গতকাল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। গেজেটের তথ্য অনুযায়ী, এ নির্বাচনে ২৯৯ আসনের মধ্যে সাতজন নারী সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। কেবল কমসংখ্যক নারী সংসদ সদস্য হয়েছেন এমন নয়। এ নির্বাচনের মোট প্রার্থীর সংখ্যার বিচারেও নারীর অংশগ্রহণ ছিল কম। এবারের নির্বাচনে ১ হাজার ৯৮১ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যার মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন ৮১ জন। অর্থাৎ মোট প্রার্থীর ৪ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। আর নির্বাচিত হওয়ার হার মাত্র ২ দশমিক ৩৪ শতাংশ। তবে বিগত পাঁচটি নির্বাচনে নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মোট নির্বাচনী আসনের বিপরীতে সেই হারও ছিল কম, ৬-৭ শতাংশের ঘরে ওঠানামা করেছে।
এসব তথ্য একটি বার্তা দিচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নারীরা তুলনামূলক পিছিয়ে রয়েছে। যদিও বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী এবং ভোটার সংখ্যার দিক দিয়েও তারা এগিয়ে। কিন্তু সংসদের মতো বিধিবিধান প্রণয়নকারী জায়গায় তাদের প্রতিনিধিত্ব একেবারেই সীমিত। রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ে যখন দেশের বড় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বে ভারসাম্য থাকে না, তখন তার প্রভাব নীতিতে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। সংসদ সদস্য হিসেবে নারীদের সংখ্যার নিম্নমুখিতা কেবল নির্বাচনী ফল নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, দলীয় কাঠামো এবং সামাজিক মানসিকতার সম্মিলিত প্রতিফলন। এমন পরিস্থিতিতে পরিবর্তন না এলে সংসদে নারীর উপস্থিতি বাড়বে না। বরং ভবিষ্যতে আরো কমার আশঙ্কা রয়েছে। আর সংসদে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোর।
দেশ বর্তমানে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে—মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সংকট, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বৈষম্য ইত্যাদি। এসব সমস্যা সমাধানে নারীর অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গিও অপরিহার্য। সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের জায়গা নয়; এটি নীতিনির্ধারণ, বাজেট বণ্টন ও রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার ঠিক করে। সেখানে নারীর উপস্থিতি কম হলে নীতিবৈষম্য হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বরং নানা দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সংসদে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি শক্তিশালী হয়। সুতরাং নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো সমতার প্রশ্নের পাশাপাশি কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জরুরি।
এবারের নির্বাচনে যে সাতজন নারী নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের শিক্ষাগত ও পেশাগত প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—তারা উচ্চশিক্ষিত, পেশাগতভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বা সামাজিক কাজে যুক্ত রয়েছেন। কেউ আইনজীবী, কেউ শিক্ষাবিদ, কেউবা রাজনীতিবিদ। এমনকি নারী প্রার্থীদের প্রায় ৭৫ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত বলে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জমা দেয়া নারী প্রার্থীদের হলফনামা পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। আর প্রায় ৬৭ শতাংশ নারী ছিলেন কর্মজীবী। অর্থাৎ যোগ্যতার বিচারে তারা কেউ পিছিয়ে নেয়। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গন বা দেশের সরকার কাঠামোয় তাদের অংশগ্রহণ সীমিত রয়ে গেছে।
এর অন্যতম কারণ নারীবান্ধব রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে না ওঠা, যার পেছনে মূলত রয়েছে নারীকে ঘিরে রাজনৈতিক দল ও সমাজের একাংশের মানসিকতা তথা বদ্ধমূল ধারণাসমূহ। যোগ্যতাসম্পন্ন হলেও তারা মনে করেন যে নারীরা নেতৃত্বদানে সক্ষম নন। এছাড়া নারীদের নিয়ে নেতিবাচক প্রচার এবং সাইবার বুলিংয়ের হারও বেশি। তবে সমস্যার মূলে রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহা ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের অঙ্গীকার থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি নির্বাচনে অংশ নেয়া বহু দল একজন নারী প্রার্থীও মনোনয়ন দেয়নি। এবারের নির্বাচনে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া রাজনৈতিক দলেরও ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, মনোনয়নে নারীর হার ছিল খুবই সীমিত। অন্য বড় দলগুলোর অবস্থাও আশাব্যঞ্জক নয়। রাজনৈতিক দলগুলো এখনো নারীদের ‘সংরক্ষিত আসনে’ দেখতে অভ্যস্থ। তাদেরকে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে আনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই। এছাড়া সমাজে নারী রাজনীতিবিদ ঘিরে ট্যাবুও রয়েছে। সব মিলিয়ে এক সময় রাজনীতি করা নারীদের অনেকেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং নতুন করে কাউকে আকৃষ্ট করতে পারে না বিদ্যমান রাজনৈতিক অঙ্গন।
রাজনীতি ও নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গনকে নারীবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা। এক্ষেত্রে জরুরি হলো নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। পারিবারিক রাজনৈতিক ইতিহাস বা পরিবার, অর্থ বা পেশিশক্তির ভিত্তিতে নয়, নারীর মূল্যায়ন হতে হবে যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে। প্রার্থী মনোনয়নের সময়ও এগুলো বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। অর্থ ও পরিবারনির্ভর রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এছাড়া জরুরি হলো রাজনৈতিক সহিংসতা ও সাইবার হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান। নারী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ, চরিত্রহনন ও অনলাইন হুমকি তাদেরকে নিরুৎসাহিত করে। তাই দলীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব বিকাশ কর্মসূচি, রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ এবং নিরাপদ সাংগঠনিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা অব্যাহতভাবে করে যেতে হবে।
এছাড়া আইনগত সংস্কারও জরুরি। নির্বাচন আইন ও দলীয় গঠনতন্ত্রে নারীর ন্যূনতম প্রতিনিধিত্ব বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি তা অমান্য করলে কার্যকর শাস্তির বিধান থাকা উচিত। সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে সরাসরি নির্বাচিত আসনে রূপান্তরের রোডম্যাপ প্রণয়ন করা প্রয়োজন, যাতে নারীরা প্রতিযোগিতার মূল ধারায় অংশ নিতে পারেন। রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন বা প্রণোদনা কাঠামোতেও নারী প্রার্থী মনোনয়নে উৎসাহ দেয়ার ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মনে রাখা যে সংসদে নারীর সংখ্যা বাড়ানো সাংবিধানিক সমতা ও প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের দাবি। সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করতে চাইলে অবশ্যই নারীর অংশগ্রহণ বাড়বে এমন ব্যবস্থার দিকে যেতে হবে সব রাজনৈতিক দলকে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি এক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয় তবে সেটি গণতন্ত্রের ভিতকেই দুর্বল করে রাখবে।









