করের হার, কর আদায়ের পদ্ধতি, উৎসে করের কাঠামো এবং কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক ব্যয়ের স্বীকৃতি ইত্যাদি বিষয় সরাসরি ব্যবসার পরিবেশকে প্রভাবিত করে। সেই বিবেচনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে শিল্প, ব্যবসা, প্রযুক্তি, রফতানি, পরিবহন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, বিদেশী অর্থায়ন এবং উৎসে কর-সংক্রান্ত আইনগত জটিলতা হ্রাসের উদ্যোগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

এবারের বাজেটে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম করের সাধারণ হার ৫ থেকে ৪ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব উৎপাদন ব্যয় কমানোর সহায়ক হবে। স্থানীয় মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম আয়কর কমানোর প্রস্তাব প্রযুক্তি শিল্পকে উৎসাহিত করবে। কম্পিউটার প্রিন্টার, পোর্টেবল অটোমেটিক ডেটা প্রসেসিং মেশিন, ফ্ল্যাশ মেমোরি ও কম্পিউটার মনিটর আমদানিতে অগ্রিম কর কমানোর প্রস্তাবও ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণের খুবই সহায়ক হবে। বর্তমান যুগে প্রযুক্তি কোনো বিলাসিতা নয়; শিক্ষা, ব্যবসা, ব্যাংকিং, ই-কমার্স, ফ্রিল্যান্সিং এবং প্রশাসনিক সেবার অপরিহার্য অবকাঠামো।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব খাতেও কর হ্রাসের ইতিবাচক বার্তা রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীর কাছ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎসে কর ৪ থেকে ৩ শতাংশে নামানো, রিফাইনারি কর্তৃক জ্বালানি তেল সরবরাহে উৎসে কর ১ দশমিক ৫ থেকে ১ শতাংশে নামানো এবং ইলেকট্রিক বাস, ইলেকট্রিক ট্রাক ও ইলেকট্রিক চার্জিং স্টেশন আমদানিতে ৫ শতাংশ উৎসে কর শূন্য শতাংশে নামানোর প্রস্তাব উৎপাদন, সরবরাহ ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার জন্য সময়োপযোগী পদক্ষেপ। রিসাইকেল্ড পণ্য ও রিসাইক্লিং কাঁচামালে কর ৩ থেকে ১ শতাংশে নামানোর প্রস্তাবও টেকসই শিল্পায়ন ও সবুজ অর্থনীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা খাতে উৎসে কর ১২ থেকে ১০ শতাংশে নামানো এবং বিটিআরসি কর্তৃক প্রাপ্ত রেভিনিউ শেয়ার, লাইসেন্স ফি বা চার্জের ওপর বিদ্যমান ২০ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব ডিজিটাল যোগাযোগ অবকাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি রফতানি আয়ের বিপরীতে নগদ প্রণোদনায় উৎসে কর ১০ থেকে ৫ শতাংশে নামানো, প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়াল সরবরাহে উৎসে কর ৫ থেকে ৩ শতাংশে নামানো এবং পরিবহন, বহন ও যানবাহন ভাড়া সেবায় কর ৫ থেকে ২ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব উৎপাদন, রফতানি, সরবরাহ ব্যবস্থা ও ব্যবসার দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় কমাতে সহায়ক।

বিদেশী বিনিয়োগ ও শিল্প অর্থায়নের ক্ষেত্রেও বাজেট প্রস্তাবে ইতিবাচক বার্তা রয়েছে। অনিবাসী করদাতাকে যন্ত্রপাতি ভাড়া বাবদ পরিশোধে উৎসে কর ১৫ থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামানো, অনিবাসীকে পরিশোধিত বীমা প্রিমিয়ামে কর ১০ থেকে ৫ শতাংশে নামানো এবং বিদেশী ঋণের সুদের ওপর উৎসে কর ২০ থেকে ১০ শতাংশে কমানোর প্রস্তাব বিনিয়োগ ব্যয় কমাতে সহায়ক। আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি, বিদেশী অর্থায়ন ও পুনঃবীমা অনেক শিল্প প্রকল্পের জন্য অপরিহার্য। এসব ক্ষেত্রে করের হার কমালে প্রকল্প ব্যয় কমে, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত সহজ হয় এবং উৎপাদনমুখী অর্থনীতির গতি বাড়ে।

এবারের বাজেটের সবচেয়ে ব্যবসাবান্ধব ও বাস্তবমুখী সংস্কারগুলোর একটি হলো উৎসে কর কর্তন, সংগ্রহ বা পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে সমুদয় খরচ অগ্রাহ্য করার বিদ্যমান কঠোর বিধান পরিবর্তনের প্রস্তাব। আগের ব্যবস্থায় ব্যবসা বা পেশা পরিচালনার প্রকৃত ও জেনুইন খরচও কেবল উৎসে কর কর্তন না করার কারণে অগ্রাহ্য করা যেত। ফলে সেই খরচ ব্যবসার আয় হিসেবে গণ্য হয়ে করদাতার ওপর অস্বাভাবিক করের চাপ সৃষ্টি করত। বাস্তবে অনেক ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও উদ্যোক্তার পক্ষে প্রতিটি লেনদেনে উৎসে কর কর্তনের সব বিধান নিখুঁতভাবে অনুসরণ করা সহজ হয় না। আমাদের দেশের কর সংস্কৃতি, হিসাবরক্ষণ দক্ষতা, সচেতনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ঘাটতির কারণে এক্ষেত্রে অনেক সময় ভুল বা অনিচ্ছাকৃত ব্যত্যয় ঘটে। কিন্তু তাই বলে প্রকৃত ব্যবসায়িক ব্যয়কে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা ন্যায়সংগত হতে পারে না।

একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। ধরা যাক, কোনো ব্যবসা বা পেশা পরিচালনায় বেতন-ভাতা, সেবা, ভাড়া বা অন্যান্য খাতে ১ কোটি টাকা প্রকৃত খরচ হয়েছে। আগের আইনি কাঠামোয় উৎসে কর কর্তনে ব্যর্থতার কারণে পুরো ১ কোটি টাকা ব্যয় অগ্রাহ্য হলে তা ব্যবসার আয় হিসেবে গণ্য হয়ে প্রযোজ্য করহার অনুযায়ী ৩০-৩৫ লাখ টাকা, সুদ বা অতিরিক্ত দায়সহ কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরো বেশি করের চাপ তৈরি করতে পারত। অথচ প্রকৃতপক্ষে ব্যবসায়ী ওই টাকা আয় করেননি; বরং ব্যবসা পরিচালনার জন্য ব্যয় করেছেন। এ ধরনের বিধান ব্যবসায়ীদের জন্য শুধু কঠোরই নয়, বাস্তবতার বিচারে অনেক সময় জুলুমের পর্যায়ে পৌঁছে যেত।

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এ কঠোরতা দূর করে অধিকতর যুক্তিসংগত ব্যবস্থা আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নতুন বাজেট প্রস্তাব অনুসারে উৎসে কর কর্তন বা পরিশোধে ব্যর্থ হলে পুরো ব্যয় অগ্রাহ্য করে তাকে আয় বানানোর পরিবর্তে যে পরিমাণ কর কর্তন বা পরিশোধ করা হয়নি সেই কর এবং তার অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ পরিশোধের বিধান করা হয়েছে। যেমন ১ কোটি টাকার কোনো খরচের ওপর যদি উৎসে কর কর্তনযোগ্য হতো ৫ শতাংশ, তাহলে করের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ লাখ টাকা। প্রস্তাবিত বিধান অনুসারে তার সঙ্গে অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ অর্থাৎ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা যোগ হলে মোট করদায় দাঁড়ায় ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। আগের নিয়মে যেখানে একই ১ কোটি টাকার খরচের কারণে ৩৫-৪০ লাখ টাকার নিশ্চিত করদায় সৃষ্টি হতো চাপ, সেখানে প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় মাত্র ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা কর পরিশোধ করে করদাতাকে দায়মুক্ত করার নৈতিক ও যৌক্তিক এবং ব্যবসাবান্ধব বিধান করা হয়েছে।

এটি কর ফাঁকিকে প্রশ্রয় দেয়ার ব্যবস্থা নয়; বরং কর প্রশাসনের ন্যায়সংগত ও বাস্তবমুখী সংস্কার। উৎসে কর কর্তন না করলে করদাতা দায়মুক্ত হচ্ছেন না; বরং কর্তনযোগ্য করের পরিমাণ এবং তার অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ পরিশোধের মাধ্যমে দায় নিষ্পত্তির সুযোগ পাচ্ছেন। আইন তার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে, কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে শাস্তিমূলক চাপে ফেলছে না। এ পরিবর্তন কর আইনের প্রয়োগে আনুপাতিকতা, ন্যায়বোধ ও ব্যবসাবান্ধবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

এ বাজেট প্রস্তাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উৎসে কর্তিত করকে ন্যূনতম করের পরিবর্তে অগ্রিম কর হিসেবে বিবেচনার উদ্যোগ। ন্যূনতম করের বিধানের মূল বৈশিষ্ট্য হলো, কোনো নির্দিষ্ট উৎস থেকে কর্তিত কর সংশ্লিষ্ট উৎসের প্রকৃত করদায়ের চেয়ে বেশি হলে সেই অধিক পরিমাণ কর-ই ওই উৎসের ন্যূনতম কর হিসেবে বহাল থাকে; আবার কর্তিত কর কম হলে করদাতাকে সংশ্লিষ্ট উৎসের গণনাকৃত করদায় পর্যন্ত অতিরিক্ত কর পরিশোধ করতে হয়। অর্থাৎ ন্যূনতম করের বিধান কার্যকর থাকলে করদাতার করদায় কমার কোনো সুযোগ থাকে না; বরং প্রয়োজনে অতিরিক্ত কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হয়। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, ন্যূনতম কর হিসেবে গণ্য উৎসে কর সংশ্লিষ্ট উৎসের করদায় হিসেবেই বিবেচিত হয়; করদাতা অতিরিক্ত কর্তিত কর কোনোভাবেই অন্য উৎসের আয়ের করদায়ের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারেন না। এ কারণে উৎসে করকে ন্যূনতম করের পরিবর্তে অগ্রিম হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব কর ব্যবস্থাকে অধিকতর ন্যায়সংগত, যুক্তিসংগত ও ব্যবসাবান্ধব করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

সার্বিকভাবে দেখা যায়, এবারের বাজেট প্রস্তাব ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের জন্য আস্থার বার্তা বহন করে। শিল্পের কাঁচামাল, প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, রিসাইক্লিং, মোবাইল নেটওয়ার্ক, রফতানি প্রণোদনা, প্যাকেজিং, পরিবহন, বিদেশী অর্থায়ন এবং ব্যবসায়িক ব্যয় অনুমোদনের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা কমানোর এসব পদক্ষেপ উৎপাদন ও বিনিয়োগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। আওয়ামী লীগ আমলের তুলনামূলক উচ্চ উৎসে করনির্ভর ও কঠোর ব্যয় অগ্রাহ্য কাঠামোর বিপরীতে বর্তমান গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের এ প্রস্তাব ব্যবসা-বাণিজ্যবান্ধব করনীতির নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

রাজনীতি, অর্থনীতি ও করনীতির শেষ কথা হওয়া উচিত জনগণের কল্যাণ, উৎপাদনের বিকাশ এবং দেশের অগ্রগতি। সেই বিবেচনায় এবারের বাজেট প্রস্তাব শুধু কর কমানোর হিসাব নয়; এটি ব্যবসায় আস্থা, শিল্পে গতি, বিনিয়োগে সাহস এবং অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চারের এক বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ। শিল্পের কাঁচামাল ও উৎপাদন সহায়ক খাতে কর কমানো বিনিয়োগের সাহস বাড়ায়; উৎসে কর কর্তনে ত্রুটির কারণে জেনুইন খরচকে আয় বানানোর কঠোর বিধান পরিবর্তন ব্যবসায়ী সমাজকে একটি বড় আইনগত হয়রানি থেকে মুক্তির বার্তা দেয়; ন্যূনতম করের পরিবর্তে উৎসে করকে অগ্রিম হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব কর ব্যবস্থাকে আরো ন্যায়সংগত ও যুক্তিসংগত করবে, যা সবার আগে জনগণ এবং সবার আগে বাংলাদেশ নীতিরই প্রতিফলন।

মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী: আয়কর আইনজীবী ও কোম্পানি আইন পরামর্শক