অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় দেশের মূল্যস্ফীতির হার ছিল দুই অংকের ঘরে। এ সরকারের জন্য তাই শুরুতেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা। বিষয়টি চলতি অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যেও উল্লেখ করেছিলেন অর্থ উপদেষ্টা। তিনি জানিয়েছিলেন, ২০২৬ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে তখন আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নিয়ন্ত্রণহীন মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরে মানুষকে স্বস্তি দেয়া। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অন্তর্বর্তী সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, বিশেষ করে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রেখেছে। এর অংশ হিসেবে ২০২৪ সালেই নীতি সুদহার ১৫০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। এছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকারে রেখে চলতি অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সময় সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বর্তমান সরকার কিছুটা সাফল্য দেখিয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল গত রমজানে বাজারদর তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখা। পাশাপাশি গত বছরের অক্টোবরে মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে এসেছিল, যা ৩৯ মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম। তবে এ হার কমলেও তা সহনীয় পর্যায় ও লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী নামিয়ে আনতে পারেনি সরকার। সরকারের শেষ সময়ে দেখা যাচ্ছে মূল্যস্ফীতির পারদ আবারো ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে।
তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতির হার বাড়ছে। অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ১৭ থাকলেও নভেম্বরে এ হার বেড়ে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে উন্নীত হয়। ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে ঠেকেছে। সর্বশেষ জানুয়ারিতে এ হার দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে। তবে বাজার বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন যে মাঠপর্যায়ে এর তীব্রতা আরো বেশি। এদিকে ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি হ্রাসের ধারা শেষ পর্যন্ত সরকার অব্যাহত রাখতে পারল না। এমন পরিস্থিতিতে ধারণা করা যায়, পরবর্তী সরকারের জন্যও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে। এর লাগাম টানতে এ সরকারকে আরো কার্যকর কৌশল নিতে হবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নেয়া হয়েছিল বিগত ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলেই, যা অন্তর্বর্তী সরকারও অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এ মুদ্রানীতির আশানুরূপ প্রভাব পড়েনি মূল্যস্ফীতিতে। বরং বাড়তি নীতি সুদহারের প্রভাবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক শূন্য ১০ শতাংশ, যা ২০ বছরে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে বিনিয়োগেও একপ্রকার স্থরিবতা দেখা গেছে। সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা কমেছে। অর্থাৎ ব্যবসা-বাণিজ্যসহ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এক ধরনের শ্লথগতি নেমে এসেছে। এর প্রভাবে উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটছে, যা পক্ষান্তরে নানা সময়ে বাজারদর আরো উসকে দিয়েছে।
গত বছর সবজির বাজার বেশ চড়া ছিল। বিশেষ করে শীত মৌসুম শুরুর পরও নভেম্বর ও ডিসেম্বরে সবজির দাম তেমন কমেনি। ডিসেম্বরের শেষ দিকে কৃষক পর্যায়ে সবজির দামে বড় পতন হলেও তার সুফল ক্রেতা পর্যায়ে পৌঁছেনি। আবার গত বছর চাল, ডাল, চিনি, আটা, মাছ-মাংস, এলপিজিসহ বেশির ভাগ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। এ কারণে বছরজুড়ে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত মাত্রায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। যদিও গত বছর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অনেকটা কমেছে। মূল্য কমেছে চাল, গম, সয়াবিন তেল, গুঁড়া দুধ, মসলাসহ বিভিন্ন পণ্যের। দামের পাশাপাশি সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ব্যয়ও কমেছে। যদিও বিশ্ববাজারে দাম ও পরিবহন ব্যয় কমার সুফল বাংলাদেশের মানুষ পায়নি। উল্টো আগের দুই বছরের মতো বিদায়ী বছরজুড়েও তাদের ভুগতে হয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে। অথচ বিশ্ববাজারে কোনো পণ্যের দাম সামান্য বাড়লেও বাংলাদেশে তা খুব দ্রুতই ব্যাপক মাত্রায় বেড়ে যায়। আগে থেকে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট, ভঙ্গুর বাজার ব্যবস্থাপনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সব মিলিয়ে মূল্যস্তর গত বছর নানা সময় ফুলেফেঁপে উঠেছে।
এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে একা কেবল সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব নয় তা দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা বলে আসছেন। তাদের সুপারিশ ছিল, মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরতে বাজার ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দেয়া। কিন্তু বাস্তবে বাজার ব্যবস্থাপনায় নানা ধরনের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে।
পরবর্তী সরকারকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে এসব বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে। মূল্য নির্ধারণ, ভ্রাম্যমাণ আদালত বা অভিযান চালিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, সেটিও অতীতে দেখা গেছে। সুতরাং সরকারকে এমন উদ্যোগ নিতে হবে যা দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও টেকসই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে। এক্ষেত্রে দক্ষ বাজার ব্যবস্থাপনা বড় সহায়ক হতে পারে।
সত্য হলো, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনা ও পর্যবেক্ষণ দুর্বলভাবে পরিচালিত। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম ঘাটতি সৃষ্টি করে সংকটকে কাজে লাগিয়ে কোনো যুক্তি ছাড়াই পণ্যের মূল্যকে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি করে। বাজারের এ ধরনের কারসাজি বন্ধ করতে হবে। বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য পুরোপুরি বন্ধ করা প্রয়োজন। আর এটিই হতে পারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা এক্ষেত্রে অতীতেও অন্যান্য সরকার সেভাবে সফলতা দেখাতে পারেনি। এজন্য সরকারকে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি দক্ষ বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাত ও ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানো অব্দি প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এজন্য অবশ্যই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।










