প্রজাতন্ত্রের একজন সাবেক কর্মচারী হিসেবে আমি সচরাচর কোনো অগ্রজ, অনুজ বা সমসাময়িক সহকর্মীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মুখ খুলি না। কিন্তু ড. ফরাসউদ্দীন অত্যন্ত সুচতুরভাবে এমন কিছু বিষয়ের অবতারণা করেছেন, যা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ এবং ইতিহাসের সত্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তাই তার বক্তব্যের অসংগতি ও অসারতা নিম্নে তুলে ধরা হলো—
আমলাতান্ত্রিক সুবিধাবাদ ও স্ববিরোধী সমালোচনা
প্রাসঙ্গিকতার মূল ভিত্তি আমলাতন্ত্র: ড. ফরাসউদ্দীন নিজে সিভিল সার্ভিসের অংশ হয়ে সারা জীবন প্রশাসনিক ক্ষমতা, সুযোগ-সুবিধা ও রাষ্ট্রীয় পরিচিতি ভোগ করেছেন। তিনি যদি আমলা না হতেন বা আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর সুবিধা না পেতেন, তবে আজ সমাজে বা বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে তার কোনো প্রাসঙ্গিকতাই থাকত না। তার যেসব সহকর্মী সিভিল সার্ভিসে যোগ দেননি, তারা হয়তো নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফল হলেও ড. ফরাসউদ্দীনের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিপত্তি পাননি।
সুবিধা নিয়ে আমলাদেরই ঢালাও সমালোচনা: সাক্ষাৎকারে তিনি আমলাতন্ত্রের ঢালাও সমালোচনা করে নিজেকে এক পবিত্র ও প্রভাবমুক্ত ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। অথচ ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা কিংবা ব্যাংক খাতে শীর্ষ পদে আসীন হওয়ার ক্ষেত্রে তিনি রাষ্ট্রযন্ত্র ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব-প্রতিপত্তি শতভাগ ব্যবহার করেছেন। প্রশাসনিক আনুগত্য ও সরকারি সহায়তা ছাড়া তার এ সাফল্যগুলো অর্জন সম্ভব ছিল না। এটি তার চরম দ্বিচারিতা ও আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতার পরিচয় দেয়।
ভোটাধিকার হরণ ও প্রহসনের নির্বাচনকে ‘গণতান্ত্রিক সুযোগ’ বলে চালিয়ে দেয়া
২০১৪ সালের প্রহসনের একতরফা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শেখ হাসিনার ১০ সদস্যের মন্ত্রিসভার প্রস্তাবকে তিনি একটি বড় গণতান্ত্রিক সুযোগ হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন। বাংলাদেশে বসবাসকারী কোনো নাগরিক যখন ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে সংঘটিত ভোটাধিকার হরণের অপরাধকে লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করেন, তখন তার দেশপ্রেম, নৈতিক অবস্থান এবং জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতি আনুগত্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
তিনি ভোটাধিকার হরণের চক্রান্তকে ‘উদার প্রস্তাব’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন এবং ভোটারবিহীন নির্বাচনের মূল দায় তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের ওপর না চাপিয়ে কৌশলে বিরোধী দলের ওপর দেয়ার অপচেষ্টা করেছেন। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে চরম রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব দেখিয়েছেন। অথচ আওয়ামী লীগ নিজেই ১৯৯৪ সাল থেকে এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে দেশজুড়ে দীর্ঘ আন্দোলন ও ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি পালন করেছিল।
‘কম গণতন্ত্র, বেশি প্রবৃদ্ধি’ তত্ত্ব দিয়ে ফ্যাসিবাদকে স্বাভাবিকীকরণ
দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার উদাহরণ টেনে তিনি কম গণতন্ত্র, বেশি প্রবৃদ্ধি ধারণাকে স্বাভাবিক বলে প্রচার করেছেন। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার ঠিক এ উন্নয়ন বনাম গণতন্ত্র বয়ান ব্যবহার করেই মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও ভোটাধিকার হরণকে আড়াল করত। একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে তিনি স্বৈরাচারী শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে উল্টো বুদ্ধিবৃত্তিক ঢাল হিসেবে তোষণমূলক যুক্তির জোগান দিয়েছেন। কিন্তু এ তথাকথিত ‘উন্নয়নের’ আড়ালে অবাধ দুর্নীতি, সীমাহীন অর্থ পাচার ও ব্যাংক লুটপাটের বিষয়ে তিনি একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। দেশের মানুষের ঘাড়ে ১২০ বিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা চেপে বসার বাস্তব বিষয়টিও তিনি কৌশলে চেপে গেছেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিরোধিতা ও ফ্যাসিবাদের ভিত শক্তকরণ
নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে তিনি বিরাজনৈতিকীকরণের প্রধান অস্ত্র"হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন অসম্ভব—এটি বারবার প্রমাণিত হলেও তিনি মূলত পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের রাজনৈতিক চক্রান্তকেই প্রশাসনিক যুক্তি দিয়ে জায়েজ করার চেষ্টা করেছেন। পৃথিবীর অন্য কোথাও না থাকলেও বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরাচার রোধে এ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা ও অপরিহার্যতা যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অনুভূত হয়েছে।
ব্যক্তিকেন্দ্রিক তোষামোদ ও আনুগত্যের ইতিহাস
১৯৭৩-৭৫ মেয়াদে শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে তার অভিজ্ঞতার বর্ণনায় তিনি অত্যন্ত অতিকথনভিত্তিক তোষামোদমূলক ভাষা ব্যবহার করেছেন। এ অন্ধ তোষামোদ প্রমাণ করে তিনি কোনো পেশাদার ও নিরপেক্ষ সিভিল সার্ভিসের প্রতিনিধিত্ব করেননি; বরং আজীবন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের প্রতি অনুগত থেকে প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত সুবিধা হাসিল করেছেন।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা প্রয়োজন, শেখ মুজিবুর রহমানের পিএস/এপিএস হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিরা পরবর্তীকালে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিপুল সুবিধাভোগী গোষ্ঠী হিসেবে আবির্ভূত হন। পক্ষান্তরে অন্য রাষ্ট্রপ্রধানদের (যেমন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান) দপ্তরে দায়িত্ব পালনকারী আমলাদের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক সুবিধাভোগী বলয় তৈরি করতে দেখা যায়নি; তারা পেশাদার কর্মকর্তা হিসেবেই কাজ করেছেন।
ক্ষমতা ও মেধার অশুভ আঁতাত: ‘দরবারি বুদ্ধিজীবী’র তাত্ত্বিক রূপরেখা
ইতিহাসের পাতায় ড. ফরাসউদ্দীনের মতো বিজ্ঞজন অনেক দেখা যায়। ক্ষমতা ও মেধার এ অশুভ আঁতাত নতুন কিছু নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক দর্শনে এ প্রবণতার একটি সুনির্দিষ্ট তাত্ত্বিক ভিত্তি রয়েছে। শাসকের অনুকম্পা বা ব্যক্তিগত লাভের বিনিময়ে মেধা বিক্রি করে দেয়া এ বুদ্ধিজীবীদের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ‘দরবারি বুদ্ধিজীবী’ বা ‘গৃহপালিত সুশীল সমাজ’ বলা হয়।
এ আঁতাতের প্রধান তাত্ত্বিক ভিত্তিগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো—
জুলিয়েন বেন্দার ‘বুদ্ধিজীবীদের বিশ্বাসঘাতকতা’: ফরাসি দার্শনিক জুলিয়েন বেন্দা ১৯২৭ সালে তার বিখ্যাত এ গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেন বুদ্ধিজীবীদের মূল কাজ হলো বস্তুনিষ্ঠ সত্য, নৈতিকতা ও বিচারবুদ্ধির পক্ষে দাঁড়ানো। কিন্তু যখন তারা নীতিনৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে বস্তুগত লাভ, পদপদবি বা রাজনৈতিক ক্ষমতার তোষামোদে লিপ্ত হন, তখন তা হয় মানবজাতির প্রতি বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব ও বিশ্বাসঘাতকতা।
আন্তোনিও গ্রামসির ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’: ইতালীয় চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসি দেখিয়েছেন, কোনো স্বৈরাচারী শাসক কেবল পুলিশ বা বন্দুকের জোরে দীর্ঘদিন ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারে না। তাদের প্রয়োজন হয় জনগণের এক ধরনের বাধ্যগত সম্মতি। এ সম্মতি উৎপাদনের কাজটি করেন রাষ্ট্রপোষিত বুদ্ধিজীবীরা। তারা সূক্ষ্ম যুক্তি (যেমন কম গণতন্ত্র কিন্তু বেশি উন্নয়ন) তৈরি করে শাসকের মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন।
কার্ল শ্মিটের ‘আইনি ফ্যাসিবাদের তত্ত্ব’: ফ্যাসিবাদ কীভাবে আইনের পোশাক পরে আবির্ভূত হয়, তার তাত্ত্বিক রূপকার ছিলেন জার্মান আইনবিদ কার্ল শ্মিট। তিনি দেখান স্বৈরাচারী শাসকের প্রতিটি বেআইনি ও অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তকে রাষ্ট্রের জরুরি প্রয়োজন"বলে আইনি ও নীতিগত যুক্তি দিয়ে বৈধতা দেয়াই হলো দরবারি আমলা এবং আইনবিদদের কাজ।
আমলাতান্ত্রিক সুবিধার ‘এলিট তত্ত্ব’: সি রাইট মিলসের তত্ত্বানুযায়ী, সুবিধাভোগী আমলা ও উচ্চপদস্থ বুদ্ধিজীবীরা মূলত একটি সংঘবদ্ধ অভিজাত শ্রেণী। এরা নিজেদের ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা যেকোনো ব্যক্তির প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রদর্শন করে।
ঐতিহাসিকভাবে দরবারি বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা
নাৎসি জার্মানি: প্রখ্যাত দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার নাৎসি পার্টিতে যোগ দিয়ে হিটলারের একনায়কতন্ত্রকে সমর্থন করেছিলেন। আর কার্ল শ্মিটকে বলা হতো থার্ড রাইখের মুকুট পরিহিত আইনবিদ, যিনি হিটলারের সব অপরাধকে আইনের ধারা দিয়ে বৈধতা দিয়েছিলেন।
ফ্যাসিস্ট ইতালি: বিখ্যাত দার্শনিক জিওভান্নি জেনতিলে মুসোলিনির জন্য ‘ম্যানিফেস্টো অব দ্য ফ্যাসিস্ট ইন্টেলেকচুয়ালস’ রচনা করেন। তার যুক্তি ছিল ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্র বড়, আর একনায়কই হলো রাষ্ট্রের প্রতীক।
সোভিয়েত রাশিয়া: যোসেফ স্ট্যালিনের আমলে ট্রফিম লিসেনকোর মতো সুবিধাবাদী বিজ্ঞানীরা প্রকৃত বংশগতিবিদ্যাকে ভুল প্রমাণ করে স্ট্যালিনের মনঃপূত ভুয়া বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রচার করেন।
পরিশেষে, ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, স্বৈরাচারের মূল শক্তি কেবল তার অস্ত্র বা পুলিশ বাহিনী নয়; তার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো এ ‘তোষামোদকারী বুদ্ধিজীবী ও সুবিধাভোগী আমলাসমাজ’। তারা স্বৈরাচারের রক্তভেজা অপরাধগুলোকে আইনের ধারা, ভুয়া অর্থনৈতিক উপাত্ত এবং তথাকথিত উন্নয়নের সুশীল বয়ান দিয়ে ধোলাই করার অপচেষ্টা চালায়।
স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতনের পর শত শত মায়ের সন্তান হারানোর আর্তনাদ, গুম, খুন, লাখো মানুষের ওপর নেমে আসা অন্ধকার এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির দায় এসব তোষামোদকারী বুদ্ধিজীবীরা এড়াতে পারেন না। ড. ফরাসউদ্দীনের বক্তব্যটি কোনো বস্তুনিষ্ঠ বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণ নয়; এটি মূলত রাজানুগ্রহপ্রাপ্ত, আমলাতান্ত্রিক প্রভাব ব্যবহার করে নিজস্ব আখের গোছানো এবং পরবর্তী সময়ে সেই আমলাতন্ত্রকেই বলির পাঁঠা বানানো একজন সুযোগসন্ধানী ব্যক্তিত্বের আত্মপক্ষ সমর্থন। ইতিহাস প্রমাণ করে, ছাত্রজনতার ত্যাগের মুখে শেষ পর্যন্ত এসব ভুয়া অর্থনৈতিক উপাত্ত ও তোষামোদমূলক পাণ্ডিত্য চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায়।
শামীম আল মামুন: প্রজাতন্ত্রের সাবেক কর্মচারী এবং লোকপ্রশাসনের অধীতি
(প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব)










