বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম প্রধান অন্তরায় দীর্ঘস্থায়ী নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত, যা বেশ কয়েক বছর ধরে ৭ শতাংশের নিচে ঘুরপাক খাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার গড় কর-জিডিপি অনুপাত ১৮ শতাংশ। সে নিরিখে আমরা ধারেকাছেও নেই। এ প্রেক্ষাপটে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বৃদ্ধি ও করজাল সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একক প্রচেষ্টার পাশাপাশি মাঠ প্রশাসনের সক্ষমতাকে কাজে লাগানো জরুরি হয়ে পড়েছে।

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ৭ লাখ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে। বিপুল এ প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক কাঠামোকে সক্রিয় করার বিকল্প নেই। তবে এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক যন্ত্র কতটা প্রস্তুত এ নিয়ে এক নীতিগত বিতর্ক দেখা গেছে বণিক বার্তার প্রতিবেদনে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলা পর্যায়ে রাজস্ব দপ্তরের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, তত্ত্বাবধান ও পরিবীক্ষণের দায়িত্ব জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) ওপর ন্যস্ত। তবে কর আহরণের পরিধি কিংবা করজাল সম্প্রসারণে তাদের কার্যকর সম্পৃক্ততা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নেই। ডিসিরা কি এ বিষয়ে সত্যিই নির্লিপ্ত নাকি কাঠামোগত অস্পষ্টতা তাদের এ দায়িত্ব নিতে অনুৎসাহী করছে—এ প্রশ্নটির উত্তর অনুসন্ধান জরুরি।

বিদ্যমান আইনি কাঠামোতে এনবিআর এবং সংশ্লিষ্ট কর কমিশনাররাই কর নির্ধারণ, আহরণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ। ডিসিরা সরাসরি কর আদায় করতে পারেন না। তবে তাদের কর অনুবর্তিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হয়। এজন্য কর আদায় করতে না পারার কারণ দর্শিয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে গেলে ডিসিদের আমলাতান্ত্রিক দায়িত্ব ফাঁকির একটি প্যাটার্ন তৈরি হয়। ঐতিহাসিকভাবে জেলা প্রশাসনের উৎপত্তিই হয়েছিল রাজস্ব আহরণকে কেন্দ্র করে। জেলা প্রশাসক পদের ঐতিহাসিক বিবর্তন লক্ষ করলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়। ১৭৭২ সালে পদটির মূল পরিচয়ই ছিল ‘কালেক্টর’ বা রাজস্ব সংগ্রাহক। পরে ১৭৮৬ সালে ‘ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট’ হিসেবে আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্ব যুক্ত হয়; ১৯৬০ সালে আইয়ুব খানের আমলে উন্নয়নমূলক কাজের দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ডিসিদের দেয়া হয়। অর্থাৎ পদটির ইতিহাসজুড়েই রাজস্বের সঙ্গে তার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। বর্তমানে ‘জেলা প্রশাসক’ নামে পরিচিত পদটি সেই দীর্ঘ ইতিহাস বহন করলেও রাজস্বের প্রশ্নে তার ভূমিকা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা আইনের কারণে নয়, মানসিকতার কারণে।

জেলা পর্যায়ে রাজস্ব আদায়ের পরিধি না বাড়ার পেছনে প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা ও দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা অনেকাংশে দায়ী। চলতি অর্থবছর থেকে ৩৯ ধরনের সরকারি-বেসরকারি সেবা নেয়ার ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব সেবার সিংহভাগের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এ শর্তের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে কোনো সক্রিয় তদারকি কাঠামো নেই।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জেলার চার্টার অব ডিউটিজে ডিসিদের ৩৭ ধরনের দায়িত্ব পালন করতে হয়। এত দায়িত্ব থাকায় তাদের পক্ষে সরাসরি রাজস্ব আহরণের দায়িত্বের পুরোটা নেয়া কঠিন। তবে তাদের সক্রিয়তা রাজস্ব নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় প্রভাবক হতে পারে। জেলা রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ডিসিরা কর অনুবর্তিতা বাড়াতে স্থানীয় পর্যায়ে কর আদায়যোগ্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে পারে। এমনকি যেকোনো সেবা দেয়ার সময় কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ কঠোরভাবে যাচাই করার মাধ্যমে কর ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারেন। পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি আইনের আওতায় সার্টিফিকেট মামলার অফিসার হিসেবে ডিসিরা কর আহরণে প্রত্যক্ষ ভূমিকাও রাখতে পারেন। জেলা প্রশাসন কর আদায় না করেও এনফোর্সমেন্ট বা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধি করতে পারে। অনেক সরকারি ও বাণিজ্যিক সেবা নেয়ার ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন প্রদর্শনের আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও মাঠ পর্যায়ে এর যথাযথ যাচাই হয় না। জেলা প্রশাসন যদি তাদের রুটিন প্রশাসনিক সেবা দেয়ার সময় রিটার্ন দাখিলের বিষয়টি কঠোরভাবে নজরদারি করে, তবে আলাদা জনবল ছাড়াই করদাতার সংখ্যা বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। এজন্য প্রশাসনের প্রত্যেকটি অঙ্গের মধ্যে সমন্বয় এবং কাজের পরিধি বাড়ানোর উৎসাহ থাকা জরুরি।

জেলা প্রশাসক কেবল প্রশাসনিক যন্ত্রের একটি চাকা নন, তিনি সরকারের মাঠ পর্যায়ের প্রতিনিধি। জনপ্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে তার দায়িত্ব শুধু নির্দেশ পালন নয়, বরং রাষ্ট্রের রাজস্ব কাঠামো শক্তিশালী করার বৃহত্তর উদ্দেশ্যে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও বটে। কর আহরণ এ পদের সরাসরি দায়িত্ব নয় এ মানসিকতা সুশাসনের অন্তরায়। তবে এনবিআর ও জেলা প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে যদি তারা এ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হতে অনুৎসাহী হন তাহলে সরকারের তরফে একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। প্রতিটি জেলায় এনবিআর-জেলা প্রশাসন যৌথ টাস্কফোর্স গঠন, উভয় পক্ষের জন্য ন্যূনতম সমন্বয় কার্যক্রম নির্ধারণ এবং বার্ষিক প্রতিবেদনে এর অগ্রগতির বিবরণ অন্তর্ভুক্ত করার মতো পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে নির্দেশনা দেয়াই যথেষ্ট নয়; জবাবদিহির প্রক্রিয়া না থাকলে নির্দেশনা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়।

কর ফাঁকি রোধ এবং বৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে করের আওতায় আনা জেলার সার্বিক সুশাসন নিশ্চিতেরই অংশ। জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন লাইসেন্সিং ও নাগরিক সেবা প্রদানে কর-অনুবর্তিতা নিশ্চিত না করা প্রকারান্তরে সুশাসনের দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে। তবে এ স্থবিরতা এড়ানো সম্ভব। সেজন্য সরকারকে আয়কর ও কাস্টমস আইনের মূল কাঠামোর সঙ্গে সংগতি রেখে জেলা প্রশাসন কীভাবে এনবিআরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে, তার একটি সুস্পষ্ট আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা বা এসওপি তৈরি করতে হবে। প্রতিটি জেলায় কর কমিশনারের কার্যালয় এবং জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি যৌথ ‘রাজস্ব পরিবীক্ষণ সেল’ গঠন করা যেতে পারে। এটি প্রতি মাসে নতুন করদাতা শনাক্তকরণ এবং ফাঁকি রোধে কাজ করবে। জেলা প্রশাসকদের বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তিতে (এপিএ) জেলাভিত্তিক করজাল সম্প্রসারণ, রিটার্ন যাচাইয়ের হার এবং রাজস্ব দপ্তরগুলোকে প্রশাসনিক সহায়তাদানের বিষয়টি অন্যতম মূল্যায়ন সূচক বা কেপিআই হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাহলে তারা এ বিষয়ে অনাগ্রহী থাকতে পারবেন না। এনবিআরের ট্যাক্স ডেটাবেজের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের লাইসেন্সিং ও ভূমি রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থার রিয়েল-টাইম ডেটা ইন্টিগ্রেশন বা ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কর ফাঁকি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত করা যায়। রাজস্ব আদায়ের মূল দায়িত্ব এনবিআরের হলেও রাষ্ট্রীয় সম্পদের প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা কোনো একক বিভাগের দায়িত্ব হতে পারে না। জেলা প্রশাসকদের ঔপনিবেশিক ‘কালেক্টর’ রূপে ফিরিয়ে নেয়া বর্তমান অর্থনীতির লক্ষ্য নয়। তবে আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রে সুশাসন ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। আমলাতান্ত্রিক দেয়াল ভেঙে মাঠ ও রাজস্ব প্রশাসনের মধ্যে একটি কার্যকর এনফোর্সমেন্ট সমন্বয় গড়ে তোলা জরুরি।