দেশজ খনিজ সম্পদের মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাস জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রাকৃতিক গ্যাসের বহুমুখী ব্যবহার কারিগরিভাবে স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত। এতে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস পায়। দেশের ক্রমবর্ধমান এলপিজির (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) চাহিদা পূরণে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) আওতায় সিলেটের কৈলাসটিলায় এলপিজি প্লান্ট স্থাপিত হয়।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, বর্তমানে কৈলাসটিলা এলপিজি প্লান্টের উৎপাদন তিন বছরের বেশি সময় বন্ধ। এতে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা আয়বঞ্চিত হয়েছে পেট্রোবাংলার অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আরপিজিসিএল। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধ থাকা প্লান্টটি কবে পুনরায় চালু হবে তা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বলতে পারছেন না।
কৈলাসটিলা গ্যাস ফিল্ডের খনি সিলেটের গোলাপগঞ্জের দাড়িপাতনে অবস্থিত। সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের এ খনি থেকে উত্তোলিত মূল্যবান এনজিএল (ন্যাচারাল গ্যাস লিকুইড) কাজে লাগাতে ১৯৯৮ সালে প্লান্ট স্থাপন করে আরপিজিসিএল। গ্যাস খনির পাশে গোলাপগঞ্জ উপজেলা সদরের টিকরবাড়ী এলাকায় এর অবস্থান; যেটি জ্বালানি তেল, পেট্রল, ডিজেল ও এলপিজি উৎপাদনকারী কৈলাসটিলা এলপিজি প্লান্ট নামে পরিচিত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নির্দিষ্ট মানের বাইরে পেট্রল না কেনার ঘোষণা দেয়ায় আরপিজিসিএল বিপাকে পড়ে। এতে কৈলাসটিলা এলপিজি প্লান্টের উৎপাদন ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে বন্ধ হয়ে যায়। প্লান্টটির উৎপাদন থেকে কোম্পানিটির বার্ষিক আয় ছিল ৪০-৪৫ কোটি টাকা। তিন বছর ধরে জ্বালানি উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্রায় ১৫০ কোটি টাকার মতো আয়বঞ্চিত হচ্ছে আরপিজিসিএল।
এছাড়া সিলেট গ্যাস ফিল্ড সূত্র থেকে জানা যায়, আরপিজিসিএলের উৎপাদিত এলপিজির ওপর নির্ভর করেই এলপিজি বটলিং কারখানা স্থাপন করা হয়। আরপিজিসিএল প্লান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেটির উৎপাদনও এখন বন্ধ। অন্যদিকে এনজিএল সংরক্ষণে কোনো ব্যবস্থা না থাকায় এটি সরাসরি প্রক্রিয়াকরণ প্লান্টে পাঠাতে হয়, না হলে পুড়িয়ে ফেলতে হয়। এর আগে কৈলাসটিলা এমএসটিই গ্যাস ফিল্ড খনি থেকে উত্তোলিত ৫৭ হাজার লিটার এনজিএল প্রতিদিন সরাসরি আরপিজিসিএল প্লান্টকে দেয়া হতো। প্রতিষ্ঠানটি এতদিন ওই এনজিএল থেকে পেট্রল, ডিজেল ও এলপিজি উৎপাদন করেছে। বর্তমানে আরপিজিসিএল প্লান্ট বন্ধ থাকায় উত্তোলিত এনজিএল পুড়িয়ে ধ্বংস করতে হচ্ছে। প্রতি মাসে ৬ কোটি টাকার এনজিএল পোড়াতে হচ্ছে।
অন্যদিকে এলপিজি বটলিং (সিলিন্ডার গ্যাস) কারখানা থেকে স্থানীয়ভাবে এলপিজি সরবরাহ করা হতো। কারখানাটি বন্ধ থাকায় স্থানীয়রা সেই সুযোগ থেকে এখন বঞ্চিত। দীর্ঘদিন ধরে আরপিজিসিএল প্লান্টটি পুনরায় চালুর দাবি জানানো হচ্ছে। এরই মধ্যে ২০২১ সালে প্লান্টের প্রয়োজনীয়তা, স্থানীয় জীবন-জীবিকায় গুরুত্ব, প্লান্ট বন্ধের ফলে স্থানীয়দের ভোগান্তি এবং এনজিএল ধ্বংসের বিষয় তুলে ধরে দ্রুত প্লান্টটি চালুর ব্যাপারে বিপিসিকে অনুরোধ করা হয়। এরপর ২০২২ সালে প্লান্ট চালুর উদ্যোগ নেয়া হলেও এর কোনো বাস্তবায়ন হয়নি। চলতি বছরের জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে প্লান্টটি চালুর ব্যাপারে সম্ভাবনা যাচাই হয়। বিভিন্ন যন্ত্রপাতি মেরামত, পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের পাশাপাশি মরিচা ধরা যন্ত্রাংশও সরিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু প্লান্ট চালুর উদ্যোগ এখনো যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়েই রয়েছে।
এ গ্যাস ফিল্ড, আরপিজিসিএল প্লান্ট ও এলপিজি বটলিং কারখানা বন্ধ করে দেয়ার ষড়যন্ত্র চলছে বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা। প্রভাবশালী একটি মহল পরিকল্পিতভাবে সরকারি এ প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ করে রেখেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বারবার চালুর উদ্যোগ নিলেও রহস্যজনক কারণে তা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায় এমনটিই দৃশ্যমান হচ্ছে। বস্তুত কৈলাসটিলা এলপিজি প্লান্ট রাষ্ট্রীয় সম্পদ। তাই একে রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। তাছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও এ রকম একটি প্লান্টের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাই রাষ্ট্রীয় স্বার্থেই কৈলাসটিলা এলপিজি প্লান্টটি সচল রাখা প্রয়োজন। এজন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক, আমরা সে প্রত্যাশাই করি।
এরই মধ্যে বহুদিন বন্ধ থাকায় প্লান্টটির বহু যন্ত্র নষ্ট হয়ে গেছে। আরো সময়ক্ষেপণ করলে লোকসানের মাত্রা বাড়বে। তাই লাভজনক এ প্লান্টের যথাযথ তত্ত্বাবধান প্রয়োজন। বিদ্যমান ত্রুটিগুলো শনাক্ত করে তা নিরসনে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়া উচিত। আমরা প্রত্যাশা করব, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা গ্রহণ করবে। এজন্য এর আগে যে আশ্বাস দেয়া হয়েছে, তার বাস্তবায়ন কাম্য। এভাবে একটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ অবহেলার মুখোমুখি হয়ে ধ্বংসের মুখে ধাবিত হচ্ছে, এটি মেনে নেয়া যায় না। প্লান্টটি পুনরায় চালু হলে স্থানীয়দের পাশাপাশি রাষ্ট্রও উপকৃত হবে। আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা স্থিতিশীল হবে এবং আমদানিনির্ভরতা কমবে। তাই গুরুত্ব বিবেচনায় সিলেটের গোলাপগঞ্জের কৈলাসটিলা এলপিজি প্লান্ট সচল রাখার উদ্যোগ প্রয়োজন।










