কিন্তু ঢাকার মতো শহরের জন্য ইঁদুরের বিপদ বহুমাত্রিক। গ্রামে ইঁদুর ফসল নষ্ট করে। কিন্তু শহরে ইঁদুর খাদ্য, সম্পদ নষ্টের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি। এ পার্থক্য অনুধাবন করতে না পারলে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ সফল হবে না। বণিক বার্তার প্রতিবেদনই বলছে, ঢাকার অলিগলি, কাঁচাবাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ড্রেন এমনকি আবাসিক এলাকায় ইঁদুর মানুষের বিরক্তির কারণই নয়, বরং ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যঝুঁকির উৎস। এদের মলমূত্র ও শরীরের সংস্পর্শে খাবার ও পানি দূষিত হয়ে মানুষের শরীরে অন্তত ৬০ ধরনের সংক্রামক রোগ ছড়াতে পারে। শহরের বিভিন্ন স্থানে ইঁদুর দেখা গেলেও এদের নিয়ন্ত্রণে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো পদক্ষেপ নেই। এক্ষেত্রে উদাসীনতা ভবিষ্যতে নগরবাসীর খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

ইঁদুর কিংবা মশা-মাছির উপদ্রব বাড়ার পেছনে নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট দায়ী। দেশের প্রধান শহরগুলো মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় আট হাজার টন পৌর বর্জ্য উৎপাদন হয়। এসব বর্জ্যের ৭০ শতাংশই ঢাকা থেকে আসে, যার অধিকাংশই সময়মতো অপসারণ করা হয় না। ঢাকার মাত্র ১৫ শতাংশ বর্জ্য অনানুষ্ঠানিক খাতে পুনর্ব্যবহার হয়, বাকিটা অনিয়ন্ত্রিত ল্যান্ডফিল ও খোলা জায়গায় ফেলা হয়। এসব বর্জ্য ইঁদুরের বাসস্থান গড়ে তোলার জন্য উপযুক্ত। এরই মধ্যে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অব্যবস্থাপিত বর্জ্য পরিবেশ সম্পূর্ণ বিপজ্জনক বাস্তুসংস্থান তৈরি করে। কারণ ইঁদুর বাড়লে সাপ ও বেজির উপদ্রব বাড়ার শঙ্কাও থাকে। এছাড়া অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য মশা-মাছিসহ নানা ক্ষতিকর কীটপতঙ্গের উপদ্রবও বাড়ায়। ইঁদুর পচা বর্জ্যে বসবাস করায় সেখান থেকে পানি ও খাদ্যদ্রব্যে যায়, ফলে বর্জ্যের জীবাণুগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

শহরে ইঁদুরের বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হতে পারে। এ ঝুঁকির তীব্রতাও বহুমুখী। ভাইরাস বিশেষজ্ঞদের মতে, ইঁদুর কমপক্ষে ৬০ ধরনের রোগের বাহক। ইঁদুরের শরীর, লোম ও মলমূত্র থেকে জীবাণু সরাসরি বা বাতাসের মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করতে পারে। এটি সরাসরি কামড় না দিলেও ক্ষতি করতে পারে। যখন একটি ইঁদুর রান্নাঘরের বাসনপত্রের ওপর দিয়ে হাঁটে, তখন তার শরীরের জীবাণু সেসবে লেগে যায়। এরপর সেই বাসন দিয়ে রান্না বা খাওয়া হলে মানুষ সংক্রমিত হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে হান্টাভাইরাস, লেপ্টোস্পাইরোসিস, সালমোনেলোসিস, বাতজ্বর এবং পরোক্ষভাবে টাইফয়েডের জীবাণু বিস্তার। এরই মধ্যে হান্টা ভাইরাস নিয়ে উদ্বিগ্ন গোটা বিশ্ব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এ ভাইরাসের বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেছে। ইঁদুরের মলমূত্রের মাধ্যমে ছড়ানো এ ভাইরাসের একটি দুর্বল ধরনের অস্তিত্ব বাংলাদেশে রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে দুর্বল হলেও এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। অবশ্য হান্টা ভাইরাসের চেয়ে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি র‍্যাবিস বা জলাতঙ্ক। চিকা বা ক্ষুদ্র ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর কামড়ে এ রোগ ছড়াতে পারে যা চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় মারাত্মক আকার ধারণ করে। এছাড়া ঢাকার একটি নিম্নআয়ের নগরীয় এলাকায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের ১১ শতাংশই লেপ্টোস্পাইরোসিসে আক্রান্ত। এ রোগের প্রধান বাহক ইঁদুর। এদিকে শহরাঞ্চলের বড় হাসপাতালগুলোতেও ইঁদুরের বিচরণ দেখা গেছে। ফলে চিকিৎসা নিতে আসা দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন রোগী বিশেষত শিশুরা ইঁদুরবাহিত সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সার্বিক দিক বিবেচনা করে ইঁদুরের বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রথম শর্ত বর্জ্যের উৎসকে আলাদা করা। বর্জ্যের ধরনভেদে ‘উৎস পৃথক্‌করণ’ না করলে তা পুনর্ব্যবহার অসম্ভব হয়ে পড়ে। এতে ইঁদুর ও মশার প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ল্যান্ডফিলে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপক নিজেও স্বীকার করেছেন বর্জ্যের উৎস পৃথক‌্করণে আমরা পিছিয়ে আছি। তবে জনসংখ্যাবহুল দেশের জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এমন ঘাটতি স্বাস্থ্যকর কিছু নয়। বর্জ্য উৎস পৃথক্‌করণের জন্য প্রতি বাড়িতে জৈব, অজৈব ও বিপজ্জনক—এ তিন উৎসের ভিত্তিতে আলাদা পাত্র রাখা বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ওয়ার্ড পর্যায়ে পরীক্ষামূলক প্রকল্প দ্রুত শুরু করে গোটা ঢাকায় সম্প্রসারণের পথনকশা তৈরি করতে হবে। এ কাজে সফলতার জন্য প্রণোদনা চালু এবং অবহেলা করলে জরিমানার বিধান রাখা জরুরি। বাজার এলাকায় দিনে দুবার বর্জ্য অপসারণ বাধ্যতামূলক করা দরকার। ওয়ার্ড পর্যায়ে কম্পোস্টিং প্লান্ট ও বায়োগ্যাস ইউনিট স্থাপন করলে জৈববর্জ্য কমবে, ইঁদুরের খাদ্য সংস্থান কমবে এবং একই সঙ্গে সার ও জ্বালানি তৈরি হবে।

ইঁদুরের বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণে এদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল নষ্ট করতে হবে। প্লাস্টিক ও বর্জ্যে ভরাট ড্রেন ইঁদুরের নিরাপদ আশ্রয়। মৌসুমি পরিষ্কারের বাইরে মাসিক পর্যবেক্ষণ ও নিয়মিত অ্যান্টি-রডেন্ট ট্রিটমেন্ট চালু করতে হবে। খাল ও জলাশয় দখলমুক্ত রাখতে হবে, কারণ জলাভূমি কমে যাওয়া ইঁদুরকে মানুষের কাছাকাছি ঠেলে দিচ্ছে। শুধু বিষ দেয়া নয়, পরিবেশবান্ধব ইন্টিগ্রেটেড পেস্ট ম্যানেজমেন্ট (আইপিএম) পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ট্র্যাপিং, হ্যাবিটাট মডিফিকেশন ও বায়োলজিক্যাল কন্ট্রোল। উন্নত দেশ যেমন ব্রিটেন, সিঙ্গাপুর বা জাপানে নগর পর্যায়ে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণে বার্ষিক পরিকল্পনা ও বাজেট আছে। ঢাকায় এমন একটি বার্ষিক রোডেন্ট কন্ট্রোল প্ল্যান চালু করতে হবে। ভবনে দেয়ালের ফাটল বা ড্রেনের মুখে যেন ইঁদুরের প্রবেশপথ তৈরি না হয় সেজন্য নির্মাণবিধিতে সিলের জন্য বাধ্যবাধকতা আনতে হবে। নতুন ভবন নির্মাণ ও পুরনো ভবন সংস্কারে রোডেন্ট-প্রুফিং মানদণ্ড অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

ঢাকায় বর্তমানে ইঁদুরের জনসংখ্যা সম্পর্কে কোনো সরকারি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা নেই। অবিলম্বে ওয়ার্ড পর্যায়ে রডেন্ট ইনডেক্স পর্যবেক্ষণ চালু করতে হবে। কাঁচাবাজার, হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকার জন্য আলাদা ঝুঁকিমাত্রা নির্ধারণ করে নিয়মিত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের জন্যও আলাদা প্রস্তুতি হিসেবে হান্টা ভাইরাস, লেপ্টোস্পাইরোসিস ও র‍্যাবিসের মতো ইঁদুরবাহিত রোগকে বাধ্যতামূলক নোটিফিকেশন রোগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অব্যাখ্যাত জ্বর, ফুসফুসের জটিলতা বা বৃক্কের সমস্যায় ভর্তি রোগীদের ক্ষেত্রে রুটিনভাবে রোডেন্ট-সংক্রান্ত পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আইইডিসিআর (রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট)-কে ঢাকার কাঁচাবাজার ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার ইঁদুর থেকে নিয়মিতভাবে নমুনা সংগ্রহ ও ভাইরাল স্ক্রিনিং পরিচালনা করতে হবে। লেপ্টোস্পাইরোসিসের মতো রোগের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক (ডক্সিসাইক্লিন, পেনিসিলিন) সরকারি হাসপাতালে মজুদ নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া ইঁদুরবাহিত রোগ মোকাবেলায় কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত ‘এক স্বাস্থ্য’ পদ্ধতিতে কাজ করতে হবে।

ইঁদুর কোনো নতুন সমস্যা নয়, কিন্তু আজকের ঢাকায় এটি নতুন বিপদের চেহারা নিয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, বর্জ্যে ডুবন্ত মহানগরী এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতা মিলে একটি নীরব স্বাস্থ্য সংকট তৈরি করেছে। সিটি করপোরেশনগুলো পরীক্ষামূলক প্রকল্পের কথা বলছে, কিন্তু ‘পরীক্ষামূলক’ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে ‘বাস্তবায়ন’ মানসিকতায় প্রবেশের সময় এসেছে। বর্জ্য পৃথক্‌করণ, নিয়মিত অপসারণ, রডেন্ট নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি এবং রোগ নজরদারি—এ চার স্তম্ভ একসঙ্গে শক্তিশালী না করলে ইঁদুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নগর কর্তৃপক্ষ পিছিয়েই থাকবে। এক্ষেত্রে নাগরিক সচেতনতাও সমানভাবে জরুরি। তবে বৈজ্ঞানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত এবং তার প্রয়োগ করতে না পারলে ইঁদুর ভবিষ্যতে খাদ্যনিরাপত্তা ও নগর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঝুঁকিতে ফেলবে।