বর্তমানে দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের বড় ক্ষত ঊর্ধ্বমুখী খেলাপি ঋণ। এ সংকটের পেছনে মূলত দায় রয়েছে ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন ব্যবস্থার। বিশ্বব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রচলিত ও জনপ্রিয় উৎস বন্ড মার্কেট ও পুঁজিবাজার হলেও দেশের ব্যাংক খাত থেকে বিপুল অংকের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেয়া হয়েছে। এছাড়া ঋণ বিতরণেও নানা অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বেড়েছে; এরই মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এ প্রেক্ষাপটে ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি হয়ে পড়েছে। আর বেরিয়ে আসতে হলে অবশ্যই অর্থায়নের বিকল্প উৎস নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বন্ড মার্কেট সেই বিকল্প উৎস হতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, বন্ড মার্কেট নানা সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ। এটাকে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎসে পরিণত করতে হলে এর কার্যকারিতা ও গতিশীলতা বাড়ানোয় উদ্যোগ প্রয়োজন।

উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিতে বন্ড মার্কেট দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রধান উৎস। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোয় সরকারি ও করপোরেট বন্ড মার্কেট অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম সূচক। এমনকি ভারত, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোও গত দুই দশকে শক্তিশালী স্থানীয় বন্ড মার্কেট গড়ে তুলেছে, যা অবকাঠামো ও শিল্পায়নের অর্থায়নের প্রধান খাতে পরিণত হয়েছে। দেশে একটি কার্যকর বন্ড মার্কেট থাকলে সরকার ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান সরাসরি এ মার্কেট থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থ সংগ্রহ করতে পারত। এতে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি হতো না এবং খেলাপি ঋণের ঝুঁকি কমত।

দেশে এর বিপরীত চিত্র দেখা যায়। এখানে বন্ড মার্কেট বলতে মূলত সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডকে বোঝায়। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে বাংলাদেশের বন্ড মার্কেটের আকার দাঁড়িয়েছে ৩০ বিলিয়ন ডলারে, যেখানে প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী অধিকাংশ দেশের বন্ড মার্কেটের অবস্থান বাংলাদেশের ওপরে। এ দেশে বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণ না হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, বন্ড ইস্যুর প্রক্রিয়া জটিল ও ব্যয়বহুল। অনুমোদন, রেটিং, ট্রাস্টি, তালিকাভুক্তি—সব মিলিয়ে সময় ও খরচ উদ্যোক্তাদের জন্য বড় বাধা। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট। অতীতে কিছু বন্ডে সুদ বা মূলধন পরিশোধে অনিয়মের অভিযোগ বাজারে নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে। নিয়ম ভঙ্গের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির নজির না থাকায় সেই আস্থাহীনতা আরো তীব্র হয়েছে। তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অভাব। উন্নত বন্ড বাজারে পেনশন ফান্ড, বীমা কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ড প্রধান বিনিয়োগকারী। বাংলাদেশে এসব খাত এখনো তুলনামূলকভাবে দুর্বল। এছাড়া সরকারি সঞ্চয়পত্রের উচ্চ সুদহারও বন্ড বাজার বিকাশের পথে বড় বাধা। তুলনামূলক বেশি মুনাফার সুযোগ না থাকলে বিনিয়োগকারীরা স্বাভাবিকভাবেই বন্ড মার্কেটের প্রতি আগ্রহী হবেন না।

তবে এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বন্ড মার্কেট সম্ভাবনাময়ও। সাম্প্রতিক সময়ে সুকুক, গ্রিন বন্ড ও সোশ্যাল বন্ডের মতো নতুন ধারণা নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা হচ্ছে। জলবায়ু অর্থায়ন ও টেকসই উন্নয়নের বৈশ্বিক এজেন্ডার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে বাংলাদেশ যদি গ্রিন বা ক্লাইমেট বন্ড মার্কেট গড়ে তুলতে পারে, তবে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বন্ড মার্কেট শক্তিশালী হলে মুদ্রানীতির কার্যকারিতাও বাড়বে। তবে এগুলো করতে হলে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোর সমাধান করতে হবে।

বন্ড মার্কেটকে এমনভাবে গড়তে হবে যেন সরকারের বাইরে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোও এতে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়। সরকারকে এটি বিবেচনায় নিতে হবে। এক্ষেত্রে সহায়ক নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন। বন্ড ইস্যু প্রক্রিয়া সহজ ও সাশ্রয়ী করতে হবে। ব্যয় কমাতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিয়ম প্রয়োগে কঠোরতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বন্ডে বিনিয়োগকারীদের অধিকার সুরক্ষিত থাকে। তৃতীয়ত, পেনশন ও বীমা খাত সংস্কারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, সঞ্চয়পত্রের সুদহার বাজারভিত্তিক করা প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, দেশের আর্থিক নীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক খাতকে কেন্দ্রে রাখা হয়েছে, সেটি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে বহুমুখী অর্থায়ন ব্যবস্থার প্রচলন জরুরি। শক্তিশালী বন্ড মার্কেট ছাড়া সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। আর বিষয়টি শুধু অর্থায়নের প্রশ্ন নয়; বরং আর্থিক স্থিতিশীলতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত। দীর্ঘদিন ধরে দেশের পুঁজিবাজার থেকে শিল্প খাতে সেভাবে অর্থায়ন হচ্ছে না। আবার ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে বেসরকারি খাতের শিল্পোদ্যোক্তারা ঋণ নিতে আগ্রহী হচ্ছেন না। যে কারণে বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে শ্লথগতি দেখা যাচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে। এমন পরিস্থিতিতে যদি একটা ভাইব্রেন্ট বন্ড মার্কেট থাকত, সেটি অর্থ সংস্থানের ভালো উৎস হতে পারত এবং অর্থনীতির গতি বাড়ানো যেত।

সম্প্রতি ‘বন্ড মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড রেকমেন্ডেশন’ শীর্ষক এক সেমিনারে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও বাংলাদেশে টেকসই ও কার্যকর বন্ড মার্কেট গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন। তার ভাষ্যমতে, এজন্য মৌলিক ব্যবসায়িক ও আর্থিক সংস্কৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। এছাড়া বন্ড মার্কেট কেবল নীতিগত সংস্কারের বিষয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি আস্থা, ম্যাক্রো স্ট্যাবিলিটি এবং কাঠামোগত রূপান্তরের মাধ্যমেই এটি শক্তিশালী হবে। এক্সচেঞ্জ রেট, সুদের হার ও মূল্যস্ফীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে পারলে আগামী পাঁচ-সাত কিংবা ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী ও ভাইব্রেন্ট বন্ড মার্কেট গড়ে তোলা সম্ভব।

প্রত্যাশা রয়েছে, আগামী নির্বাচিত সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক এদিকে মনোযোগ দেবে। টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য কার্যকর ও গতিশীল বন্ড মার্কেট গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে ব্যাংক খাতের ওপর চাপ কমবে, বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা বাড়বে।