বিগত সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের মতো পুঁজিবাজারেও অবাধ লুটতরাজ হয়েছে। অসংখ্য দুর্বল ও প্রায় অস্তিত্বহীন কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করে পুঁজিবাজারের বোঝা বাড়ানো হয়েছে। লাগামহীন কারসাজির মাধ্যমে দুর্বল মৌলভিত্তির, জাঙ্ক কোম্পানির শেয়ারের দাম ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। ফ্লোরপ্রাইস আরোপ, সার্কিট ব্রেকারের ঊর্ধ্বসীমা ও নিম্নসীমায় নানা কৃত্রিম ব্যবস্থায় বাজারের এ অবস্থা ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। গত ৫ আগস্ট বিগত সরকার পতনের পর পুঁজিবাজারের প্রকৃত ক্ষত পুরোপুরি উন্মোচন হতে শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজার উন্নয়ন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো ও আন্তর্জাতিক মানের সুশাসন নিশ্চিত অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এর ধারাবাহিকতায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুঁজিবাজার সংস্কারে বেশকিছু উদ্যোগ নেয়। তার মধ্যে অন্যতম গত সেপ্টেম্বরে পুঁজিবাজারে সংঘটিত নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও কারসাজির ঘটনা খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের একটি অনুসন্ধান ও তদন্ত কমিটি গঠন।
কিন্তু শুরুতেই এ অনুসন্ধান ও তদন্ত কমিটি নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এমনিতেই বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন ও পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিএসইসি সবসময় ব্যর্থ হয়েছে। এমন বিতর্কিত কমিটি গঠনের মাধ্যমে সংস্থাটির কার্যক্রম আবারো প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। অথচ পুঁজিবাজারের ক্ষত সারিয়ে তুলতে একটি বিতর্কমুক্ত শক্তিশালী কমিটি বর্তমানে অতি আবশ্যক ছিল, যেটি পুঁজিবাজারে অনিয়ম-দুর্নীতি দূর করতে স্বচ্ছ প্রতিবেদন ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ তুলে ধরবে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার করবে।
বিএসইসির পক্ষ থেকে গঠন করা অনুসন্ধান ও তদন্ত কমিটি নিয়ে দুটি বিষয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক রয়েছে। প্রথমত, এ কমিটি গঠন করা হয়েছে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স ১৯৬৯-এর সেকশন ২১ ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন ১৯৯৩-এর ধারা ১৭ (ক)-এ দেয়া ক্ষমতাবলে। এ দুই ধারার ওপর ভিত্তি করে সাধারণত তালিকাভুক্ত কোম্পানি, স্টক এক্সচেঞ্জ ও বাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে তদন্ত করা হয়। আলোচ্য দুই ধারায় বিএসইসির নিজেদের কর্মীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করার বিষয়টি নিয়ে সরাসরি না থাকায় এ কমিটি গঠনের যৌক্তিকতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে। আরেকটি বড় বিতর্কের জায়গা এর সঙ্গে পুঁজিবাজার অংশীজনদের সংশ্লিষ্টতা।
পুঁজিবাজারের অংশীজন হিসেবে পরিচিত দুটি প্রতিষ্ঠানের দুই শীর্ষ কর্মকর্তাকে কমিটির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থায় কর্মরত ব্যক্তিও এর অন্তর্ভুক্ত। এতে শুরুতেই স্বার্থগত দ্বন্দ্বের (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) বিষয়টি আলোচনায় আসে। এদিকে বিএসইসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকেও এ তদন্ত কমিটির দেয়া প্রতিবেদনগুলোকে ‘বিতর্কিত’ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে। এমনকি এসব ঘিরে বিএসইসির চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের অবরুদ্ধ করা, হট্টগোল, সেনা পাহারায় সংস্থাটির শীর্ষ কর্তাদের অফিস ত্যাগ ও অফিসে প্রবেশ এবং কর্মবিরতির মতো ঘটনাও ঘটেছে।
কিন্তু এ ধরনের বিতর্ক এড়ানোর সুযোগ বিএসএইসির ছিল। পুঁজিবাজার বা বিএসইসির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন, এমন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন ছিল। স্বাভাবিকভাবেই অংশীজন বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কারোর সংশ্লিষ্টতা কমিটির প্রতিবেদনকে প্রভাবিত করার সুযোগ থেকেই যায়। এক্ষেত্রে বরং তদন্তের গ্রহণযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে নিরপেক্ষ ব্যক্তির সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা সমীচীন ছিল। এতে তদন্ত কমিটির স্বার্থগত দ্বন্দ্বের বিষয়টিও এড়ানো যেত। আর সেটি নিশ্চিত করা গেলে কমিটির কার্যক্রম ও প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার অবকাশ না থাকার সম্ভাবনাই বেশি ছিল।
শেয়ারবাজারে ১৫ বছরের ব্যবধানে বড় দুটি কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে। একটি ১৯৯৬ সালের এবং অন্যটি ২০১০ সালের কেলেঙ্কারি হিসেবে বহুল আলোচিত। এ দুই কেলেঙ্কারির ঘটনার সময় দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। এ দুই কেলেঙ্কারির পর তৎকালীন সরকারের উদ্যোগে গঠন করা হয়েছিল তদন্ত কমিটি। সে কমিটি তদন্ত প্রতিবেদনও জমা দেয়। তাতে অভিযুক্ত করা হয়েছিল অনেককে। কিন্তু অপরাধীদের বিচার ও শাস্তির বিষয়ে সবার যে প্রত্যাশা ছিল, সেটি পূরণ হয়নি। ফলে অপরাধীদের মধ্যে কোনো ধরনের ভয়ভীতির সঞ্চার করা সম্ভব হয়নি। উল্টো তাদের কাছে বার্তা গেছে— অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়। যে কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের আস্থাহীনতা এখনো পরিলক্ষিত হয়।
তবে প্রথমবারের মতো এবারই বিএসইসি নিজেই অতীতের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে, যা প্রশংসনীয়। যদি অংশীজনদের বাইরে থেকে ব্যক্তির সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা যেত তবে তা আরো বেশি যৌক্তিক হতে পারত। এর আগের কমিটির মতো এ কমিটি ঘিরেও তেমন কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, পুঁজিবাজারের অংশীজন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে এ দুজন আগে বিএসইসির নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর অধীনে ছিলেন। এতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো সিদ্ধান্তের কারণে তারা অতীতে সংক্ষুব্ধ হয়ে থাকতেই পারেন। ফলে বিএসইসির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত করতে গিয়ে তাদের পক্ষে কতটা নির্মোহ থাকা সম্ভব সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
বর্তমানে পুঁজিবাজারের তদন্ত ও অনুসন্ধান কমিটি ঘিরে নতুনভাবে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তা দীর্ঘায়িত হওয়া সমীচীন হবে না। স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত কার্যক্রমের জন্য সরকারের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। তদন্ত কার্যক্রমকে অবশ্যই বিএসইসির প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও কারসাজির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। আর্থিক খাত ও পুঁজিবাজারের প্রয়োজনীয় সংস্কারের পাশাপাশি সুশাসন নিশ্চিত করা আবশ্যক। মূলত এমন উদ্যোগের পথে হাঁটতে হবে যাতে পুঁজিবাজার শক্তিশালী হয়ে ওঠে।










