দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ১৯ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী কলা ও মানবিক অনুষদভুক্ত বিষয়ে অধ্যয়নরত। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এ সংখ্যা ৩৯ হাজার। অথচ কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডসের (কিউএস) ২০২৬ সালের বিষয়ভিত্তিক র্যাংকিংয়ে বিশ্বের ৫৫২ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়েরও ঠাঁই হয়নি। অথচ প্রতিবেশী ভারতের পাঁচটি, চীনের ২৬টি ও জাপানের ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয় এ তালিকায় জায়গা পেয়েছে। শিক্ষার্থী সংখ্যা ও ঐতিহ্যের বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হলেও একাডেমিক স্বীকৃতির বিচারে তা প্রায় অনুপস্থিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২২ শতাংশ শিক্ষার্থী কলা অনুষদে অধ্যয়নরত। প্রতিষ্ঠার ১০৬ বছর পরও এ অনুষদ কিউএসের বিষয়ভিত্তিক তালিকায় জায়গা পায়নি, যদিও প্রকৌশল ও বিজ্ঞানের কয়েকটি বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থান পেয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রও একই। এখানে ৮২৫ জন পিএইচডিধারী শিক্ষক থাকলেও কলা অনুষদ আন্তর্জাতিক তালিকায় নেই। অর্থাৎ শিক্ষকের উচ্চতর ডিগ্রি বা শিক্ষার্থী সংখ্যা কোনোটিই আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে পারছে না। কিউএস র্যাংকিং একাডেমিক সুনাম, সাইটেশন, আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক ও নিয়োগকর্তাদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। এসব সূচকের প্রতিটিতেই দেশের কলা ও মানবিক অনুষদ পিছিয়ে। এক্ষেত্রে গবেষণা বরাদ্দের বৈষম্যই প্রধান বাধা। কারণ গবেষণা তহবিলের বড় অংশ বিজ্ঞান ও প্রকৌশলভিত্তিক বিষয়ে ব্যয় হয়। ফলে কলা অনুষদের গবেষণায় বরাদ্দ তুলনামূলক অপ্রতুল। এদিকে গবেষণা প্রকাশনার ভাষা ও মাধ্যম আরেকটি বাধা। বাংলা, ইতিহাস ও দর্শন বিভাগের গবেষণার বড় অংশ বাংলায় প্রকাশিত হয়, যা আন্তর্জাতিক জার্নাল বা সূচকে অন্তর্ভুক্ত হয় না। আবার কলা অনুষদের গবেষণা প্রায়ই বই আকারে প্রকাশ হয়, পিয়ার রিভিউড (পিআর) জার্নালে নয়। অথচ আন্তর্জাতিক র্যাংকিং পিআর জার্নালে প্রকাশনার সংখ্যা ও উদ্ধৃতির ওপর নির্ভরশীল। গবেষণার বিষয়বস্তুর সীমাবদ্ধতাও একটি বড় সমস্যা। সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা ইতিহাসের গবেষণা প্রায়ই স্থানীয় বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকে। ভাষা ও সাহিত্যবিষয়ক বিভাগগুলোর গবেষণা প্রকাশের সুযোগ এমনিতেই সীমিত। আবার এসব বিষয়ের গবেষণার আন্তর্জাতিক পাঠক বা উদ্ধৃতির সুযোগ তুলনামূলক কম, যদিও গবেষণার মান খারাপ এমন নয়। এ সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা। অনেক শিক্ষক নিয়মিত নিজেদের গবেষণা প্রোফাইল ও বায়োডাটা হালনাগাদ করেন না বলে র্যাংকিংয়ের মূল্যায়নে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
বিষয়ভিত্তিক গবেষণার প্রকৃতির ভিন্নতা একটি বাস্তবতা, কিন্তু এটি ব্যর্থতা ঢাকার যুক্তি হতে পারে না। বিজ্ঞান ও কলা অনুষদের গবেষণা পদ্ধতি ভিন্ন হলেও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা উৎপাদনের দায় সব অনুষদের সমান। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি গবেষণা বরাদ্দে বৈষম্য বজায় রাখে, শিক্ষকের প্রোফাইল হালনাগাদের জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা না রাখে এবং আন্তর্জাতিক প্রকাশনার জন্য প্রণোদনা না দেয়, তাহলে ফল একই থাকবে। বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদ তুলনামূলক এগিয়ে থাকলেও অন্যান্য অনুষদে সমান মানের গবেষণা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। গোটা সমস্যাটিই কাঠামোগত। আর কলা ও মানবিক বিভাগের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের বিকল্প নেই।
পাঠ্যক্রম দীর্ঘদিন হালনাগাদ না হওয়াও একটি বড় দুর্বলতা। ইতিহাস, সাহিত্য ও দর্শনের মতো মৌলিক বিষয়ে আন্তর্জাতিক প্রবণতা ও পদ্ধতিগত অগ্রগতির সঙ্গে সংগতি রেখে পাঠ্যক্রম পুনর্গঠন করা প্রয়োজন হলেও তা করা হয় না। আন্তর্জাতিক গবেষকদের সঙ্গে যৌথ গবেষণা প্রকল্প, সম্মেলনে অংশ নেয়া বা বৈশ্বিক একাডেমিক নেটওয়ার্কে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্যোগ এখনো সীমিত। এসব উদ্যোগ নেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিয়মিত কাজের অংশ হওয়া উচিত ছিল, বাড়তি কোনো প্রকল্প নয়।
এদিকে সরকার সৃজনশীল অর্থনীতিকে (ক্রিয়েটিভ ইকোনমি) অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ খাতের ভিত্তিই কলা ও মানবিক শিক্ষা। চলচ্চিত্র, সাহিত্য, নকশা, সাংবাদিকতা, ইতিহাসনির্ভর গবেষণা, ভাষা ও সংস্কৃতি শিল্প—সবকিছুর দক্ষ জনবল তৈরি হয় এ অনুষদ থেকে। আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তি যত এগোচ্ছে, নীতিনির্ধারণ, মানবাধিকার বিশ্লেষণ, সাংস্কৃতিক কূটনীতি ও সমাজবিজ্ঞানভিত্তিক নীতি পরামর্শের প্রয়োজনীয়তা তত বাড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তির যুগেও দর্শন, নীতিশাস্ত্র ও ভাষাবিজ্ঞানের প্রশিক্ষিত জনবল ছাড়া প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ ও নৈতিক কাঠামো তৈরি সম্ভব নয়।
অথচ দেশের কলা ও মানবিক অনুষদের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ শিক্ষাজীবন শেষে বেকার থাকছেন, যা বণিক বার্তার প্রতিবেদনেই উঠে এসেছে। এর অর্থ এ অনুষদের একাডেমিক মান ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে সংযোগ দুর্বল। সৃজনশীল অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে এ সংযোগ জোরদার করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও পাঠ্যক্রম ছাড়া এ খাতে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা তৈরি হবে না। এ অনুষদ দুটোর মান বাড়ানোর জন্য গবেষণা বরাদ্দে বিজ্ঞান ও কলা অনুষদের মধ্যে ভারসাম্য আনতে হবে। বরাদ্দের সিদ্ধান্ত বিষয়ভিত্তিক অগ্রাধিকার নয়, প্রাতিষ্ঠানিক নীতির ভিত্তিতে নেয়া প্রয়োজন। শিক্ষকদের ইংরেজি ভাষায় ও পিআর রিভিউড জার্নালে প্রকাশনার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও প্রণোদনা দিতে হবে। পাশাপাশি বাংলা ভাষার গবেষণার আন্তর্জাতিক অনুবাদ ও প্রচারের ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষকদের গবেষণা প্রোফাইল ও বায়োডাটা নিয়মিত হালনাগাদ বাধ্যতামূলক করা আবশ্যক। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ গবেষণা প্রকল্প ও সম্মেলন আয়োজনে বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে। পাঠ্যক্রম পর্যায়ক্রমে হালনাগাদ করে স্থানীয় বিষয়ের পাশাপাশি বৈশ্বিক প্রাসঙ্গিকতাসম্পন্ন গবেষণা বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে গবেষণা আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে (ইউজিসি) কলা ও মানবিক অনুষদের জন্য পৃথক মানোন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে, যেখানে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও জবাবদিহি থাকবে।
সরকারের সৃজনশীল অর্থনীতির অগ্রাধিকার নীতির সঙ্গে উচ্চ শিক্ষা নীতির সমন্বয় প্রয়োজন। কলা ও মানবিক অনুষদের মান বাড়ানো কেবল র্যাংকিংয়ের বিষয় নয়, এটি দেশের সৃজনশীল খাতের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা সক্ষমতার প্রশ্ন। একই সঙ্গে এ অনুষদগুলোতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের দক্ষ জনসম্পদে রূপান্তরেরও প্রসঙ্গ। শিক্ষার্থী সংখ্যায় শীর্ষে থেকেও মানে পিছিয়ে থাকার এ ব্যবধান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ইউজিসি ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ঘুচবে না।










