দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের চাহিদা ১৫ লাখ টনের ওপরে। সাত বছর আগেই এ জ্বালানি পণ্যের ব্যবহার ছিল বর্তমান চাহিদার অর্ধেক। দেশে ক্রমান্বয়ে এলপি গ্যাসের ব্যবহার বাড়ার মূল কারণ মূলত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাওয়া। বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত এলপি গ্যাস এখন বড় আকারে জায়গা দখল করছে শিল্পে। কিন্তু পণ্যটির বাজার প্রসারিত হওয়ার পাশাপাশি এ খাতের টেকসই ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা নিয়ে বড় শঙ্কা রয়েছে। এখন সময় নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্নভাবে এলপি গ্যাসের সরবরাহ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। পাশাপাশি সাশ্রয়ী ও ন্যায্যমূল্যে এলপি গ্যাস সরবরাহ করা গেলে প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বড় অবস্থান তৈরি করে নিতে পারে এলপি গ্যাস।
দেশে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরাঞ্চলে এলপি গ্যাসের ব্যবহার বড় আকারে বাড়লেও এখনো প্রাথমিক জ্বালানি ব্যবহারে বড় কোনো জায়গা নিতে পারেনি এলপি গ্যাস। তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে দেখা গেছে, দেশের মোট প্রাথমিক জ্বালানি ব্যবহারে মাত্র ২ শতাংশ এলপি গ্যাসের ব্যবহার। তবে গত দুই দশকে পণ্যটির প্রসার বিবেচনা করলে দেখা যাবে বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে গাড়িতে এমনকি শিল্প-কারখানায়ও প্রতিনিয়ত ব্যবহার বাড়ছে। প্রাক্কলন থেকে দেখা গেছে, আগামী পাঁচ বছরে দেশে এলপি গ্যাসের ব্যবহার ২৫ লাখ টনে পৌঁছবে। আর ২০২৫ সালে পণ্যটির ব্যবহার গিয়ে দাঁড়াবে এক কোটি টনে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় গ্যাসের মজুদ কমে যাওয়ায় এবং দেশে বড় কোনো মজুদভাণ্ডার আবিষ্কার না হওয়ায় এলএনজির পাশাপাশি এলপি গ্যাসও বড় ভরসা হয়ে উঠবে।
দেশে এলপি গ্যাসের ৯৮ শতাংশ আমদানি হয় বেসরকারি উদ্যোগে। এ খাতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ এসেছে তার সবই করেছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। তবে পণ্যটির দাম, এ খাতের অবকাঠামো সংকট এবং সরকারি নীতি প্রণোদনার বিষয়টি নিয়ে প্রায়ই কথা উঠছে। বিশেষ করে এলপি গ্যাসের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে বাজারে যে দাম ঘোষণা করে তার কোনো কার্যকারিতা নেই। সেই সঙ্গে কমিশনের বাজার তদারকির মাধ্যমে ভোক্তা যে ন্যায্যমূল্যে পণ্যটি কিনবেন সেটারও কোনো সুব্যবস্থা নেই। ফলে এ খাতের অস্থিরতা রয়েছে বাজার প্রসারিত হওয়ার শুরু থেকেই।
বণিক বার্তার আয়োজনে গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে এলপিজি নিয়ে একটি পলিসি কনক্লেভ অনুষ্ঠিত হয়। ‘বাংলাদেশে এলপিজি: অর্থনীতি, পরিবেশ ও নিরাপত্তা’ শীর্ষক এই সেমিনারে অন্তর্বর্তী সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা, নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী, ব্যাংক খাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন। সেখানে বক্তাদের আলোচনায় এলপি গ্যাস খাতের সংকট, ব্যবস্থাপনা, টেকসই বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়ী ও ভোক্তা পর্যায়ের দূরত্বের বিষয়টি উঠে আসে। এলপি গ্যাসের বিকাশে প্রয়োজন নীতি সহায়তা ও সহায়ক জ্বালানি অবকাঠমো নির্মাণ।
এলপিজি নিয়ে অনুষ্ঠিত ওই পলিসি কনক্লেভের মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন হ্রাস এবং বাসাবাড়িতে পাইপলাইনে নতুন করে গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় এলপিজির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। সেই সঙ্গে গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না থাকায় শিল্প-কারখানায়ও বাড়ছে এ গ্যাসের ব্যবহার। ২০৩০ সালে পণ্যটির ব্যবহার ২৫ লাখ টনে পৌঁছতে পারে। সেই হিসাবে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশে এলপিজির চাহিদা আরো ১০ লাখ টন বা ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। পর্যায়ক্রমে ২০৪১ সালে এলপিজির চাহিদা ৫০ লাখ টনে উন্নীত হবে। প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে দেশের শিল্প খাতকে সরিয়ে আনতে হলে এটি সহজ বিকল্পও হতে পারে।
বর্তমানে দেশীয় বাজারে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম পড়ে ১২০০-১৫০০ টাকা। আবার এ খাতে কোনো ধরনের সরকারি ভর্তুকিও নেই। এমনকি মোট এলপিজির ৯৮ শতাংশ বেসরকারি খাতের মাধ্যমে আমদানি করা হয়। এছাড়া দেশে উচ্চ পরিবহন ব্যয়, সীমিত বন্দর সক্ষমতা ও সুবিধা—সব মিলিয়ে ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজির মূল্যও বেশ চড়া। বড় জাহাজ বন্দরে ভিড়তে না পারা, পাইপলাইন না থাকা এবং জেলা পর্যায়ে বোতলজাত সুবিধা না থাকায় বিতরণ ব্যয়ও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। যে কারণে ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজির দাম কমানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এলপিজি সাশ্রয়ী করতে হলে প্রথমেই দরকার সহায়ক নীতি প্রণয়ন। এ খাতে ব্যবসা করতে হলে অনেকগুলো সরকারি সংস্থার কাছ থেকে নিবন্ধন ও অনুমোদন নিতে হয়, যা দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল বিষয়। আবার ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ রয়েছে যে এ প্রক্রিয়ায় অনেককে হয়রানির শিকার হতে হয়। অন্যদিকে উচ্চ নিবন্ধন ফি দিতে হয়। ফলে ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজির দাম বেড়ে যায়। নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে এলপিজি ব্যবসার লাইসেন্সপ্রাপ্তি ও নবায়ন প্রক্রিয়া সহজ করে আনা দরকার। নিবন্ধন বা নবায়ন ফি কমিয়ে আনতে হবে। পাশাপাশি একাধিক সংস্থার অনুমোদনের পরিবর্তে ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ চালু করা যেতে পারে।
নীতি সমন্বয়ের পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়নে মনোযোগ দিতে হবে। এজন্য মাতারবাড়ী ও চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। মাদার ভেসেলে এলপিজি আমদানি করা গেলে আমদানি ব্যয় অনেকাংশে কমে আসবে। তখন ভোক্তা পর্যায়েও দাম কমানো যাবে।
এলপিজির মূল্য নির্ধারণে মূলত দুটি বিষয় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি কনট্রাক্ট প্রাইস (সিপি) ও টাকার বিনিময় হার। এ সূচক দুটির ওঠানামার কারণে অনেক সময় দাম নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তবে এর বাইরে অভ্যন্তরীণ কারণেও এলপিজির দাম বেড়ে যায়। সেটিও অবকাঠামোগত সমস্যার অন্তর্গত। এলপিজি সরবরাহে পাইপলাইন না থাকায় পরিবহন ও লজিস্টিকস পর্যায়েও ব্যয় বেড়ে যায়। এর প্রভাবও পড়ে বাজারমূল্যে। কীভাবে দেশের সর্বত্র সহজে এলপিজি পৌঁছানো যায়, সরকারকে সে ব্যবস্থাও নিতে হবে। এক্ষেত্রে জেলা ও আঞ্চলিক পর্যায়ে বোতলজাত প্লান্ট স্থাপন করা যেতে পারে। কিংবা ছোট শহরগুলোয় পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করা গেলে এলপিজির ব্যবহার বাড়ানো ও দাম কমানো যেতে পারে। এতে পরিবহন খরচ কমে যাবে এবং ভোক্তা পর্যায়ে দামও কমবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকেও নজর দিতে হবে। এলপিজির ব্যবহার যেমন বাড়ছে, তেমনি দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে। তাই ব্যবহারকারীদের সচেতনতা ও অপারেটরদের কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি। এলপিজি অপারেটরদেরও দায়িত্ব নিতে হবে যেন অনুমোদনবিহীন পুনঃভর্তি বা নিম্নমানের সিলিন্ডার ব্যবহার করা না হয়।
প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প হিসেবে এলপিজি সম্ভাবনাময় একটি খাত। খাতটি টেকসইভাবে গড়ে তুলতে হলে সরকার ও বেসরকারি খাত উভয়কে এগিয়ে আসতে হবে। যদি বিদ্যমান সংকটগুলোর সমাধান করা যায় তাহলে এলপিজি সহজ ও সুলভ মূল্যে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায়ও এ খাতের বিকাশ সহায়ক হবে।










