সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় দেশে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় কৃচ্ছ্রসাধনমূলক কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আশু সংকট মোকাবেলায় এসব সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা যে সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ সঞ্চার করবে তা সহজেই অনুমেয়। এমন সময়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাস অনুসন্ধান এবং তা আহরণ করে সঠিক ব্যবস্থাপনার তাগাদা বাড়ছে। কিন্তু সেদিকের চিত্রও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। পেট্রোবাংলার তথ্যের ভিত্তিতে বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ২০১৭-২৫ সাল নাগাদ দীর্ঘ আট বছরে স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন কমেছে ৩৭ শতাংশ। বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের সরবরাহ ২৫২ কোটি ৯৮ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে স্থানীয় উৎস থেকে উৎপাদন মাত্র ১৭১ কোটি ঘনফুট। অথচ ২০১৮ সালে এ উৎপাদন ছিল ২৭০ কোটি ঘনফুট। দৈনিক গ্যাস সরবরাহের বড় একটি অংশই আসছে আমদানির মাধ্যমে। প্রতিবেদনটিকে নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করলে এটি স্রেফ একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং ভবিষ্যতে দেশের শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেতও বটে।
দেশের গ্যাস খাতের বড় অর্জনগুলো এসেছে স্থানীয় অনুসন্ধানের ওপর ভর করে। বিশেষ করে অতীতে বিএনপি সরকারের আমলগুলোয় স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে উল্লেখ করার মতো গতি ছিল। ওই সময় বিবিয়ানা ও বাংগুড়ার মতো বড় গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা হয়েছিল, যা আজও দেশের মোট উৎপাদনের বড় অংশ নিশ্চিত করছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি অবলম্বন করায় স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলনের প্রক্রিয়া স্তিমিত হয়ে পড়ে। পরিসংখ্যান বলছে, গত সাত বছরে এলএনজি আমদানিতে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অথচ ২০০৪-০৫ সালে নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার এবং বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধির যে ধারা শুরু হয়েছিল, তা ধারাবাহিকভাবে চললে আজ হয়তো কাতার বা ওমানের এলএনজি আমদানির ওপর আমাদের এ চরম নির্ভরতা তৈরি হতো না।
নানা রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিএনপি আবারো রাষ্ট্রপরিচালনায় ফিরেছে। জটিল এ পরিস্থিতিতে বিএনপি সরকার দেশীয় উৎস থেকে জ্বালানি তেল ও গ্যাস আহরণে কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে বলে আশ্বস্ত করেছে। সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরবর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে ৮ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদ অধিবেশনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্র অঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া আরো গতিশীল করতে সরকার ‘অনশোর মডেল পিএসসি ২০২৬’ ও ‘অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬’-এর চূড়ান্ত অনুমোদনের কাজ শুরু করেছে। মডেল দুটির কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেশীয় উৎস হতে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধিকল্পে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আগামী এক বছরে মোট ১১৭টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের কার্যক্রম নেয়া হয়েছে। স্থানীয় উৎস থেকে জ্বালানি আহরণের এ উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার করতে হবে।
এখনকার বাস্তবতা বিবেচনায় অভ্যন্তরীণ তেল-গ্যাসের উৎস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করতেই হবে। স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাস আহরণের উদ্যোগকে আরো বহুমুখী করা দরকার। দেশে বর্তমানে ২৯টি গ্যাস ক্ষেত্র রয়েছে যার মধ্যে ২০টি থেকে গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে। যে নয়টি গ্যাস ক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন বন্ধ রয়েছে সেগুলোর মধ্যে ছয়টিতে কারিগরি সীমাবদ্ধতা ও অনুন্নত অবকাঠামোর জন্য গ্যাস উত্তোলন স্থগিত রয়েছে। এসব গ্যাস ক্ষেত্রের সংকট, সম্ভাবনা শনাক্ত করে মজুদ গ্যাস আহরণের বিষয়কেও গুরুত্ব দেয়া যেতে পারে। এদিকে ২০২৬-২৮ সালের মধ্যে মোট ১০০টি নতুন কূপ খননের মহাপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে অনুসন্ধান কূপ, উন্নয়ন কূপ এবং ওয়ার্কওভার (পুরনো কূপ সংস্কার) অন্তর্ভুক্ত। তবে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে শুধু উদ্যোগ নিলেই হবে না, তা উত্তোলনের ব্যবস্থাপনাকে আন্তর্জাতিক মানের করতে হবে। স্থানীয় অনুসন্ধানমুখী চেতনার সঙ্গে বর্তমানের আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে সাগর ও স্থলভাগে জোরালো ড্রিলিং কার্যক্রম চালাতে হবে। এজন্য বাপেক্সকে আরো শক্তিশালী ও কর্মক্ষম করতে হবে।
বর্তমানে পেট্রোবাংলার সক্ষমতা ঘাটতির কারণে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বহুজাতিক সংস্থার দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। তৈরি পোশাক খাত ও সড়ক অবকাঠামো নির্মাণে যেমন আমরা বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দক্ষতা রপ্ত করেছি, তেমনি তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে নিজস্ব দক্ষতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের নিজস্ব অনবায়নযোগ্য জ্বালানি আহরণের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও সেগুলো বরাবরই আলোচনায় সীমাবদ্ধ ছিল। বিভিন্ন সময়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে তেল-গ্যাস বা জ্বালানি সম্পদ আহরণের পরিকল্পনা নেয়া হলেও সেগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতি নেই। কেন এমনটি হয়েছে তার জবাব কোনো সরকারই দেয়নি। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা প্রসঙ্গে সাধারণ মানুষের মনেও এক ধরনের অনাস্থা কাজ করে। এ জটিলতা কাটাতে তথ্যের স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দেয়ার বিষয়েও সরকারকে ভাবতে হবে। অতীতের সরকার বা সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতা বা ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারকে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। নানা কারণে সরকারের পক্ষে এখনই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের আশু সমাধান সম্ভব নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার ব্যবহার এবং একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য উৎস ব্যবহারের পথে হাঁটতেই হবে। সে পথ যেন সুগম হয়, সেজন্য এখনই তোড়জোড় শুরু করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।










