অবশ্য আমি ইডকলে মাত্র চার বছর কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি থেকে সরে এসেছি। এত অল্প সময় দায়িত্ব পালন করলেও আমি মনে করি, এ সময়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, বিশেষত নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে, তা এক কথায় অসাধারণ। কনক্লেভে আলোচনার সুযোগ পাওয়ায় আমি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অর্থায়ন প্রসঙ্গেই কথা বলব।

সরকার এরই মধ্যে ২০৩০ সাল নাগাদ মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের মাধ্যমে পূরণ করতে চায়। এ সক্ষমতা তৈরি করতে হলে উপযুক্ত বিনিয়োগ লাগবে। প্রাক্কলন করে ধারণা করা হচ্ছে, আগামী পাঁচ বছরে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি ব্যয় হতে পারে। এখানে আরেকটি প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। আমরা রুফটপ প্রকল্প করব নাকি বড় পরিসরে গ্রিডসংযুক্ত প্রকল্প নিয়ে ভাবব? এজন্যই কোনো ধরনের ভোগান্তি ছাড়াই আমাদের বিশাল বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। এ ধরনের প্রকল্পগুলো যাতে বাস্তবায়ন হয় তার অর্থায়ন নিশ্চিত করতে ইডকল সবসময়ই বিশেষ গুরুত্ব দেয় ও অবদান রাখে। এভাবে আমরা সরকারের বিশেষ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করছি। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে পাওয়া নমনীয় শর্তের অর্থ ব্যবস্থাপনায় ইডকলের অবদান রয়েছে। তবে আমাদের সামনে এখনো প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।

বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ করে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথে রয়েছে। আগামী পাঁচ বছর নমনীয় শর্তে ও সহজ ঋণসুবিধা নিশ্চিত করা দরকার। কিন্তু এখানে বিনিময় হার বড় প্রতিবন্ধকতা। ধীরে ধীরে স্বল্প সুদে উন্নয়ন ঋণ পাওয়া আরো কঠিন হয়ে উঠছে। আমাদের দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য স্বল্প সুদের দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এ খাতের অর্থায়ন পরিচালনা সম্ভব। কিন্তু তার জন্য যদি বৈদেশিক ঋণ আনা হয় তাহলে বিনিময় হার কীভাবে নিয়ন্ত্রণ হবে? তাই বিনিময় হারের ঝুঁকি কীভাবে মোকাবেলা করা হবে, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। এ ঝুঁকির কারণে যেকোনো প্রকল্পের অর্থায়ন সক্ষমতা কমে যায়।

অন্যদিকে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা বিপুল পরিমাণ স্থানীয় মুদ্রার তারল্য কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। কারণ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রকল্পগুলো অনেক সময় ব্যাংকের আগ্রহ আদায় করতে পারে না। এগুলোকে ব্যাংকেবল করা সম্ভব হয় না। এ লক্ষ্যে আইডিকল আন্তর্জাতিক অর্থ করপোরেশনের (আইএফসি) সঙ্গে কাজ করেছে। আইএফসি আংশিক গ্যারান্টি বা অর্থ পরিশোধের গ্যারান্টি ব্যবস্থা চালু করেছে। এভাবেই আর্থিক খাতে একাধিক স্কিম করা গেলে ভালো হয়। উন্নয়ন অংশীদারদের কাছে শুধু ঋণের অর্থ চাওয়ার পরিবর্তে এ ধরনের গ্যারান্টি ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেয়া উচিত। এতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়নে আরো আগ্রহী হবে। স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়ন এ খাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দেশে মোট বিদ্যুতের ৫৫ শতাংশের বেশি ব্যবহার করে গৃহস্থালি খাত। তাই পরিবারভিত্তিক নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং এর অর্থায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশী যে দেশগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছে, তাদের দেখলেও বোঝা যাবে গৃহস্থালি পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর কতটা জরুরি।

সরকারের লক্ষ্য মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে অর্জন করা। এ লক্ষ্য পূরণে আগামী পাঁচ বছরে প্রতি বছর ১০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বা গ্রিড-সংযুক্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থায়ন নিশ্চিত করা। ক্ষুদ্র ব্যবহারকারীদের জন্য ছোট আকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি স্থাপনে খুচরা ঋণ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নতুন ধারণা নিয়ে এগিয়ে এসে ছোট ঋণ দিতে পারে। কারণ গৃহস্থালি পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দেশে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঋণভিত্তিক পুঁজিবাজার। এটি শুধু নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়, বাংলাদেশের পুরো পুঁজিবাজারই এখনো ব্যাংকনির্ভর। কিন্তু ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ এবং বর্তমান নানা সমস্যার কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের অর্থায়নও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে পুঁজিবাজারের বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বিকল্প অর্থায়নের উৎস হিসেবে এসব বিষয়কে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। বর্তমানে গ্রিন বন্ড বা এ জাতীয় বন্ড গ্যারান্টির আলোচনা হতে পারে। এ কথা সবারই জানা যে আমাদের পুঁজিবাজারে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। ব্যাংকনির্ভর থাকলে হবে না। এর বাইরে গিয়ে বিকল্প অর্থায়নের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

দেশে অর্থায়ন এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। খাতটি নতুন, আর এ খাতের বড় সমস্যা হলো অর্থায়ন। এ খাতের অনেকেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো গড়তে ভূমিকা রেখেছেন। বর্তমানে আমরা রূপান্তরের বড় লক্ষ্য নিয়েছি। পর্যাপ্ত অর্থায়ন ছাড়া এটি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। বড় আকারে সংস্কার প্রয়োজন হবে। এ খাতের একজন প্রতিনিধি হিসেবে কয়েকটি সংস্কারের কথা বলেছি। এগুলো বাদেও আমাদের ভিন্ন কিছু উপায় খুঁজতে হবে। বিদেশী অর্থ বা ঋণের ওপর নির্ভরতা যেন আমাদের করতে না হয়। স্থানীয় মুদ্রার দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তুলনামূলক কম সুদে, রেয়াতি হারে কিংবা অন্তত যুক্তিসংগত সুদ নির্ধারণ করা জরুরি। এগুলো নিশ্চিত করতে পারলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর কঠিন হবে না।

আলমগীর মোরসেদ: সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)

[বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]