দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়ার পথে অন্যতম বাধা হলো ব্যবসা পরিবেশ সহজ নয়। এক্ষেত্রে নানামুখী প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, যার মধ্যে একটি হলো জটিল ও অযৌক্তিক শুল্ক কাঠামো। এ কারণে ব্যবসা সম্প্রসারণ ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রেও ঝুঁকির আশঙ্কা রয়ে গেছে। এসব ঝুঁকি কাটিয়ে উঠতে হলে প্রয়োজন একটি ন্যায্য শুল্ক কাঠামো গড়ে তোলা।

বিগত সময়ে দেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। অর্থনীতির আকার বেড়েছে। এর পরও দেশের জিডিপির বিপরীতে কর আহরণ বাড়েনি। কর-জিডিপির অনুপাত এখনো উন্নয়নশীল ও অনেক স্বল্পোন্নত দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কম। কিন্তু আগামীতে এলডিসি উত্তরণের পর যখন শুল্কছাড়, বাণিজ্যিক সুবিধা ও নীতিসহায়তা ক্রমেই কমবে, তখন দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে একটি টেকসই ও যৌক্তিক শুল্ক কাঠামো গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের কর ব্যবস্থা মূলত পরোক্ষ করকেন্দ্রিক। বিশেষ করে সম্পূরক ও আবগারি শুল্ক রাজস্ব আহরণের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ আসে এ শুল্ক থেকে, যা আধুনিক অর্থনীতির কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সাধারণত অর্থনীতি যত উন্নতির দিকে যায়, তত তাতে প্রত্যক্ষ করের অবদান বৃদ্ধির কথা। কিন্তু বাংলাদেশে এর বিপরীত চিত্রই দেখা যাচ্ছে। এখনো সে ধরনের কোনো রূপান্তর কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ঘটেনি।

আবগারি ও সম্পূরক শুল্ক আরোপের নীতিগত উদ্দেশ্য স্পষ্ট। এসব শুল্ক একদিকে রাজস্ব সংগ্রহে সহায়তা করে, অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর কিংবা বিলাসী পণ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। আন্তর্জাতিকভাবে তামাক, অ্যালকোহল বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্কারোপ একটি স্বীকৃত নীতি। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ শুল্ক অনেক সময় তার নীতিগত সীমা অতিক্রম করে অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

বাস্তবতা হলো, বহু পণ্যে সম্পূরক ও আবগারি শুল্কহার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা ব্যবসা পরিচালনার খরচ অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে একদিকে ভোগ সংকুচিত হচ্ছে, অন্যদিকে সেসব পণ্যের উৎপাদন ও বিনিয়োগও ব্যাহত হচ্ছে। দেশীয় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো পর্যন্ত উচ্চ শুল্ককে অন্যতম প্রধান ব্যবসায়িক ঝুঁকি হিসেবে দেখছে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এটি একটি নেতিবাচক সংকেত।

এ প্রেক্ষাপটে যৌক্তিক শুল্কহার নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যৌক্তিক শুল্কহার বলতে এমন একটি কাঠামো বোঝায়, যেখানে শুল্কের মাত্রা রাজস্ব প্রয়োজন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও ব্যবসা পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। অযৌক্তিকভাবে উচ্চ শুল্কারোপ করে স্বল্পমেয়াদে কিছু রাজস্ব পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে তা টেকসই হয় না। বরং কর ফাঁকি বাড়ে, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার বাড়তে থাকে। পাশাপাশি রাজস্ব আহরণের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা আরো প্রকট হয়ে দাঁড়ায়। যদিও এ খাতই দেশের কর্মসংস্থান ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের প্রধান চালিকাশক্তি, কিন্তু জটিল ও উচ্চ শুল্ক কাঠামোর কারণে তারা কর ব্যবস্থার বাইরে থাকার চেষ্টা করে, আবার বাধ্যও হয়। এতে রাজস্ব আহরণ কমে এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে নিরুৎসাহিত হয়। ফলে ব্যবসা সহজীকরণের লক্ষ্য ব্যাহত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।

শুল্ক কাঠামোর জটিলতাও একটি বড় সমস্যা। দেশে প্রায় ১ হাজার ৭০০টি আবগারি শুল্ক লাইন এবং হাজার হাজার আদর্শমাত্রা বিদ্যমান। এত বেশি স্তর ও হার ব্যবসায়ীদের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করে এবং রাজস্ব প্রশাসনের সক্ষমতাকেও দুর্বল করে। তাই ব্যবসা সহজীকরণের পূর্বশর্ত হলো একটি সহজ স্বচ্ছ ও পূর্বানুমেয় শুল্ক ব্যবস্থা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আবগারি শুল্ক নির্ধারণের পদ্ধতি। বাংলাদেশে এখনো মূলত মূল্যভিত্তিক শুল্ক ব্যবস্থার প্রচলন রয়েছে। এতে পণ্যের মূল্য কম দেখিয়ে কর ফাঁকির সুযোগ তৈরি হয় এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়। আধুনিক বিশ্বে পরিমাণভিত্তিক আবগারি শুল্ক বেশি কার্যকর ও স্বচ্ছ হিসেবে বিবেচিত। এ পদ্ধতিতে রূপান্তর রাজস্ব স্থিতিশীলতা ও নীতিগত স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে। এছাড়া দেশীয় ও আমদানীকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন আবগারি শুল্কহার আরোপ করাটাও দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার কারণ হয়ে উঠতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে দেশীয় শিল্প সুরক্ষার যুক্তি দেয়া হলেও এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্য রাখতে হবে। বৈষম্যমূলক শুল্ক কাঠামো তখন বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এলডিসি উত্তরণ শুধু একটি মর্যাদাগত অর্জন নয়; এটি নীতিগত শৃঙ্খলা ও কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়। উত্তরণের পর শুল্কছাড়, রফতানি সুবিধা ও নীতিগত সুরক্ষা কমে যাবে। তখন যদি অভ্যন্তরীণ রাজস্ব কাঠামো শক্তিশালী ও যৌক্তিক না হয়, তাহলে উন্নয়নের গতি ধরে রাখা কঠিন হবে। এজন্য প্রয়োজন একক ও সহজ শুল্ক কাঠামো। সেই সঙ্গে প্রতিটি স্তরে যৌক্তিক শুল্কহার নির্ধারণ করতে হবে এবং সেটি হতে হবে তুলনামূলক টেকসই। শুল্ক নীতিতে হঠাৎ পরিবর্তনের প্রবণতা কমিয়ে আনা এক্ষেত্রে জরুরি।

ব্যবসা সহজীকরণ ও এলডিসি উত্তরণ—এ দুটি অনেকাংশে একে অন্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যৌক্তিক শুল্ক কাঠামো ছাড়া কোনোটিই টেকসই হবে না। অযৌক্তিক উচ্চ শুল্কনির্ভরতা থেকে সরে এসে একটি আধুনিক, ন্যায্য ও ব্যবসাবান্ধব শুল্ক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে উদ্যোগ নিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা জাতীয় কর কাঠামো পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনেও এ বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিদ্যমান পরোক্ষ করনির্ভর রাজস্ব আহরণ নীতি থেকে সরে প্রত্যক্ষ কর বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি শুল্ক কাঠামো আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে রফতানি ও আমদানির বিকল্প পণ্যের কার্যকর সুরক্ষা সমান করারও সুপারিশ করেছে এ টাস্কফোর্স। এগুলোর পাশাপাশি সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো, রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে যেসব অনিয়ম-দুর্নীতি বিরাজ করছে, সেগুলো দূর করা। এতে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পথ প্রশস্ত হবে।