভয় পক্ষেরই দায়িত্ব রয়েছে গণরায়কে সম্মান করা এবং সহিংসতা বা প্রতিহিংসার পথ পরিহার করা। একটি শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল বিরোধী দল সংসদীয় গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ। সংসদের ভেতরে মতভিন্নতা ও সমালোচনার সুযোগ যত বেশি থাকবে, রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ততই শক্তিশালী হবে।

বাংলাদেশের জনগণ তাদের ভোটের মাধ্যমে শুধু একটি সরকার নির্বাচন করেনি; তারা একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে। সেই প্রত্যাশার কেন্দ্রে রয়েছে জবাবদিহিমূলক শাসন, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন। নতুন সরকারের জন্য এটি যেমন একটি সুযোগ, তেমনি একটি বড় পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় সফল হতে হলে সরকারকে গণরায়ের মর্যাদা রক্ষা করে দায়িত্বশীল, স্বচ্ছ ও ভারসাম্যপূর্ণ শাসনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা অতীতে বহুবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। নতুন এ অধ্যায়ে সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং একটি স্থিতিশীল, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপনই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য। শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের সংস্কৃতি, দ্রুত কার্যকর সংসদ এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে দৃঢ় অঙ্গীকার—এ তিন পদক্ষেপই পারে সেই লক্ষ্য অর্জনের পথ সুগম করতে।