প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার মানব পাচার প্রতিরোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। অনিয়মিত অভিবাসন নিরুৎসাহিত করা, মানব পাচার চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত অভিবাসনের সুযোগ সম্প্রসারণে সরকার একটি সমন্বিত ও বহুমাত্রিক কৌশল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।

দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বর্তমান সরকার মানব পাচার প্রতিরোধে দেশের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে আরো শক্তিশালী ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মানব পাচারবিরোধী আইন ও নীতিমালার আধুনিকায়ন, পাচারকারী সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা, পুনর্বাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সম্প্রতি সরকার ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে, যা এক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এ আইনের মাধ্যমে মানব পাচারের পাশাপাশি অভিবাসী চোরাচালানকেও প্রথমবারের মতো স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশে এই প্রথম অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ, দমন, তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি সুস্পষ্ট, আধুনিক ও সমন্বিত আইনগত ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মূলত নতুন আইনটি মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যকে স্বীকৃতি দিয়ে উভয় অপরাধ মোকাবেলায় পৃথক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এর মাধ্যমে সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে আরো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, ভুক্তভোগীদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা আরো সহজ হবে। একই সঙ্গে এ আইন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের আইনগত কাঠামোর সামঞ্জস্য আরো সুদৃঢ় করবে এবং নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত অভিবাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

এছাড়া ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৬’ প্রণয়নের মাধ্যমে সরকার মানব পাচার প্রতিরোধে দেশের আইনগত সক্ষমতাকে আরো শক্তিশালী করেছে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্লাটফর্ম ও ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবহার করে ভুয়া চাকরির প্রলোভন, প্রতারণামূলক নিয়োগ, অনলাইন আর্থিক প্রতারণা, যৌন হয়রানিমূলক ডিজিটাল অপরাধ এবং অন্যান্য সাইবার অপরাধের মাধ্যমে অনেক মানুষ মানব পাচারের ঝুঁকিতে পড়ছে। নতুন আইন এসব অপরাধের তদন্ত, ডিজিটাল আলামত সংগ্রহ, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। ফলে অনলাইনভিত্তিক প্রতারণা ও ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে পরিচালিত মানব পাচার এবং অভিবাসী চোরাচালান চক্রের বিরুদ্ধে আরো সমন্বিত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হবে।

অন্যদিকে সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরো জোরদার করেছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন গন্তব্য দেশের সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বৈধ অভিবাসনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। গত বছর ইতালির সঙ্গে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, যাতে দক্ষ জনশক্তির বৈধ অভিবাসনের পাশাপাশি অনিয়মিত অভিবাসন ও মানব পাচার প্রতিরোধ এবং অনিয়মিত অভিবাসীদের প্রত্যাবর্তন বিষয়ে যৌথ সহযোগিতার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

পাশাপাশি গ্রিস, সৌদি আরব, মালদ্বীপ, লিবিয়া ও ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা কাঠামো নিরাপদ শ্রম অভিবাসন, মানব পাচার প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীদের প্রত্যাবর্তন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সহযোগিতা শক্তিশালী করেছে। তাছাড়া সার্বিয়া, তুরস্ক, আলবেনিয়া ও উত্তর মেসিডোনিয়ার সঙ্গে নতুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে।

বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে অভিবাসনবিষয়ক সংলাপ, ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ এবং অনিয়মিত অভিবাসীদের প্রত্যাবর্তন-সংক্রান্ত স্ট্যান্ডার্ড ওপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) সংক্রান্ত উদ্যোগগুলো বর্তমানে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে। ট্যালেন্ট পার্টনারশিপের আওতায় আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে কারিগরি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত অভিবাসনের প্রবণতা হ্রাসে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

একইভাবে অনিয়মিত অভিবাসন মোকাবেলায় সরকার গন্তব্য দেশগুলোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বিদ্যমান প্রত্যাবর্তনসংক্রান্ত এসওপির আওতায় অনিয়মিত বাংলাদেশী নাগরিকদের সুশৃঙ্খল ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। একইভাবে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে রিটার্নস অ্যান্ড কমব্যাটিং ট্রাফিকিং এসওপির আওতায় অনিয়মিত অভিবাসী প্রত্যাবর্তন সম্পর্কিত কার্যক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছে। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও পানামাসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গেও অনিয়মিত অভিবাসন ও প্রত্যাবর্তন বিষয়ে কার্যকর সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।

বিদেশে বিপন্ন বাংলাদেশী নাগরিকদের সহায়তায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিদেশের বাংলাদেশ মিশনগুলো সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। ২০২৫ সালে দ্বিপক্ষীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে কিরগিজস্তান থেকে ৩৬৪ জন বাংলাদেশীকে সফলভাবে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা এবং অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে পাচারের শিকার ও ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশীদের শনাক্তকরণ, প্রত্যাবর্তন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করছে। একই সঙ্গে মরক্কো, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আইনি সহায়তা ও কনস্যুলার সেবা প্রদান অব্যাহত রয়েছে।

মানব পাচার প্রতিরোধে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত তথ্য বিনিময় ও সমন্বয়ের মাধ্যমে পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে বিদেশী নিয়োগকর্তার প্রতিটি চাহিদাপত্র (Demand Letter/ Work Order) সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ মিশনের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করার পরই অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে। এ যাচাই ব্যবস্থা ভুয়া নিয়োগ, প্রতারণা এবং রিক্রুটিং এজেন্সির আড়ালে মানব পাচারের ঝুঁকি

কমাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করছে।

বাংলাদেশ মানব পাচার প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকে এবং এ লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বিভিন্ন অংশীদার দেশের সঙ্গে তথ্য বিনিময়, যৌথ তদন্ত, পারস্পরিক আইনগত সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে সমন্বিত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশ মানব পাচার ও আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জাতিসংঘের আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধবিষয়ক পালের্মো কনভেনশন এবং এর মানব পাচার প্রতিরোধ, দমন ও শাস্তিবিষয়ক প্রটোকলের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী মানব পাচার প্রতিরোধে আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদারে কাজ করে যাচ্ছে। একই সঙ্গে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত অভিবাসনবিষয়ক বৈশ্বিক চুক্তি বাস্তবায়নের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি বালি প্রসেসের সক্রিয় সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ আঞ্চলিক সহযোগিতা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার বিশ্বাস করে, মানব পাচার প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নিরাপদ, নিয়মিত ও বৈধ অভিবাসনের সুযোগ সম্প্রসারণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব আরো শক্তিশালী করা। এ লক্ষ্য অর্জনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে, যাতে বাংলাদেশী নাগরিকরা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ অভিবাসনের সুযোগ পায় এবং মানব পাচারের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত থাকে।

[বিশ্ব মানব পাচার প্রতিরোধ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বণিক বার্তার প্রতিবেদনের জন্য বক্তব্য চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকে পাঠানো লিখিত উত্তর়]

শামা ওবায়েদ ইসলাম: প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার