কৃষি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল সার। দেশে ডলার সংকট ও গ্যাসের অভাবে সার উৎপাদন এবং আমদানি দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাহত হচ্ছে। এতে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে সার সরবরাহে। অথচ দেশের চলমান মৌসুম এবং আসন্ন বোরো ও রবি মৌসুমে উচ্চ ফলনের জন্য প্রয়োজন নির্বিঘ্ন সার সরবরাহ। দেশে সবচেয়ে বেশি খাদ্যশস্য উৎপাদন হয় এ সময়টিতেই। আশঙ্কা রয়েছে সারের অপর্যাপ্ত মজুদের কারণে খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হওয়ার। এ ঝুঁকি এড়াতে এখন সরকারের প্রাধান্য দেয়া প্রয়োজন সারের মজুদ বাড়ানোয় এবং অব্যাহতভাবে পণ্যটির সরবরাহ নিশ্চিত করায়। 

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের সরকারি গুদামগুলোয় সারের মজুদ আছে প্রায় ১৮ লাখ টন। যেখানে দেশের চলতি অর্থবছরে সারের মোট চাহিদা হতে পারে ৬৯ লাখ টন।

দেশে কৃষি চাষাবাদ ও ফসল উৎপাদনের জন্য মোট রাসায়নিক সারের ৭০ শতাংশেরও বেশি ব্যবহার হয় শুধু বোরো ও রবি মৌসুমে। কৃষিবিদদের মতে, বর্তমানে যে মজুদ আছে তা দিয়ে দেশের আসন্ন প্রয়োজন তাৎক্ষণিকভাবে মেটানো যাবে না। এছাড়া এরই মধ্যে দেশের পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে তিনটির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে গ্যাসের অভাবে। দেশে সারের মোট চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ পূরণ হয় আমদানির মাধ্যমে। তবে এখন আমদানিতেও দেখা দিয়েছে মন্থরগতি। ফলে আসন্ন রবি ও বোরো মৌসুমে সারের প্রয়োজনীয় জোগান নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

এর বাইরে সাম্প্রতিক বন্যা সারের অভাব আরো প্রকট করে তুলেছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মত, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে বোরো উৎপাদনে বর্তমানে আরো বেশি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। কেননা বন্যায় আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু এলসি জটিলতায় সার আমদানি কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের মতে, রেশনিং করে হলেও গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে সার কারখানাগুলোকে পুরোদমে উৎপাদনে নিয়ে আসা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রক্রিয়াগত জটিলতা দূর করে আমদানির মাধ্যমে সারের পর্যাপ্ত জোগান নিশ্চিত করতে হবে। 

দেশে রাসায়নিক সার আমদানি হয় মূলত বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) মাধ্যমে। ইউরিয়া সারের পুরোটাই আমদানি করে বিসিআইসি। সরকারি প্রতিষ্ঠান দুটি বছরের যেকোনো সময় চাইলে সার আমদানি করতে পারে। তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের কেবল মে মাসে দরপত্রে অংশ নেয়ার মাধ্যমে সার আমদানি করতে পারে।

সরকারের কাছে আগের পাওনা বকেয়া থাকায় বেসরকারি পর্যায়ে সার আমদানি নিয়ে এক ধরনের অনীহা তৈরি হয়েছে বলা যায়। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের শুরুতে ছয় লাখ টন সার আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু দেশের বড় আমদানিকারকরা তাতে সাড়া দিচ্ছেন না। গত জুনে দুটি দরপত্র আহ্বান করা হলেও এর একটিতে কেউ অংশ নেয়নি। দ্বিতীয়টিতে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। কৃষি মন্ত্রণালয় ও সার আমদানিকারক সূত্রে জানা যায়, মন্ত্রণালয়ের কাছে সরবরাহকারীদের পাওনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। সুতরাং সারের মজুদ বাড়াতে হলে এসব বকেয়া পরিশোধ করা অত্যন্ত জরুরি। কেননা নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি দরপত্রে অংশ নিয়ে আমদানিকারকরা বিশ্ববাজার থেকে সার আমদানি করেন আর বিক্রি করেন সরকার নির্ধারিত দামে। বাড়তি খরচ ভর্তুকি হিসেবে দেয় সরকার।

সারের মধ্যে দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় ইউরিয়া। আর দেশে এর উৎপাদনও হয় বেশি। গ্যাসের মাধ্যমে উৎপাদন করা যায় বলে অন্যান্য সারের তুলনায় ইউরিয়া উৎপাদনে বেশি সক্ষমতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থা বাংলাদেশ রাসায়নিক শিল্প করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীন বর্তমানে পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানা রয়েছে। তবে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ না হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। 

সার উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়া মোটাদাগে গ্যাসের অপর্যাপ্ত সংস্থান ও ডলার সংকটের সঙ্গে জড়িত। এমন পরিস্থিতিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে সার কারখানাগুলোর উৎপাদন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে বলে সম্প্রতি জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এক উপদেষ্টা। যদিও ওই উপদেষ্টা সময় সম্পর্কে কিছু জানাননি। তবে আমরা আশ্বস্ত হতে চাই, সারের উৎপাদন বাড়াতে নতুন সরকারের উদ্যোগের প্রতিফলন শিগগিরই দেখা যাবে। আমদানি সংকটে সারের মজুদ বাড়ানোর বিকল্প উপায় উৎপাদন বাড়ানো। এজন্য জ্বালানি তথা গ্যাস সরবরাহও ঠিক রাখা প্রয়োজন। রেশনিং করে চলে বা শিল্প-কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো গেলেও এ পরিস্থিতিতে দরকার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে নজর দেয়া। এ বিষয়েও সরকারের তৎপরতা কাম্য। একই সঙ্গে সারের দাম কমিয়ে আনতে কাজ করতে হবে।

বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় গত এপ্রিলে সারের দাম কেজিপ্রতি ৫ টাকা বাড়ানো হয়। আমদানিকারকদের অনেকেই মনে করেন, প্রতিযোগিতামূলক দামে সার আমদানি করতে পারলে দেশীয় বাজারে দাম কমানো সম্ভব।