বেঁচে থাকা ও উন্নতির জন্য মানুষ নির্ভর করে সহযোগিতার ওপর। যদিও মানুষের সেরা ও সবচেয়ে উদ্ভাবনী কাজগুলোর বেশির ভাগেরই উদ্ভব ঘটেছে প্রতিযোগিতা থেকে। সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সবসময় সহজ হয় না। কিন্তু আশাতীতভাবে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষেত্রেও এটি খুব বেশি জটিল কাজ নয়। আর এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে গেম থিওরির অন্তর্নিহিত বিষয়াদি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি সে সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন, তাহলে তার দেশ ও বিশ্ব উপকৃত হতে পারে।
নোবেলজয়ী জন ন্যাশ, গণিতবিদ জন ভন নিউম্যান ও অর্থনীতিবিদ ওস্কার মর্জেনস্টার্নের কাজের ওপর ভিত্তি করে যৌক্তিক এজেন্টদের মধ্যে সহযোগী ও অসহযোগী মিথস্ক্রিয়া বিশ্লেষণ করে। এর মাধ্যমে তিনি আধুনিক গেম থিওরির গাণিতিক ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। এ থিওরির মূল বার্তা হলো, অসংখ্য অর্থনৈতিক অংশীজনের মধ্যে মুক্ত ও ন্যায্য প্রতিযোগিতা সর্বোত্তম ফলাফল আনে। কিন্তু একচেটিয়া ক্ষমতা বা সরকারি হস্তক্ষেপের কারণে যদি এ ধরনের প্রতিযোগিতায় বিঘ্ন ঘটে, তবে এর ফলাফল অতিমাত্রায় খারাপ হতে পারে। বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি থেকে আরো স্পষ্ট বোঝা সম্ভব।
মনে করি, যুক্তরাষ্ট্র তার প্রধানতম প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সঙ্গে একটি খেলায় রয়েছে এবং উভয়ের সামনে দুটি নীতিপথ আছে, যার মধ্যে একটি বেছে নিতে হবে। সেই দুটি হলো উচ্চশুল্ক বা নিম্নশুল্ক। যদি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ই নিম্নশুল্ক বেছে নেয়, তাহলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য শক্তিশালী হবে। কেবল তা-ই নয়, এতে দুই দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অর্থনীতি শক্তিশালী এবং তাদের অর্জনও প্রায় সমান হবে।
যদি যুক্তরাষ্ট্র এ ফলাফলে সন্তুষ্ট না হয়, তাহলে সে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করবে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো চীনের পণ্যের ওপর শুল্কহার বাড়িয়ে দেবে। আবার এর পাশাপাশি যদি চীনে মার্কিন পণ্যের শুল্কহারও তুলনামূলক কম হয় তাহলে এতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে যুক্তরাষ্ট্র। বিপরীতে চীনের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তবে নিশ্চিতভাবে এ কৌশলে একটি ত্রুটি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনের পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্কারোপ করে, তাহলে চীনের মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক কম রাখার বিশেষ কোনো কারণ নেই। আর একবার চীন শুল্কহার বাড়িয়ে দিলে যুক্তরাষ্ট্র-চীন উভয়ের অর্জন আবারো সমান হতে পারে। তবে সেই অর্জন শুল্কহার কম থাকার সময়ের তুলনায় স্বল্প হবে। কেননা উচ্চশুল্ক বাণিজ্যের গতি কমিয়ে আনবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে বাণিজ্যিক গতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্ব বাণিজ্যের অংশীজনরা নিজেদের এমন এক পরিস্থিতিতে নিয়ে পৌঁছান, যা কারাবন্দির দোদুল্যমান অবস্থার (প্রিজনার্স ডিলেমা) কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে দুজন অভিযুক্ত আটক ব্যক্তিকে পৃথকভাবে রাখা হয় এবং কেউই যদি কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো তথ্য ফাঁস না করে, তবে তারা কঠোর কোনো শাস্তির মুখোমুখি হবেন না। এক্ষেত্রে একটা ঝুঁকি রয়ে যায়। সেটি হলো যেকোনো একজন কয়েদি নিজের শাস্তির পরিমাণ কমিয়ে আনতে বা একেবারেই কোনো শাস্তি না পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট অনেক তথ্য কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এ পন্থা তখনই কাজে দেয়, যখন অন্য পক্ষ চুপ করে থাকে। অন্যদিকে, তারা উভয়ই যদি কর্তৃপক্ষের কাছে সব স্বীকার করে নেয়, তাহলে তারা চুপ থাকলে যে সুবিধা পেত, তার চেয়ে আরো খারাপ পরিস্থিতিতে পড়তে পারে।
অর্থাৎ বিশ্বাসঘাতকতার পথ বেছে নিলে বড় ধরনের সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে একই সঙ্গে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। একইভাবে চুপ থাকলে উভয় ‘কয়েদি’ সুবিধা পেতে পারে। তবে সবভাবেই একজন বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
শুল্কের ক্ষেত্রে পার্থক্য হলো শুল্ক বা পাল্টা শুল্ক আরোপের মতো ঘটনার পর যেকোনো দেশ তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে। চীন প্রথমে সহযোগিতার পথ বেছে নিতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতোই শুল্কহার বাড়াতে পারে। এতে আবার যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতামূলক পথে হাঁটতে পারে এবং তারপর সহযোগীর ভূমিকায় ফিরতে পারে।
তদুপরি, এসব ক্ষেত্রে দেশগুলো চাপ প্রয়োগের জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করতে পারে, যার মধ্যে একটি হতে পারে রফতানি পণ্য সীমিত করা। যেমন চীনের বিরল খনিজ বা যুক্তরাষ্ট্রের সেমিকন্ডাক্টরের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ পণ্য রফতানি সীমিত করা থেকে শুরু করে সামরিক পদক্ষেপ পর্যন্ত নিতে পারে। যখন যুক্তরাষ্ট্র একই ধরনের পদক্ষেপ তার ঘনিষ্ঠ মিত্র, যেমন জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রে নেয়, তখন যুক্তরাষ্ট্র তাদের দেয়া নিরাপত্তা প্রত্যাহারের হুমকিও দিতে পারে। এ কারণে মার্কিন প্রশাসন যখন শুল্ক বাড়ায়, তখন অন্যান্য দেশ পাল্টা পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত থাকে। তবে কতদিন পর্যন্ত তারা নিজেকে বিরত রাখতে পারবে, সেটি নির্ভর করবে তাদের সহনশীলতার মাত্রার ওপর।
গেম থিওরিস্টদের যুক্তি হলো, প্রিজনার্স ডিলেমা পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হতে থাকলে সেটি শেষ পর্যন্ত ভালো ফলাফল বয়ে আনে। কেননা তুলনামূলক কম ধৈর্যশীল দেশ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল পরিত্যাগ করতে পারে। এটি আরো কার্যকর হতে পারে, যখন কম ধৈর্যশীল পক্ষই বেশি অসহযোগী হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটতে পারে। কিন্তু এজন্য তার বোঝা জরুরি যে চীনের ওপর আরোপিত উচ্চ পাল্টা শুল্কের জবাবে চীনও যেকোনো উপায়ে পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে।
যা-ই হোক না কেন, পাল্টাপাল্টিভাবে উচ্চ শুল্কারোপ চলতে থাকলে তার জন্য চড়া মূল্য দিতে হবে। শুল্ক চাহিদা-সরবরাহ গ্রাফের চাহিদা ও সরবরাহ রেখার একটি আনুভূমিক ব্যবধান তৈরি করে, যা সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। এ ধরনের অব্যবস্থাপনা কেবল মুদ্রানীতি দিয়ে বাগে আনা যায় না। উপরন্তু শুল্ক প্রত্যাহার করলেই আগের শুল্কাবস্থায় ফেরত যাওয়া যায় না, বিশেষ করে যদি তা দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর থাকে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির ক্ষেত্রেও এটাই সত্য। এটি এরই মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির কিছু মৌলিক ক্ষতি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার কমানোকে কসমেটিক সার্জারির সঙ্গে তুলনা করা যায়।
এ কারণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোগুলোর প্রাথমিক ও অন্যতম লক্ষ্য থাকে, কয়েদির মধ্যে যেন দোদুল্যমান মনোভাব তৈরি না হয়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) গঠন হয়েছিল সহযোগিতার পথ প্রশস্ত করতে। এজন্য ডব্লিউটিও সনদে বলা হয়েছে, শুল্কহার হতে হবে নিয়ন্ত্রিত ও সুষম। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯ সাল থেকে আপিলেট বডির শূন্যপদ পূরণে নতুন বিচারক নিয়োগে বাধা দিয়ে ডব্লিউটিওর বিরোধ-নিষ্পত্তি প্রক্রিয়াকে অকার্যকর করে রেখেছে। সম্প্রতি এটি ‘সর্বাধিক অনুকূল জাতি’কে তার টার্গেটে পরিণত করেছে, যারা বিশ্ব বাণিজ্যের ভারসাম্য ধরে রাখতে চায়।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের হ্যারি গর্ডন জনসন একবার এক সেমিনারে বলেছিলেন, ‘আমি প্রায় বিশ্ব অর্থনীতির সম্পর্ককে দাবা খেলার মতো দেখি: যদি এক দেশে ঘোড়া একভাবে চলে, তাহলে অন্য দেশে রানী সেভাবে চলে।’ তিনি যথার্থ বলেছিলেন। যদিও এ কাঠামোয় মনে করা হয়, যত ভালো বা খারাপভাবেই খেলা হোক না কেন, সবাই একই নিয়ম অনুসারে খেলে। বর্তমানে চেকমেট বা স্টেলেমেটের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। তবে যেকোনো সময় যুক্তরাষ্ট্র পাশার চাল পাল্টে ফেলতে পারে, সে ঝুঁকিও কম নয়।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
কোইচি হামাদা: ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক। জাপানের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা
ভাষান্তর: সাবরিনা স্বর্ণা










