রমজান মাসে স্বাভাবিকভাবে কিছু ভোগ্যপণ্য, ছোলা, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি ইত্যাদির চাহিদা বেড়ে যায়। বাড়তি চাহিদা পূরণে আমদানিও বাড়ানো হয়। এর পেছনে আরেকটি উদ্দেশ্য থাকে, চাহিদা ও জোগানে ভারসাম্য এনে রমজানে নিত্যপণ্যের বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখা। এর বাইরে সরকারের পক্ষ থেকে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়। যেমন রমজানের ভোগ্যপণ্য আমদানি শুল্কছাড়সহ এলসি খোলার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সুবিধা দেয়া হয়। এর পরও প্রতি বছর এ সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারমূল্যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়। ব্যবসায়ীদের একাংশ বাড়তি চাহিদার সুযোগ নিয়ে কৃত্রিম সরবরাহ সংকট তৈরি করেন। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে দাম বাড়িয়ে দেন। এতে বাজারমূল্যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়।
পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও বাড়তি চাহিদা ও সরবরাহ সংকটের নামে দাম বেড়ে যাওয়া মূলত নির্দেশ করে বাজারের অব্যবস্থাপনা। দুঃখজনকভাবে নানা সময়ে ক্ষমতায় থাকা সব সরকারের ক্ষেত্রেই এ কথা প্রযোজ্য যে তারা রমজানে ভোগ্যপণ্যের বাজারমূল্য সেভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। এমনকি অতীতে নিয়মমাফিক অভিযান চালিয়েও এটা সম্ভব হয়নি। এবার রমজানেও এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে এরই মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
রোজা শুরু হওয়ার আর বেশিদিন বাকি নেই। এর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এরই মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের কেনাকাটা শুরু হয়েছে এবং দামেও বাড়তি ভাব দেখা যাচ্ছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দেশের সবচেয়ে বড় চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ পাইকারি বাজারে বর্তমানে সয়াবিন তেল প্রতি মণ (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) প্রায় ৭ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রতি মণে দাম বেড়েছে প্রায় ১০০ টাকা। একইভাবে পাম অয়েল প্রতি মণ ৫ হাজার ৯২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, মণপ্রতি বেড়েছে ৮০ টাকা। এছাড়া অ্যাংকর ডালের দাম কেজিপ্রতি দেড়-দুই টাকা বেড়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ছোলার দামও বেড়েছে; মণপ্রতি ৩০-৫০ টাকা বেড়ে মানভেদে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে চিনির দামে নিম্নমুখী প্রবণতা বজায় থাকলেও রমজান উপলক্ষে তা বাড়তে শুরু করেছে। চিনির দাম মণপ্রতি ২০-৩০ টাকা বেড়ে প্রায় ৩ হাজার ৪৭০ টাকা দরে লেনদেন হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের অনেকেই স্বীকার করেছেন রমজান উপলক্ষে ছোলা ও ডালের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়া বাজারে এসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এ প্রবণতা পাইকারি ও খুচরা উভয় বাজারেই লক্ষণীয়।
যদিও আসন্ন রমজান উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনাবিষয়ক টাস্কফোর্স কমিটির এক বৈঠক শেষে বাণিজ্য উপদেষ্টা দাবি করেছিলেন দেশে রমজানের পণ্যের কোনো সরবরাহ সংকট নেই। বরং আমদানি গত বছরের চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি হওয়ায় এ সময় পণ্যের দাম তুলনামূলক কম থাকবে। কিন্তু শুরুর আগেই রমজানের পণ্যের দাম বাড়ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বাজার নিয়ন্ত্রণে কেবল পর্যাপ্ত আমদানিই যথেষ্ট নয়। সবচেয়ে জরুরি বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন। সরকারকে এটি বিবেচনায় নিতে হবে।
বাড়তি চাহিদার পাশাপাশি বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে বিরাজমান অস্থিরতার কারণে পণ্য খালাসে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। এ কারণে সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটছে বলে জানা গেছে। এদিকে গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বন্দরে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ডাক দিয়েছেন শ্রমিক ও কর্মচারীরা। বন্দরের সবচেয়ে বড় স্থাপনা নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এটিকেও এক ধরনের বাজার ব্যবস্থাপনাগত সংকট বলা যায়। এ পরিস্থিতি আরো দীর্ঘায়িত হলে রমজানে পণ্যের বাজার আরো অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। সরকারের দ্রুততম সময়ে বিদ্যমান সংকটের সমাধান করা উচিত। বিশেষ করে দ্রুততম সময়ে পণ্য খালাসের ব্যবস্থা করতে হবে।
বর্তমানে দেশব্যাপী নির্বাচনকেন্দ্রিক কার্যক্রম চলছে। নির্বাচনের পর পরই রমজান আসন্ন। অর্থাৎ নতুন সরকার দায়িত্ব নেবে রমজানের আগেই। কিন্তু বর্তমান সরকার যদি এখনই বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তবে আগামী সরকারের জন্যই এটি কঠিন হবে। কেননা অতীতে দেখা গেছে, একবার ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে গেলে, তা সহজে কমিয়ে আনা যায় না। সুতরাং সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ বজায় রাখার পাশাপাশি আসন্ন রমজানের বাজার স্থিতিশীলতার দিকেও সরকারকে মনোযোগ দিতে হবে। আগাম প্রস্তুতি ও সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে রমজানের বাজার অনেকটাই স্থিতিশীল রাখা সম্ভব। কিন্তু এ বছর এখনো তেমন কোনো কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়, ফলে বাজারে সুযোগসন্ধানী মহলের তৎপরতা বাড়ছে। এর রাশ টানতে সরকারের তদারকি কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সরকার নির্ধারিত দামে যেন পণ্য বিক্রি হয়, তা নিশ্চিত করা। এজন্য বাণিজ্যসহ কৃষি মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের সরকারি সংস্থাকে দ্রব্যমূল্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। এছাড়া বাজার ব্যবস্থাপনায় যেসব ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো দূর করতে হবে। রমজানের আগে দ্রব্যমূল্যের দাম স্বাভাবিক রাখতে অসাধু ব্যবসায়ী ও মজুদদারদের বিরুদ্ধে সরকারকে সদা তৎপর থাকতে হবে। আর রমজানকালীন ও ঈদের বাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম যেন সহনীয় পর্যায়ে থাকে, সেজন্য আগামী নির্বাচিত সরকারের সচেষ্ট থাকা প্রয়োজন।
দেশে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চমূল্যস্ফীতি বিরাজমান। রমজানের বাজারে মূল্যস্ফীতি আরো স্ফীত হোক তা একেবারেই কাম্য নয়। জনগণ যাতে সহনীয় ও স্বস্তিদায়ক মূল্যে ভোগ্যপণ ক্রয় করতে পারে, সেটাই প্রত্যাশা।










