ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সম্পন্ন হয়ে ফলাফলও জনসমক্ষে। দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে বিএনপি সরকার গঠনের দোরগোড়ায়। চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাবলীল, স্বতঃস্ফূর্ত, সহজীয় চৌকস, ইতিবাচক ও পারিবারিক স্টাইলের নিরবচ্ছিন্ন প্রচারণা প্রত্যাশিত বিজয়কে নিশ্চিত করে। তবে এ নির্বাচনের চমক জামায়াতে ইসলামীর ৬৮টি আসন জয়। একাত্তরের ভূমিকার সন্তোষজনক ভূমিকা ছাড়াই এবং বেশকিছু নেতিবাচকতা সত্ত্বেও মূলত দেশের দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা দেখিয়েছে দলটি। সংসদে বিরোধী দল হিসেবে শক্তিমান ও জনপ্রিয় ভূমিকা রেখে জামায়াত ভবিষ্যতেও ভালো করার সম্ভাবনা জিইয়ে রাখবে আশা করি। উল্লেখ্য, মোহাদ্দিস আব্দুল খালেক সাতক্ষীরা-২ আসনে নির্বাচনে দেশে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৬৬ হাজার ৯৫৯ ভোট পেয়েছেন।
এবারের ভোটে নারীদের আসন সংখ্যা সচরাচর ১৯/২০ থেকে ৭-এ নেমে এসেছে। অমুসলিম সদস্য সংখ্যা একেবারে নগণ্য—পাঁচ বা ছয়। গণভোটে মোট গৃহীত ভোটের ৬০ দশমিক ৮৪ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ সূচকে ভোট দিয়ে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদের গ্রহণযোগ্যতা গণভোটে কমবেশি শতকরা ৯৫ ভাগ ‘হ্যাঁ’ ভোট পেয়েছিলেন। গণভোট সম্পর্কিত বিষয়াদির কয়েকটিতে বিএনপির আপত্তি ছিল; এখন দুই-তৃতীয়াংশের শক্তিতে এসবের কাটছাঁট করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ফলাফলে জামায়াতের মহাসচিব মিয়া গোলাম পরওয়ার ও তাদের মনোনীত হিন্দুপ্রার্থী দক্ষিণী জোয়ারের মাঝে খুলনা জেলাতেই পরাজিত হন।
সাংবিধানিক, সংসদীয় ও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার
আশা করা যায় যে বৃহৎ ম্যান্ডেটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শক্ত হাতে জনকল্যাণমূলক সংস্কারে হাত দেবেন। এক হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রায়ণ রোধে ওয়ান ম্যান ওয়ান পজিশনের কথা ভেবে দেখতে পারেন। তবে সরকারপ্রধানের মেয়াদ সীমিতকরণ গণতন্ত্রসম্মত নয়।
তিনটি ক্ষেত্র তথা অনাস্থা ভোট, ফাইন্যান্স বিল এবং সাংবিধানিক সংশোধনী ছাড়া অন্যান্য বিষয় সংবিধানের ৭০ ধারার আওতামুক্ত রাখা যেতে পারে।
১৪৭(৪) ধারায় লাভজনক পদে যাওয়ার বিষয়ে যাদের ওপর নিষেধ রয়েছে তাদের উভয় কক্ষের সংসদ সদস্যদের নামও যোগ করা যেতে পারে।
দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রপতির নির্বাচকমণ্ডলী সম্প্রসারণ করা সমীচীন হবে। প্রাদেশিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের আগ পর্যন্ত সংসদ সদস্যদের সঙ্গে উচ্চকক্ষের সদস্যরা, ঢাকা মেট্রোপলিটন অথরিটির মুখ্যমন্ত্রী এবং পরিষদের সদস্যরা, নির্বাচিত জেলা কাউন্সিলের সদস্যরা এবং করপোরেশনগুলোর নির্বাচিত মেয়র ও কমিশনাররা অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।
প্রতিটি রাজনৈতিক দল সাধারণ নির্বাচনে প্রার্থী চয়নে স্থানীয় পর্যায়ের শাখার মনোনয়নকে প্রাধান্য দিতে পারে। মনোনয়নদানকারী পার্লামেন্টারি বোর্ডের সদস্যরা নির্বাচনের অযোগ্য বিবেচিত হতে পারেন। রাজনৈতিক দলের সব পর্যায়ের ইউনিটের কর্মকর্তা এবং সংসদে মনোনয়ন একটি সময় নির্ঘণ্টক অনুপাতে বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এর অন্যথা হলে নিবন্ধন বাতিলের বিধান রাখা উচিত হবে।
সংসদ সদস্য এবং উচ্চকক্ষের সদস্যের কাজের দক্ষতা আনার জন্য প্রত্যেককে সংসদীয় বিষয়াবলি, ইন্টারনেট, অর্থনীতি এবং ভূমি আইনে পারদর্শী সহকর্মী/উপদেষ্টা দেয়া সমীচীন হবে।
নির্বাচনী ব্যয়ের অংশবিশেষ সরকারি কোষাগার থেকে অনুদানের চিন্তার সময় এসেছে।
সিনিয়র ডেপুটি স্পিকার ও পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান বিরোধী দল থেকে নির্বাচন করা ভালো হবে। তাছাড়া অন্তত অর্ধেক সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান সরকারি দলের বাইরে থেকে নির্বাচন করার বিধান একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হবে। ব্রিটিশ নীতি অনুসরণ করে একাধিক আসনে বিজয়ীর ছেড়ে দেয়া আসনের উপনির্বাচনে তার দলকে ছাড় দেয়ার রেওয়াজ ভাবা যেতে পারে।
সংসদের ৩০০ আসন সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত করার রীতি চালু থাকবে। উচ্চকক্ষের ১০০ সদস্য সংসদে প্রত্যেক প্রার্থীর দলের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে চয়ন করা হবে। ত্রয়োদশ সংসদে বিএনপি ও জামায়াতের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত ও সংসদ সদস্যের সংখ্যা কাছাকাছি হওয়ায় এবার এতে কোনো সমস্যা নেই।
নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আলাদা করার কাজ সম্পূর্ণ করতে একটি স্বাধীন প্রসিকিউশন এজেন্সি স্থাপন করতে হবে।
কেয়ারটেকার গভর্ন্যান্স রাজনীতিবিদদের নিজের ওপর অনাস্থার সমান। আগামীর সরকার এ প্রশ্নবোধক ব্যবস্থার পরিবর্তে ৬০/৯০ দিন আগে সরকার ও সংসদকে রুটিন কাজে পরিণত করে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে পারে।
প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো
সুনিপুণ গণতন্ত্রে উত্তরণের একটি কার্যকর, দক্ষ, সৎ ও স্বচ্ছ প্রশাসন খুবই কঠিন হবে বটে। প্রতিশোধ নয় বরং সমঝোতার প্রয়োজন হবে। শুরুতে প্রধান বিচারপতি, হাইকোর্টের বিচারকরা এবং সব সাংবিধানিক পদের নিয়োগ রাষ্ট্রপতি দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে পরামর্শ করে।
প্রাদেশিক ব্যবস্থায় যেতে সময় লাগবে। তবে রাজধানীর জন্য সিটি গভর্নমেন্ট ঢাকা মেট্রোপলিটন অথরিটি সৃষ্টি করা হলে কার্যকর সমন্বয়, ওয়ান স্টপ ইউলিটি সার্ভিস এবং অপচয়হীন ব্যবস্থাপনা আসবে। সাভার, নরসিংদী, কেরানীগঞ্জ ও গাজীপুরে উপশহর গড়ে তিন বছরের মধ্যে কমিউটার সার্ভিস চালু করা যেতে পারে। অফিসে ফ্লেক্সি আওয়ার, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে অঞ্চলভিত্তিক ভর্তি, স্কুল ইউনিফর্ম ও দুপুরের খাবার দিলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সুবিধা হবে।
চাকরিতে নিয়োগ মেধাভিত্তিক হোক। একটি প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠন করা যায়। আন্তঃক্যাডার রেষারেষি বন্ধ করতে যুগ্ম সচিব পর্যায়ে সিনিয়র সার্ভিস পুল সৃষ্টি করা যায়। প্রেষণ প্রথা বন্ধ হোক। সমান কাজে সমতুল্য বেতন ভাতা চালু করতে হবে। নিয়োগ, পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি এবং পুরস্কার/তিরস্কারে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা দৃঢ়হস্তে বাস্তবায়ন করা উচিত।
সামাজিক অগ্রসরতা
বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে অবক্ষয় রোধ করতে উপায় সন্ধান জরুরি। মেধার বিকাশ, দেশপ্রেম, মানবিকতা ও আধুনিক বিজ্ঞানমনস্কতা সম্পন্ন একটি শক্তিমান শিক্ষা ব্যবস্থা সুপারিশের জন্য একটি কমিশন গঠন করা যায়। পঠন-পাঠনে এবং অংশগ্রহণমূলক শিক্ষায় অগ্রগতি মানসে পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও সামাজিক মূল্যবোধের পুনরাগমন প্রয়োজন। কোঅপ শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় এবং করপোরেট জগতের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের হাতেকলমে পর্যায়ক্রমিক যাতায়াত করানো যায়; যুক্তরাষ্ট্রে এ ব্যবস্থা খুবই কার্যকর। শীতকালীন সেমিস্টারে উচ্চশিক্ষার বিদ্যার্থীদের বাধ্যতামূলকভাবে গ্রামবাংলায় কৃষক পরিবারে সংযুক্ত করা হলে তারা স্থানীয় সম্পদ ম্যাপিং, কৃষিকাজ, পরিকল্পিত পরিবার, মাছ ধরা, সামাজিক বনায়ন, টিকা প্রদান ও চরিত্রবিধ্বংসী সামাজিক অপরাধগুলোতে প্রতিরোধ গড়ে তোলা ইত্যাদি কাজে পারদর্শিতা অর্জন করবেন। হবেন ভবিষ্যতের বাস্তবধর্মী প্রশাসনিক কর্মী।
সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা শুধু মুখের কথা যেন না হয়। এ খাতের করুণ দশা দূর করতে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও দৃঢ়হস্ত দক্ষ ও স্বচ্ছ বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। বৈষম্য, বিশেষ করে সুযোগের বেশকম দূর করতে সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ও মান বাড়িয়ে তা গ্রামবাংলায় আরো বিস্তার করানো জরুরি। আফটার কেয়ারের দুর্বলতার স্থায়ী সমাধানে নার্সের সংখ্যা ও তাদের সেবার মানসিকতা বাড়াতে উদ্যোগ নেয়া জরুরি। সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশের মনোরম প্রাকৃতিকতায় স্বাস্থ্যসেবার মান বিশ্বমানে উন্নীত করে আঞ্চলিক দাবি মেটানোর কথাও ভাবা যেতে পারে। সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের বরাদ্দ পেনশন থেকে আলাদা করে অন্তত মূল্যস্ফীতির হারে বাড়ানো যেতে পারে।
নগরায়ণের পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা
সিটি গভর্নমেন্ট ও উপশহর ব্যবস্থাধীনে রাস্তার পাশের হকারদের স্থানান্তরে সময় লাগবে। তবে খাল, নালা ও অন্যান্য জলাশয় উচ্ছেদে কালবিলম্ব কাম্য নয়। ১৫ বছরের পুরনো পাবলিক পরিবহনের ওপর দ্বিগুণ হারে রোড ট্যাক্স ধার্য করা হলে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় হবে। অথবা তাদের প্রত্যাহার করা হবে। তবে বৃহদাকার আধুনিক সুবিধাসম্মত সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা ব্যক্তিগত যানে চলাচলের প্রয়োজন কমিয়ে দেবে। এক্ষেত্রে ফিসক্যাল সুবিধা দেয়া যেতে পারে। রিকশা ও সিএনজিতে, বিশেষ করে ব্যাটারিশক্তি চালন নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে। দূরপাল্লার ছোট যানবাহনে কড়াকড়ি কাম্য।
গৃহস্থালি কাজকর্ম সামষ্টিক আয়ে অন্তর্ভুক্ত করার উপায় সন্ধান করা যেতে পারে। গত দেড় বছরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ কমে গেছে—এ ধারা বদলাতে হবে। ‘যদি, তবে’র আড়ালে ১৮ বছরের কন্যাসন্তানকে ১৬ বছরে বিয়ে দেয়ার ফাঁকফোকর বন্ধ করতে হবে। কর্মজীবী মহিলাদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার খুলতে হবে বেশি বেশি করে। খাদ্য বিতরণ এরই মধ্যে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের কর্মজীবনে প্রবেশ করতে সাহায্য করছে।
কিচেন গার্ডেনিং, ছাদের মধ্যে সবজি ও ফল বাগান, সৌরশক্তির ব্যাপক ব্যবহার (তবে ইডকলের সেবার মান বাড়াতে হবে এবং দীর্ঘসূত্রতা কমাতে হবে) এবং সবুজায়নে দেশের মনোরম পরিবেশ পর্যটক আহরণেও সহায়তা করবে।
বাজারধর্মী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নিয়ামক কাঠামো
২০২৪-এর নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ ছিল। আর এর সর্বনিম্ন হার ছিল ৮ দশমিক ১৭ গত অক্টোবরে। বর্তমানে এটি ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ এবং নিম্নবিত্তের বিশাল মাথাব্যথা। সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব এবং তা বাজারের ধর্মেই করতে হবে। ভালো ফসল, শস্য আহরণে সফলতা, সর্বোচ্চ খাদ্য মজুদ এবং শহর ও গ্রামের বিভিন্ন ফল ও সবজির দামের তারতম্য, ওপেন মার্কেট অপারেশনস বাড়ানোর মাধ্যমে বাজারদরে লাগাম টানা যেতে পারে। তাছাড়া গ্রামবাংলায় উৎপাদন ও বিপণন সমিতি গড়ে তোলার দীর্ঘদিনের দাবি নিরীক্ষা করা উচিত।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সামষ্টিক আয় বৃদ্ধি হয় ২ দশমিক ৮ শতাংশ, ২০২৫-২৬ বছরের প্রথম প্রান্তিকে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশে। আইএমএফের ভবিষ্যদ্বাণীতে আগামী পাঁচ বছরে বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি শতকরা ৫ হবে, একে মিথ্যা প্রমাণিত করে সামষ্টিক অর্থনীতি, নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের অগ্রাধিকারে যথেষ্ট বৃদ্ধি করতে হবে। নইলে ২০৩২ সালে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে উঠবে না। সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতির সম্প্রসারণে শিল্পায়ন মডেল গ্রহণ করা প্রয়োজন হবে। কৃষি বা প্রাথমিক খাতে এবং সেবা খাতের পরিধি কমে শিল্প খাতের পরিধি বাড়ছে বটে; তবে এর গতি বাড়াতে হবে। বৃহৎ ও মাঝারি শিল্প নিজ শক্তিতেই বাড়বে, যদি সরকারি নীতি সহায়তা অনুকূল, সর্বজনীন ও ধারাবাহিক হয়। তবে বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে বৈষম্য বৃদ্ধি, দারিদ্র্যসীমার নিচে আরো অধিক মানুষের নেমে যাওয়া (২৭ লাখ সিপিডির হিসেবে) এবং বিনিয়োগ খরায় বেকারত্ব বিশেষ করে ছদ্মবেশী বেকারত্ব থামাতে হলে কুটির, ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র উদ্যোগ বাড়াতে আরো উদ্যোগ জরুরি। একটি ফোক্যাল পয়েন্ট—পিকেএসএফের ভিন্ন একটি উইং, এসএমই ফাউন্ডেশন অথবা ক্ষমতায়িত বিসিককে কেন্দ্র করে ৪০ লাখ কুটির, ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ও সুলভ মূল্যে আর্থিক সহায়তা এবং বাজারজাতে সহায়তা দিলে দারিদ্র্য ও কর্মহীনতা দূরে অগ্রগতি হবে। বাড়বে কৃষিজাত শিল্প ও হস্তশিল্প এবং পাটজাত শিল্পের ব্যাপক প্রসার তথা সামষ্টিক আয় বৃদ্ধির পালে জোরদার হাওয়া লাগা। একটি বড় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল গঠন করে উদ্যোক্তা সহায়তা মুদারাবা নীতি গ্রহণ করা যায়।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আইএমএফের ব্যবহারযোগ্য হিসেবে এখন ২ হাজার ৯৪৭ কোটি ডলার। রেমিট্যান্স আসছে মাসে ৩০০ কোটি ডলার। আমদানি বাড়ছে তবে মূলধনি যন্ত্রপাতিতে কিছুটা ভাটা চিন্তার কারণ। বছরে ৪০০ কোটি ডলারের মতো রফতানি যথেষ্ট বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই। এদিকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি সর্বকালের নিম্ন ৬ দশমিক ১ শতাংশে। খেলাপি ঋণ সাড়ে ১৮ লাখ কোটি টাকা বিতরণ করা ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের দৃঢ়হস্ত এবং ধারাবাহিক নীতি কৌশল যা সব উদ্যোগকে সমানভাবে উপকৃত করবে (কিছু মুখচেনা শিল্পপতি ব্যবসায়ীকে নয়), তা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অপারেশনাল অটোনমি বাড়ানো হোক—প্রতিষ্ঠানটির বিশাল গুরুত্ব বিবেচনায় এটিকে সাংবিধানিক পর্যায়ে উন্নীত করা যেতে পারে। ব্যক্তি খাতের কার্টেল ভাঙা সম্ভব এবং উচিত। অর্থনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার ব্যাংকিং নীতির অবসান ও সংস্কার জরুরি। গভর্নর পদ আরো উঁচু পর্যায়ে ছয় বছর এক মেয়াদি করা যেতে পারে।
তবে সামগ্রিকভাবে আর্থসামাজিক অগ্রগতিকে দ্রুত এবং আয়, সম্পদ ও সুযোগ বৈষম্য রোধের হাতিয়ার হিসেবে একটি নিয়ামক পরিমণ্ডল সৃষ্টি করতে হবে। বাস্তবায়ন নিশ্চিতে ও অপচয় রোধে যুক্তরাষ্ট্রের আদলে একটি অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদ প্রধানমন্ত্রীকে সাহায্য করতে পারবে। ব্যয়বহুল হলেও ভৌত অবকাঠামো দৃষ্টিনন্দনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। এখন সামাজিক ও মানবসম্পদ এবং ন্যায্য প্রশাসন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। অবশ্যই দারিদ্র্য নিরসন, পরিবেশ উন্নয়ন এবং জলবায়ুর পরিবর্তন সমস্যা সমাধানিক প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণকে মঞ্জুরিতে রূপান্তর করার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। বিপুলভাবে বৃদ্ধি পাওয়া বৈদেশিক ঋণ এবং তার দায়দেনা মেটানোর আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি রোধকল্পে দাতা/সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৃহদাকার ঋণের পুনঃতফসিল আলোচনা করতে হবে।
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি সামলাতে আরো বেশি ভৌত অবকাঠামো, আর্থসামাজিক ব্যবস্থাপনা ও আইন-সালিশে সম্প্রসারণ এবং মানবসম্পদের উৎকর্ষ বিধান জরুরি। ১৫-৩০ বছর পর্যন্ত বয়সী ছয় কোটি যুবক ও যুব মহিলাকে বৃত্তিমূলক শিক্ষায় পারদর্শী করে ডেমেগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সর্বাধিক সুবিধা নগদায়ন করা যাবে। কয়েক লাখ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে সরকারি খরচে কম্পিউটার ও ভাষা শেখালে দেশ-বিদেশে তাদের কর্মসংস্থান হবে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড ইনস্টিটিউটকে বিশ্বমানে উন্নীত করা হলে মানবসম্পদ সেবা রফতানি মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে। উন্নত বিএসসটিআইয়ের প্রত্যয়নপত্র গ্রহণযোগ্য করা হলে অর্থ ও সময় অপচয়কারী পুনর্নিরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা ফুরাবে।
বৃহদাকার অর্থনীতির প্রয়োজন এবং আঞ্চলিক আকাশ পরিবহনের হাব হিসেবে গাজীপুর, টাঙ্গাইল অথবা অন্য কোনো সীমান্ত ছাড়া উচ্চস্থানে অনেক বড় একটি নতুন বিমানবন্দর গড়া জরুরি। রেলপথ ও জলপথ ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন করতে হবে।
একটি এনার্জি মহাপরিকল্পনা তৈরিতে হাত দিতে হবে। রংপুর-দিনাজপুরের বিশাল উন্নতমানের পিট কয়লাকে খনির মুখে বিদ্যুতে রূপান্তরিত করার জাতীয় ঐকমত্য আনার চেষ্টা সফল হলে ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা সম্ভব। সুনীল অর্থনীতির বিকাশে উদ্ভাবনী উদ্যোগ জরুরি। গ্যাস উন্নয়নে অর্ধশতকের অবহেলা দূর হোক। ভারত ও মিয়ানমারের মতো আমাদের সমুদ্রতলের গ্যাস আহরণের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সাগরতলে প্রচুর মণিমানিক্যের সমাহার রয়েছে; একে আহরণের বিশেষজ্ঞ উদ্যোগ নিতে হবে।
উৎপাদন ও রফতানি বৈচিত্র্যকরণের সময়টুকুতে তৈরি পোশাকের ধরন ও বাজারের বহুমুখী নতুনত্ব আনা যেতে পারে। এক্ষেত্রে বিপণনের সুবিধার্থে বৈদেশিক বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে।
অর্থনৈতিক কূটনীতি
অষ্টম বৃহৎ জনসংখ্যার বাংলাদেশ এখন ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্ববহ। দেশের উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে আমাদের কূটনীতিকদের সম্যক পরিচিতি প্রয়োজন। তাদের জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হতে পারে বিদেশে বাংলাদেশের সুনামকে পরিচিত করা এবং পণ্য ও সেবার বহরকে বাজারজাত করা। পৃথিবীর অনেক দেশের মতো আমাদের বিদেশে কর্মরতদের পালাক্রমে দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করার নীতি সুপারিশ করছি। ‘সবার সঙ্গে সখ্য, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতিতে আমাদের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারলে আমাদের দূতরা দেশের অর্থনীতির উদ্বৃত্ত অংশকে রফতানিতে রূপান্তর করতে আরো সফল হবেন। তারা বাজার অন্বেষণ করবেন। আর বাংলাদেশের প্রবাসীদের সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা ও কনসুলার সেবায় সহৃদয় দ্রুতগতি ব্যবস্থা নেবেন।
পরিশেষে বিশেষ ও বিশাল ম্যান্ডেট পাওয়া নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে বিশ্বের সব বড় শক্তিমান দেশের সহযোগিতা ও শুভেচ্ছার আশ্বাস পেয়েছেন। কাউকে পেছনে না ফেলে অথবা কাউকে বাদ না দিয়ে সর্বজনীন, শক্তিমান একটি উদার গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, অন্তর্ভুক্তিমূলক, আয়-সম্পদ-সুযোগ বৈষম্য দূরকারী শক্তিশালী নতুন বন্দোবস্ত তথা কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে সফলতা লাভ করুক নতুন নেতৃত্বে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ।
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর









