সড়ক দুর্ঘটনা বর্তমানে নিত্যদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ট্রাফিক আইন না মানা, ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো—এসব অনিয়ম অহরহ ঘটছে। পাশাপাশি চালকদের চোখের সমস্যার বিষয়টিও সামনে উঠে এসেছে, যা সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম নিয়ামক হিসেবে গণ্য হয়। অসচেতনতা ও চোখে সমস্যার কথা জানলে চাকরি চলে যেতে পারে এমন আশঙ্কায় চালকরা বিষয়টি লুকিয়ে রাখেন। এছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে চোখের সুস্থতার শর্ত থাকলেও এটিকে গুরুত্ব দেয়া হয় না, এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, ঢাকাসহ সারা দেশে বাস টার্মিনাল ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ১১ অক্টোবর শুরু হয়েছে যানবাহনচালকদের চোখ ও রক্তচাপ পরীক্ষা। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এ সময় ২৮৯ পেশাদার চালকের চোখ পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় ১৬৪ চালকের গুরুতর সমস্যা পাওয়া যায়। অন্যান্য চোখের সমস্যা পাওয়া যায় আরো ৫৯ চালকের। আর চোখের কন্টাক্ট সমস্যা পাওয়া যায় আটজনের।
এতে বোঝা যাচ্ছে, রাজধানীর গাড়িচালকরা ব্যাপকভাবে চোখের সমস্যায় ভুগছেন। ফলে সড়কে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটছে। এমনকি এ সমস্যা বেশ আগেই শনাক্ত হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ২০১৯ সালে এক জরিপে জানা যায়, গণপরিবহনের প্রায় ৭০ শতাংশ চালক দৃষ্টি সমস্যায় ভুগছেন। অনেকের চোখে ছানি থাকার পরও গাড়ি চালাচ্ছেন। চালকদের দৃষ্টি সমস্যার কারণে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। এদিকে নিয়ম থাকলেও গণপরিবহনের চালকদের চোখের পরীক্ষা ছাড়াই ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টরা নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছেন না। শুধু গাড়ি চালানোর ব্যবহারিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে। আর টাকার ওপর নির্ভর করে লাইসেন্স নবায়নের বিষয়টি নিষ্পত্তির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অথচ চোখের পরীক্ষা ছাড়া নতুন লাইসেন্স দেয়া ও পুরনো লাইসেন্স নবায়ন করার নিয়ম নেই। এমনকি শিক্ষানবিশ লাইসেন্সের জন্য যখন আবেদন করা হয় তখনই চোখের পরীক্ষা করা হয়। চোখের পরীক্ষার জন্য বিআরটিএ কার্যালয়ে একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া আছে। তিনি চোখ পরীক্ষা করে সনদ দেন। আবার পেশাদার চালকরা যখন ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন করার জন্য আসেন তখনো তাদের চোখের পরীক্ষা নেয়া হয়। বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে বিআরটিএ দাবি করলেও বাস্তবে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, চালকদের চোখের সমস্যার ব্যাপারে বিআরটিএর দৃশ্যমান ভূমিকা নেই। লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের সময় বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা রহস্যজনক কারণে বিষয়টি এড়িয়ে যান। পরীক্ষা ছাড়াই চোখ ও শারীরিক সুস্থতার সনদের বিষয়টি ঘুসের মাধ্যমে মীমাংসা করা হয়। কর্মকর্তারা চোখ পরীক্ষার সনদ অনেক সময় দেখেন না। এমনকি সনদ সংগ্রহ করে দেয়ার জন্য বিআরটিএ অফিসে দালালের খোঁজ পাওয়া যায়। কিছু অতিরিক্ত টাকা খরচ করে তা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
সড়ক দুর্ঘটনার জন্য অন্যান্য কারণ বিবেচনা করা হলেও চালকদের শারীরিক অসুস্থতার বিষয়কে কখনই গুরুত্ব দেয়া হয়নি। বিশেষ করে চালকদের চোখের সমস্যা সব সময়ই উপেক্ষিত থেকেছে। যে কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে।
মানবিক সাহায্য সংস্থা নামের একটি বেসরকারি সংগঠন চালকদের চোখের সমস্যা নিয়ে জরিপ চালায়। জরিপে দেখা গেছে, দেশের গণপরিবহনের ৭০ দশমিক ৪ শতাংশ চালক দৃষ্টিশক্তি সমস্যায় ভুগছেন। ৭৩ দশমিক ৩ শতাংশ চালকের উভয় চোখে সমস্যা রয়েছে। ১২ দশমিক ২২ শতাংশ ডান চোখে ও ১৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ চালক বাম চোখের সমস্যায় ভুগছেন। এ সময় দেখা যায়, অনেক চালকের চোখ থেকে দীর্ঘদিন ধরে পানি ঝরছে। চোখ চুলকায়, ময়লা জমে, গাড়ি চালানোর সময় পাশের সাইনবোর্ডের লেখা দেখতে পান না। আবার চোখে ঝাপসা দেখার কারণে সড়ক নির্দেশিকাও দেখা সম্ভব হয় না। চোখে সমস্যা আছে বোঝার পরও অনেক চালক চিকিৎসকের কাছে যান না। কারণ চোখের সমস্যার বিষয়টি জানাজানি হলে লাইসেন্স নিয়ে ঝামেলার আশঙ্কা রয়েছে। আবার অন্য চালকদের মাধ্যমে মালিকের কাছে তথ্য গেলে দুর্ঘটনার ভয়ে মালিক গাড়ি চালাতে দেবেন না। এমন দুশ্চিন্তাও অনেক ড্রাইভারের থাকে। তাই চোখের সমস্যা নিয়েই চালকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালান।
চোখ অমূল্য সম্পদ। বর্তমান সময়ে চোখের রোগের অত্যাধুনিক চিকিৎসাও রয়েছে। অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইমসহ নানা কারণে মানুষ চোখের সমস্যায় ভোগেন। বিদ্যমান বাস্তবতায় চশমা পরা মোটেও অস্বাভাবিক বিষয় নয়। তাই চোখের রোগে অবহেলা না করে সময়মতো চিকিৎসা করা উচিত। বিশেষ করে যারা গাড়ি চালান, তাদের জন্য এটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এতে অবহেলা করলে জীবনের বিনিময়ে মূল্য চুকাতে হবে, যা সবার কাছেই অপ্রত্যাশিত।










