সবচেয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের একটি হচ্ছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। অথচ স্বাধীনতার এত বছর পরও শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি এ খাতটিতে। গত ১৫ বছরে এ খাতে চলেছে লুটপাটের মচ্ছব। তার পেছনে কাজ করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের টানা সাড়ে পনেরো বছর এ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছেই রেখেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। টানা চারবার সরকার গঠনে প্রতিবারই মন্ত্রণালয় বণ্টন হলেও টেকনিক্যাল ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ বিভাগকে তিনি কখনই হাতছাড়া করেননি। শুধু বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই নয়, বিএনপি সরকারের শাসনামলেও এ মন্ত্রণালয়কে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দখলেই রেখেছিলেন। অর্থাৎ তিন দশক ধরেই রাজনৈতিক সরকারের প্রধানমন্ত্রীরা নিয়ন্ত্রণে রাখেন জনগুরুত্বপূর্ণ এ মন্ত্রণালয়কে। ফলে এ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিদ্যুৎ বিভাগ স্বনির্ভর হয়ে কখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পরামর্শ দিলেও শেষ পর্যন্ত সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের পরামর্শ অনুসারেই বিভাগকে কাজ করতে হয়েছে। রাজনৈতিক সরকারের স্বার্থেই বেশির ভাগ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ফলে ভোক্তার স্বার্থ খুব কমই রক্ষিত হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ খাতকে সার্বিকভাবে ঝুঁকিতে ফেলা হয়েছে।
রাজনৈতিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে না রেখে বিদ্যুৎ বিভাগ দেশের জনসাধারণের কল্যাণে পরিচালিত হওয়া উচিত। বিদ্যুৎ খাত পরিচালনায় প্রয়োজন দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তির। বিশেষ করে এ খাতে চুক্তি, ভোক্তার অধিকার, এমনকি কম মূল্যে বিদ্যুৎসেবার বিষয়টি যিনি নিশ্চিত করতে পারবেন এমন একজন ব্যক্তির এখানে দায়িত্বে থাকা উচিত। তাতে একদিকে যেমন এ খাতের উন্নয়নে গতি পাবে, অন্যদিকে অর্থনীতির সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতের জোরালো সম্পৃক্ততা থাকবে। রাজনৈতিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকায় রাজনৈতিক স্বার্থেই বেশির ভাগ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হতে দেখা গেছে। দেশের জনকল্যাণের স্বার্থে রাজনৈতিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে নয় বরং পরামর্শেই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় স্বনির্ভর সিদ্ধান্তে পরিচালিত হওয়া উচিত।
উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে কোনো প্রকল্পের চুক্তি করা হলে একদিকে যেমন ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হয়, অন্যদিকে লুটপাটের সুযোগও কম থাকে। বরং থাকে দায়বদ্ধতা। কিন্তু আওয়ামী লীগের বিগত দেড় দশকের শাসনামলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কোনো ন্যায্যতা ছিল না। উপরন্তু সরকার সমর্থিত কিছু ব্যবসায়ী ও ব্যক্তিকে এ খাত থেকে অর্থ লুটপাটের সুযোগ করে দেয়া হয়েছিল। আর এসব দুর্নীতি আড়াল করতে করা হয়েছিল দায়মুক্তি আইন। এ আইনের আওতায় বিনা টেন্ডারে শতাধিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল সরকারঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের। এতে এসব প্রকল্পের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা সরিয়ে ফেলার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া নষ্ট করা হয়েছে বিদ্যুতের প্রতিযোগিতামূলক বাজার। উচ্চ মূল্যের এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অর্ধেকই কোনো কাজে না এলেও দেশ ও জনগণের ঘাড়ে চাপানো হয়েছে ঋণের বোঝা। জনগণের পকেট থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা বের করে নেয়া হয়েছে বিদ্যুতের বাড়তি মূল্য পরিশোধের জন্য। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দেশ বিদেশ থেকে ঋণ গ্রহণ করা হয়েছে। এসব ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা না থাকায় নতুন করে ঋণ নিয়ে পুরনো ঋণ পরিশোধ করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতে আওয়ামী লীগ সরকারের করা বিশেষ আইনের মাধ্যমে তাদের পছন্দের লোকগুলোকে প্রকল্প দেয়া হয়েছে। আর এসব প্রকল্প থেকে নেয়া হয়েছে বিপুল পরিমাণ কমিশন। চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) থেকে টেকনিক্যাল বিষয়গুলো নিয়ে মতামত দেয়া হলেও তা খুব বেশি প্রাধান্য পায়নি। বরং নিজেদের মতো করে নিতে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বারবার ফাইল ফেরত পাঠানো ও সংশোধন করা হয়েছে। চুক্তিগুলো সংশোধন করা হয়েছে সরকার ও কোম্পানিগুলোর পছন্দমতো। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শীর্ষ পর্যায় থেকে যেসব সিদ্ধান্ত আসত সেগুলোই বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
বিগত তিন দশকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে প্রধানমন্ত্রী নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও নেপালে প্রধানমন্ত্রীকে নেতৃত্ব দিতে দেখা যায়নি। বরং এ মন্ত্রণালয় পরিচালনায় যারা অভিজ্ঞ তারাই নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিদ্যুৎ খাত পরিচালনার ক্ষেত্রে সবসময় এ বিষয়ে অভিজ্ঞ ও দক্ষ নেতৃত্ব প্রয়োজন। যদি অভিজ্ঞ কাউকে সরকারে না পাওয়া যায় তাহলে টেকনোক্র্যাট কোটায় কোনো মন্ত্রী নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। এ মন্ত্রণালয়ের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সাশ্রয়ী ও কম মূল্যে জনসাধারণকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা। রাজনৈতিক সরকারের আমলে তাদের নিয়ন্ত্রণে না রেখে বিদ্যুৎ বিভাগকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সুযোগ দেয়া উচিত। মন্ত্রণালয়কে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দেয়া হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন বিদ্যুতের প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করা।
আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তিন মেয়াদে ৮২টি আইপিপি (ইনডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার) এবং ৩২টি কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হয়। এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেয়া হয় বিনা টেন্ডারের মাধ্যমে। অর্থাৎ সরকার সমর্থক ব্যবসায়ী ও ব্যক্তিদের ডেকে ডেকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের লাইসেন্স দেয়া হয়। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো স্থাপনের প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে কয়েক গুণ ব্যয় বাড়িয়ে দেখানো হয়। এ অর্থ বিগত সরকারঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী, আমলা ও মন্ত্রীদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয়েছে। এ খাতের ব্যয় তোলার জন্য দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। বাড়তি মূল্য পরিশোধে সাধারণের নাভিশ্বাস উঠে যায়। শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এতে বেড়ে যায় মূল্যস্ফীতি।
দেশে গতকাল বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৮ হাজার ৯৮০ মেগাওয়াট থেকে ১০ হাজার ৫২০ মেগাওয়াট। গত শুক্রবার উৎপাদন হয়েছে ৯ হাজার ৪৫২ থেকে ৯ হাজার ২১৮ মেগাওয়াট। বিগত আওয়ামী লীগের শাসনামলে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে ২৭ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু দেশে ২০০৯ সালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র ছিল ২৭টি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট। অথচ বাড়তি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে কোনো বিদ্যুৎ নেয়া হচ্ছে না। চুক্তি অনুযায়ী বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ ক্ষমতা দ্বিগুণ করা হলেও গরমে লোডশেডিং থেকে মুক্তি মেলেনি দেশবাসীর। অথচ জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না করে শতভাগ বিদ্যুতায়নের কৃতিত্ব জাহির করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বেলাগাম নিয়ন্ত্রণ এ খাতটিকে দুর্নীতির আখড়া বানিয়েছিল। শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে লুটপাটের ভয়ানক চিত্র। ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রণহীন দুর্নীতির রাশ টেনে ধরতে হলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে পূর্ণ মন্ত্রীর অধীনে দেয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় দক্ষতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিয়ে বিভাগটিতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা উচিত। বিগত সরকারের আমলে করা বড় বড় দুর্নীতির যথাযথ তদন্ত করে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।










