বিগত আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বেশ কয়েকটি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে, যা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কখনো বিগত সরকারের কর্মী-সমর্থক সন্দেহে, কখনো-বা ধর্ম অবমাননার অভিযোগে আবার কখনো চুরির সন্দেহে এসব গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এতে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। দেশে গণপিটুনির সাধারণত বিচার হতে দেখা যায় না। অপরাধীরা নির্ভয়ে ঘোরাফেরা করে। ফলে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে গণপিটুনির ঘটনা কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। আবার পুলিশ প্রথম দিকে তৎপর থাকলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসার পর গাছাড়া ভাব দেখায়। গণপিটুনির ঘটনাটি শুধু আক্রান্ত ব্যক্তি বা প্রাণ হারানো ব্যক্তির স্বজন ও পরিবারের দীর্ঘশ্বাস হয়ে টিকে থাকে। বস্তুত বিচারহীনতার কারণে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া ক্রমেই স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হচ্ছে দেশে। ক্রমবর্ধমান গণপিটুনি, প্রকাশ্যে পেটানো, পিটিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখার মতো ঘটনাগুলো মানুষের মানবিক গুণাবলি, পরমত ও ধর্মবিশ্বাসের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং আইনের প্রতি আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশ। দেশে বর্তমান সময়ে গণপিটুনির পাশাপাশি প্রকাশ্যে নির্যাতন, পিটিয়ে হত্যার ঘটনা আর এসব ঘটনায় আমজনতার অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধহীনতা তথা নিষ্ক্রিয়তাও দৃশ্যমান। এ অবস্থার জন্য বিচারহীনতার সংস্কৃতি, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, মতপ্রকাশে বাধা ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতার অভাবই দায়ী। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আইনের শাসন ও মানবাধিকারের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা জরুরি।
গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে চোর সন্দেহে এক ব্যক্তিকে গণপিটুনি এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদককে গণপিটুনির ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গণপিটুনিতে দুজনকেই হত্যা করা হয়। এর আগে ৭ সেপ্টেম্বর রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা গণপিটুনিতে নিহত হন। এর বাইরে দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক গণপিটুনির ঘটনায় হতাহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বেশির ভাগ ঘটনায় মামলা দায়ের হলেও আলোচনায় না এলে পুলিশের তেমন তৎপরতা থাকে না। সেই মামলার তদন্ত বিচার ঝুলে থাকে বছরের পর বছর। যেমন ২০১৯ সালের ২০ জুলাই সকালে বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে এক নারীকে গণপিটুনি দেয়ার ঘটনা বেশ আলোচিত হলেও এখন পর্যন্ত ওই হত্যা মামলার নিষ্পত্তি হয়নি।
নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য নির্দিষ্ট সাজা আছে। কেউ অপরাধ করলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় তুলে দিতে হবে। পিটিয়ে মেরে ফেলার বিধান নেই। এমনকি গণপিটুনিতে কোনো ব্যক্তি নিহত হলে দণ্ডবিধির ৩৪ ধারা অনুযায়ী গণপিটুনিতে অংশ নেয়া সব ব্যক্তি সমানভাবে দায়ী হবে। কেননা আইনে যৌথ দায়িত্বশীলতা নীতি আছে। সেখানে বলা হয়েছে, একই অভিপ্রায় নিয়ে একাধিক ব্যক্তি কোনো অপরাধ সংঘটন করলে, তাহলে প্রত্যেক ব্যক্তি এমনভাবে দায়ী হবেন যেন তিনি নিজেই অপরাধটি করেছেন। এর অর্থ, গণপিটুনিতে যারাই অংশ নেবেন সেটা আদালতে প্রমাণ করা গেলে সবারই শাস্তি নিশ্চিত করার সুযোগ আছে। এক্ষেত্রে কেউ বড় ধরনের জখম করলেও যে শাস্তি পাবেন, একজন সামান্য ধাক্কা দিলেও একই শাস্তির আওতাভুক্ত হবেন। এছাড়া গণপিটুনিতে যদি কেউ মারা যায় আর সেটা যদি খুন হিসেবে আদালতে প্রমাণ করা যায় তাহলে দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ২৯৯ ধারায় উল্লিখিত খুনের অপরাধে অপরাধীকে ৩০২ ধারার অধীনে মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং জরিমানার দণ্ডে দণ্ডিত করা যায়। সে হিসেবে আদালতে গণপিটুনিতে হত্যা প্রমাণিত হলে আইনানুযায়ী সবারই ন্যূনতম দণ্ড হবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এছাড়া আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী গণপিটুনি মানবাধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা-১৯৪৮ এর তিন নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে—প্রত্যেকের জীবন, স্বাধীনতা ও ব্যক্তি নিরাপত্তার অধিকার আছে। অর্থাৎ একজন মানুষ সুস্থ স্বাভাবিকভাবে তার জীবনযাপনের অধিকার রাখেন।
মানবাধিকার কর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণপিটুনির ঘটনায় যথাযথ আইন প্রয়োগ না হওয়ায় এ অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। পাশাপাশি এসব ঘটনা দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভঙ্গুর চিত্রকে তুলে ধরে। দেশে একটা অস্থিরতা চলছে। এটার সুযোগ নিয়ে অনেকে ব্যক্তিস্বার্থ ও রাজনৈতিক ফায়দা আদায় করছে। পূর্বশত্রুতার জেরেও এসব হত্যাকাণ্ড চলছে। তবে এসব ঘটনার প্রকৃত তদন্ত হওয়ার পাশাপাশি অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা উচিত। পাশাপাশি অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
গণপিটুনির ঘটনার কোনো বিচার হয় না। ফলে গণপিটুনিতে হত্যা থামছে না। আর এ ধরনের মামলায় শত শত আসামি হওয়ায় পুলিশও কোনো দায়িত্ব নেয় না। এখানে সরকারের কোনো স্বার্থ না থাকায় পুলিশের তৎপরতাও নেই। সেটা থাকলে পুলিশ শত শত মানুষকে গ্রেফতার করত। গণপিটুনি কয়েক কারণে ঘটে। প্রথমত, মানুষ যখন বিচার পায় না, অপরাধের প্রতিকার পায় না তখন আইন হাতে তুলে নেয়। এরপর গোষ্ঠীগত স্বার্থে গুজব বা অপপ্রচারের মাধ্যমে গণপিটুনি হয়। আর কিছু লোক ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য গণপিটুনিকে ব্যবহার করে।
গণপিটুনিতে হত্যা থামাতে হলে তিনটি বিষয় দরকার—মানুষ যেন অপরাধের বিচার পায়। অপরাধী যাতে পার পেয়ে না যায়। তাহলে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেবে না। আবার গণপিটুনিতে হত্যার মতো অপরাধ হলে তারও যেন বিচার হয়। এর বাইরে গুজব, অপপ্রচার এটা বন্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া গণপিটুনি বন্ধে মানুষকে সচেতন ও মানবিক করে তুলতে হবে। আর যেকোনো অপরাধের সময় পুলিশকে ঠিক সময়ে সক্রিয় হতে হবে। মানুষকে মানবিক, ধর্মীয় সহনশীল, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করতে পরিবার ও সমাজের পাশাপাশি রাষ্ট্রকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।










