দেশের জনসংখ্যা ক্রমবর্ধমান। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আবাস ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর বেড়েছে। বর্ধিত জনসংখ্যার নানা চাহিদা পূরণে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণ বেড়েছে। এসব কাজের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়েছে জমির। কখনো কৃষিজমি অধিগ্রহণ করে, কখনো-বা বনভূমি ধ্বংস করে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে, ফলে দিন দিন কৃষি ও বনভূমির পরিমাণ কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এ-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, গত আট বছরে (২০১৫-২৩) কৃষিজমি কমেছে ১ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং বনভূমি কমেছে ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ।
এভাবে কৃষি ও বনভূমি হ্রাস খাদ্যনিরাপত্তা ও পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। দেশের মানুষের খাদ্যের জোগানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে কৃষি উৎপাদন। কৃষিজমি কমলে স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কৃষিপণ্যের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হবে। এমনিতেও দেশে জনসংখ্যার অনুপাতে খাদ্যশস্যের উৎপাদন সেভাবে বাড়ছে না। কৃষিজমি হ্রাস, উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণের অভাব, কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি এবং সে অনুপাতে কৃষক আয় করতে না পারাসহ নানা কারণে কৃষি উৎপাদনে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে ধানের আবাদ হয়েছিল ১ কোটি ১৭ লাখ ৯০ হাজার হেক্টর জমিতে। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১ কোটি ১৫ লাখ হেক্টরে। আর সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আবাদকৃত জমি ১ কোটি ১৪ লাখ হেক্টরে নেমে আসে। অর্থাৎ সর্বশেষ পাঁচ বছরে আবাদকৃত জমির পরিমাণ কমেছে প্রায় ২ শতাংশ। এর বিপরীতে পাঁচ বছরে হেক্টরপ্রতি ফলন বেড়েছে কেবল ৪ শতাংশ। আর চাল উৎপাদন মাত্র ২ শতাংশ বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কৃষিজমি কমে আসা খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে বড় ধরনের উদ্বেগ।
অন্যদিকে বনভূমি বসবাস উপযোগী, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের জন্য যেমন জরুরি, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবেলায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও বনজ সম্পদের ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত বনভূমি থাকা আবশ্যক। সাধারণত পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় যেকোনো দেশের মোট ভূমির ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। অথচ দেশে বনভূমি আছে ১৫ শতাংশের কিছু বেশি। যেখানে পর্যাপ্ত বনভূমি নেই সেখানে এর পরিমাণ কমে যাওয়া প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দেয়। তাছাড়া কয়েক বছর ধরে সারা দেশে গ্রীষ্মকালীন ‘হিট ওয়েভ’ প্রবাহিত হচ্ছে।
জনসংখ্যা বাড়বে। তাদের চাহিদা পূরণে প্রতিনিয়ত অবকাঠামো বাড়বে। তবে সেগুলো হতে হবে পরিকল্পনামাফিক। জীবনধারণের জন্য কৃষি ও বনভূমিও জরুরি। অনেকাংশে যেকোনো অবকাঠামোর চেয়ে এগুলো জরুরি। তাই সরকারি বা বেসরকারি যেকোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে থাকতে হবে ভূমি ও পরিবেশের সুরক্ষা। নয়তো উন্নয়নের বাই প্রডাক্ট হিসেবে জনজীবনের ঝুঁকি বাড়বে। যে ঝুঁকি বয়ে আনবে খাদ্য সংকট ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়। এ বিপর্যয় এড়াতে হলে কৃষিজ ও বনজ ভূমির রক্ষায় মনোনিবেশ করতে হবে। সেক্ষেত্রে সরকারের নীতি—কৌশল গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে এবং তা বাস্তবায়নের দিকেও নজর দিতে হবে।
দেশে এখনো ভূমি ব্যবহার ও এর সুরক্ষা-সংক্রান্ত আইনের কার্যকর প্রয়োগ নেই। কৃষিজমি রক্ষায় সরকারকে সুনির্দিষ্ট আইন দ্রুত প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন, আবাসন ও অবকাঠামো নির্মাণের রাশ টেনে ধরতে হবে। কৃষিজমি বাঁচিয়ে পরিকল্পিতভাবে এসব কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করা দরকার। যে জমি থেকে মানুষের খাদ্যের চাহিদা পূরণ হয়, সে জমি যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। যেভাবে অলক্ষ্যে কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে, তাতে সংকট দেখা দিতে খুব বেশি সময় লাগবে না। দেশের মানুষের খাদ্য সংস্থান যে জমি থেকে হয়, তা রক্ষায় সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাছাড়া বায়ু, পানি দূষণের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে মাটি দূষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। একদিকে আবাদি জমির পরিমাণ কমে আসছে, অন্যদিকে কমছে আবাদি জমির মাটির পুষ্টিগুণ। সরকারি এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ভূমির প্রায় ৭৫ শতাংশই এখন উর্বরতা ঘাটতিতে ভুগছে। তাই কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাবারের পুষ্টিগুণ নিশ্চিতে জমির সুরক্ষার পাশাপাশি পরিবেশ দূষণ কমানোও অতীব জরুরি।
বিশ্বের অনেক দেশেই কৃষি ও বনভূমি সুরক্ষিত করে নগরায়ণ ও শিল্পায়ন করা হচ্ছে। কিন্তু এক্ষেত্রে এ দেশে সবাই বিপরীত পথে হেঁটেছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রকৃতিগতভাবে এ দেশ কৃষি উপযোগী এবং কোনো ধরনের চাষ ছাড়াই বীজ ফেলে রাখলে গাছ জন্মে যায়। আবার অধিকাংশ জমি তিন ফসলি। যদিও অনেক তিন ফসলি কৃষিজমি বর্তমানে এক ফসলি হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো উর্বর দেশ পৃথিবীতে খুব কমই রয়েছে। অথচ বছরের পর বছর ধরে তা বিবেচনাহীনভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। উপরন্তু নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণেও কৃষি ও বনভূমির পরিমাণ কমেছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কৃষিজমি অকৃষি খাতে ব্যবহারের যে বর্তমান ধারা, সেটি চলমান থাকলে ২০৭০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে আর কোনো কৃষিজমি থাকবে না। কৃষি খাত ও কৃষকের সুরক্ষায় কৃষিজমি সংরক্ষণে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে।
দেশের ভূমির নির্দিষ্ট শ্রেণীবিন্যাস না থাকায় কৃষি ও বনভূমির পরিমাণ কমছে বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তাদের মতে, সারা দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ভূমি পরিকল্পনা থাকলে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হতো। সরকারকে সে পথে হাঁটতে হবে। পূর্ণাঙ্গ ভূমি পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।










