কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আবির্ভাব প্রযুক্তিগত বিবর্তনের গতিপথে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনকে চিহ্নিত করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত সক্ষমতাগুলো বর্তমানে আমাদের হাতের মুঠোয় পৌঁছে যাওয়ায় বিভিন্ন ক্ষেত্রের অগ্রগতিগুলো সমাজের কার্যপ্রণালি, অর্থনীতির বিকাশ ও সরকারের পরিষেবাগুলো প্রদানের পদ্ধতিকে নতুনভাবে রূপদান করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেই বিশ্বটিকে সক্ষম করে তুলছে, সেটি এখন পর্যন্ত আমাদের পরিচিত বিশ্বের তুলনায় স্পষ্টতই ভিন্নতর হবে। আসন্ন বছরগুলোতে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো নির্ধারণ করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিদ্যমান কাঠামোগত বিভাজনগুলোকে আরো গভীর করবে, নাকি এটি বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অগ্রগতির একটি হাতিয়ার হয়ে উঠবে।
এ প্রেক্ষাপটেই ভারত এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক এআই সমাবেশ—ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট—আয়োজন করতে চলেছে, যেটি ২০২৬ সালের ১৬-২০ ফেব্রুয়ারি নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হবে। এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত চারটি বৈশ্বিক এআই শীর্ষ সম্মেলনের মধ্যে এটিই সর্বাধিক বিস্তৃত হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে এবং অনুষ্ঠানটি এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অভূতপূর্ব কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। এতে প্রায় ২০ জন সরকারপ্রধান, ৫০ জনের বেশি মন্ত্রী এবং শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক ও ভারতীয় প্রতিষ্ঠান থেকে ৪০ জনের বেশি সিইও-সহ ১০০টিরও বেশি দেশের অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এ শীর্ষ সম্মেলন বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক আলোচনার অগ্রভাগে ভারতের অবস্থানকে প্রতিফলিত করছে এবং একই সঙ্গে একটি দায়িত্বশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রভাবভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পক্ষে ভারতের অবস্থানের স্বীকৃতি হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
সম্পৃক্ততার গভীরতা ও বৈচিত্র্যকে জোরালোভাবে উপস্থাপন করে এ শীর্ষ সম্মেলনে ৫০০টিরও বেশি এআই স্টার্টআপের প্রদর্শনী থাকবে এবং প্রায় ৫০০টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে, যা এটিকে এখন পর্যন্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক সম্মেলনগুলোর মধ্যে একটি করে তুলবে।
তবে এ শীর্ষ সম্মেলনটির তাৎপর্য কেবল এর পরিধির মধ্যে নয়, বরং এটি যে মূল্যবোধগুলোকে এগিয়ে নিতে চায় সেগুলোর মধ্যেই নিহিত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রকৃত মূল্য প্রান্তিকভাবে জনগণ, পৃথিবী ও দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতির ওপর এর প্রভাবের মাধ্যমে পরিমাপ করা উচিত। ‘সর্বজন হিতায়, সর্বজন সুখায়’—সকলের কল্যাণ ও সকলের সুখ—এ মূলমন্ত্র কর্তৃক পরিচালিত হয়ে ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিটটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এমন একটি উপকরণ হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়, যার সম্ভাবনা তখনই বাস্তবায়ন হবে যখন এর সুফল কেবল কয়েকজনের মাঝে নয়, বরং সবার মধ্যে বণ্টন করা হবে। এটি অর্জন করার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সবার জন্য একই প্রকৃতির মডেলের মাধ্যমে নয়, বরং তুলনামূলক শক্তি, সক্ষমতা ও উন্নয়নমূলক চাহিদার দৃষ্টিকোণ থেকে অবলোকন করাটা প্রয়োজন।
ভারতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উপাখ্যান
ভারত উল্লেখযোগ্য শক্তিগুলো সহযোগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে। ভারত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক গবেষণার ফসলের ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অবদানকারীদের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে এবং ভারতের কাছে রয়েছে এআই ইকোসিস্টেমজুড়ে প্রযুক্তিগত প্রতিভার প্রগাঢ় ভাণ্ডার। বিশ্বের অন্যতম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-শিক্ষিত শ্রমশক্তিগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে, যা কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঠিক পরই অবস্থান করছে—ভারত শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিগুলো গ্রহণ করার ক্ষেত্রেই নয়, এর উন্নয়নকে রূপদান করার ক্ষেত্রেও ভালো অবস্থানে রয়েছে।
প্রতিভার বাইরেও তথ্যের ক্ষেত্রে ভারতের একটি উল্লেখযোগ্য তুলনামূলক সুবিধা রয়েছে। এর আকার ও বৈচিত্র্য ভারতের স্বাস্থ্য, কৃষি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও শাসন ব্যবস্থার মতো বিভিন্ন খাতে সমৃদ্ধ, প্রেক্ষাপট-নির্দিষ্ট ডেটাসেট সৃষ্টি সক্ষম করে তোলে। এ বৈশিষ্ট্যগুলো এমন এআই সিস্টেম বিনির্মাণের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করে, যেগুলো প্রাসঙ্গিক, স্থিতিস্থাপক ও বাস্তব বিশ্বের পরিস্থিতিতে নির্ভরযোগ্য।
এ শক্তিগুলোর ওপর ভিত্তি করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নের লক্ষ্যে ভারত নিম্ন থেকে উচ্চ পর্যায়ের (বটম-আপ) একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ স্বতন্ত্র পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। পদ্ধতিটির বৈশিষ্ট্য হলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও খাতজুড়ে বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে থাকা উদ্ভাবন, শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় সমন্বয় এবং নির্দিষ্ট খাতের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োগ-নির্দিষ্ট, ক্ষুদ্র পরিসরের মডেলগুলোর ওপর সতর্কতার সঙ্গে গুরুত্ব আরোপ করা। এ ধরনের মডেলগুলো কম্পিউটেশনের দিক থেকে অধিকতর কার্যকর, সহজে ফাইন-টিউনযোগ্য আর স্মার্টফোন বা ব্যক্তিগত কম্পিউটারের মতো স্থানীয়ভাবে উপলব্ধ হার্ডওয়্যারে কাজ করতে সক্ষম। এ বিকেন্দ্রীকৃত কম্পিউটিং পদ্ধতির দৃষ্টান্তটি সম্পদ, শক্তি ও মূলধননির্ভর ডেটা সেন্টারগুলোর আনুপাতিক সম্প্রসারণের প্রয়োজন ছাড়াই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক ক্ষমতাগুলোকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম করে তোলে—ফলস্বরূপ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিষেবাগুলোতে প্রবেশাধিকার গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠে।
ভারতজুড়ে স্থানীয় উদ্ভাবক, পৌর সংস্থা, স্টার্টআপগুলো এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে তাৎক্ষণিক ও প্রাসঙ্গিক প্রতিবন্ধকতাগুলো মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মোতায়েন করেছে। দক্ষিণ ভারতে, অস্ত্রোপচারবিহীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সক্ষম থার্মাল ইমেজিং সরঞ্জামগুলো স্বল্প সম্পদবিশিষ্ট এলাকায় প্রাথমিক পর্যায়ের স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিংকে সক্ষম করছে। হিমালয় অঞ্চলে, মেশিন-লার্নিং মডেলগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে স্থানীয় সেন্সর নেটওয়ার্কগুলো ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢালগুলোতে রিয়েল টাইমভিত্তিক ভূমিধসের সতর্কতাবার্তা প্রদান করছে। এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সক্ষম কৃষি নেটওয়ার্কগুলো ১২টি ভারতীয় রাজ্যের ১৮ লাখেরও বেশি কৃষকের জন্য বাজারে প্রবেশ, মূল্য আবিষ্কার ও লজিস্টিক দক্ষতা উন্নত করেছে।
ক্ষেত্রগত প্রয়োগের বাইরেও ভারতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইকোসিস্টেমটি অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে গৃহীত মৌলিক উদ্যোগগুলোর দ্বারাও গঠিত। ভারতের ইলেকট্রনিকস ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের নেতৃত্বাধীন ভাষিনী ও (Bhashini) এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, মাদ্রাজের এআইফোর ভারত (AI4Bharat)-এর মতো প্লাটফর্মগুলো ভাষা ও ভয়েস-ফার্স্ট এআই সিস্টেমগুলোর মাধ্যমে ডিজিটাল পরিষেবাগুলোর পরিধি সম্প্রসারিত করে চলেছে। স্থানীয় ভাষায় যোগাযোগ করতে সক্ষম করে তোলা আর স্বল্পমূল্যের ডিভাইসগুলোতেও কার্যকরভাবে কাজ করার মাধ্যমে কীভাবে পরিসর ও অন্তর্ভুক্তি একসঙ্গে অগ্রসর হতে পারে—এ উদ্যোগগুলো তা প্রদর্শন করে।
গ্লোবাল সাউথের জন্য ভবিষ্যতের এআই আলোচনা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন অর্থনীতি ও সমাজের ভিত্তিকে পুনর্গঠন করছে, তখন বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের সামনে মূল প্রশ্নটি এখন আর এটা নয় যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্বকে রূপান্তরিত করবে কিনা, বরং কাজটি কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক, দায়িত্বশীল ও মানবিক উপায়ে করবে, সেটা। ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট, ২০২৬ ঠিক এ আলোচনাকেই সঠিকভাবে এগিয়ে নিতে চায়—যেটা জনগণকে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখে এবং কেবল সক্ষমতা দিয়ে নয়, বরং প্রভাব দিয়ে সাফল্যকে পরিমাপ করে।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য—যেখানে ডিজিটাল রূপান্তর ক্রমবর্ধমানভাবে উৎপাদন, লজিস্টিকস, জনসেবা প্রদান, স্বাস্থ্যসেবা ও দুর্যোগ সহনশীলতাকে প্রভাবিত করছে—এ পদ্ধতি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। সাশ্রয়ী মূল্যের, প্রয়োগ-নির্দিষ্ট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভাষাভিত্তিক সহজলভ্যতা ও বিকেন্দ্রীকৃত নিয়োজিতকরণের ওপর ভারতের গুরুত্ব আরোপ করাটা অনেক উদীয়মান অর্থনীতি যেসব বাস্তবতার সম্মুখীন হয়, সেগুলোকে ঘনিষ্ঠভাবে প্রতিফলিত করে। ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট তাই বাংলাদেশ ও বৃহত্তর গ্লোবাল সাউথের জন্য এমন একটি প্লাটফর্ম প্রদান করে, যেখানে তারা এমন একটি এআই ভবিষ্যৎ গঠনে জড়িত হতে পারবে, যা কেবল প্রযুক্তিগতভাবেই উন্নত নয়, বরং ন্যায়সংগত, বিশ্বাসযোগ্য ও যৌথ অগ্রগতির ভিত্তিতে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত।
প্রণয় ভার্মা: বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার










