ভ্যাট বা পরোক্ষ করের প্রভাব ধনী-গরিবভেদে ভিন্ন হয়। এ কর বাড়লে ধনীদের তেমন সমস্যা হয় না, সমস্যা হয় দরিদ্রদের। তাদের আয় সীমিত। পণ্য ক্রয়ে ব্যয় বাড়ায় তাদের ভোগ সীমিত হয়ে পড়ে। ধনী-গরিবের জীবনযাপনে বৈষম্য সামান্য হলেও বাড়ে। এ বৈষম্য দূর করতে প্রধানত একটি নির্দিষ্ট সীমার ওপর আয়কারীদের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ কর আহরণে বাড়তি জোর দেন অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই কর-জিডিপির অনুপাত অনেক কম। কর-জিডিপির অনুপাত কীভাবে বাড়ানো যায় তা নিয়ে অনেক আলাপ-আলোচনা হয়েছে। যদিও নানা ত্রুটি ও জটিলতায় দেশে প্রত্যক্ষ কর আহরণ বাড়ানো একটু কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। সমাজে বৈষম্য দূর করতে হলে প্রত্যক্ষ করের আওতা বাড়ানো এবং আদায়ের বিকল্প নেই। কিন্তু সরকার সেই কঠিন পথে না হেঁটে পরোক্ষ করের মতো সহজ পথে হাঁটতে চাইছে। কারণ পরোক্ষ কর আদায় সহজ। ধনী-দরিদ্র সবাই এ কর দিতে বাধ্য। আবার এতে বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি সবারই জানা।

এমনিতেই দুই বছরের অধিক সময় ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। গত নভেম্বরে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এ সময় গড় মূল্যস্ফীতির চেয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার আরো বেশি চড়া, যা ছিল প্রায় ১৪ শতাংশ। এ সময় পরোক্ষ কর বাড়ানোর উদ্যোগ কতটা যৌক্তিক বা যুগোপযোগী হবে তা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের ভাবা উচিত। বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে ভ্যাট বা পরোক্ষ কর বাড়ানোর উদ্যোগ মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দিতে পারে। এর ফলে মানুষের ভোগ কমে যেতে পারে। এতে ভ্যাট বৃদ্ধির এ উদ্যোগ থেকে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আয় নাও হতে পারে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ও নীতি সুদহার (রেপো রেট) প্রায় দ্বিগুণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের এ প্রেসক্রিপশন দিয়েছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির এ প্রেসক্রিপশনে মূল্যস্ফীতি না কমে উল্টো ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে এখনো। বেড়েছে মানুষের ভোগান্তি। সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণ নেয়া কমেছে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বিনিয়োগ। গত অক্টোবরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ যা তিন বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় নতুন করে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগও বাড়ছে না। বিনিয়োগের ওপর এমন নেতিবাচক প্রভাবের কারণে নতুন কর্মসংস্থান সেভাবে সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে বেকারত্বের হার। বর্তমানে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখের বেশি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আইএমএফ যে প্রেসক্রিপশন দিয়েছিল তা বাস্তবায়ন করেও দেশটি কোনো সাফল্য পায়নি। বরং অর্থনীতিতে আরো চাপ বেড়েছে। আইএমএফের প্রেসক্রিপশনেই ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশকে দেয়া ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারে চলমান ঋণ কর্মসূচির চতুর্থ কিস্তির অর্থ ছাড়ের আগে গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ঘুরে গেছে আইএমএফের একটি মিশন। চলমান এ ঋণ কর্মসূচির জন্য কর আহরণ ও নীতি গ্রহণকারী সংস্থাকে আলাদা করাসহ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর মতো কিছু কঠোর শর্ত দিয়েছে সংস্থাটি। এনবিআর সূত্র বলছে, ৪৩ ধরনের পণ্য ও সেবায় ভ্যাট বাড়ানোর পাশাপাশি সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আইএমএফের প্রেসক্রিপশনে ভ্যাট বাড়ানোর উদ্যোগ কার্যকর হলে বিদ্যমান মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দেবে এবং আয়বৈষম্য আরো বাড়বে।

একদিকে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেনি। বহুজাতিক সব সংস্থা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যেও মন্দা যাচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আয় পরিস্থিতিও হতাশাজনক। তার ওপর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশকিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর শুল্ক কর কমানো হয়েছে। এর ফলে সরকারের রাজস্ব আহরণও কমবে। এ অবস্থায় আইএমএফের লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে রাজস্ব আহরণ সম্ভব হবে না বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। আইএমএফের পক্ষ থেকে এর আগের দুই অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেয়া হয়েছিল, সেটি পূরণ করতে পারেনি সরকার। এর মধ্যে সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সংস্থাটির দেয়া ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৫৩০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রকৃত কর রাজস্ব আয় হয়েছে ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। একইভাবে এর আগের ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় হয়েছে ৩ লাখ ২৭ হাজার ৬৫০ কোটি টাকার রাজস্ব।

বাংলাদেশে বর্তমানে জিডিপি অনুপাতে রাজস্ব আহরণ হতাশাজনক। কর-জিডিপি অনুপাতের ক্ষেত্রে একেবারে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর সারিতে রয়েছে বাংলাদেশ। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায়ও বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। কর-জিডিপির অনুপাত বাড়াতে প্রত্যক্ষ করের আওতা বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা। নিজস্ব আয় থেকে ঋণ, সুদ ও ভর্তুকির দায় পরিশোধে তারা গুরুত্ব দিয়েছেন। অথচ বাস্তবতা তার বিপরীত। গত এক দশকে কর-জিডিপি অনুপাত না বেড়ে বরং কমে এসেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কর-জিডিপির অনুপাত ৭ দশমিক ৩২ শতাংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন সত্ত্বেও রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা ঘোচেনি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অন্তর্বর্তী সরকার নিত্যপণ্যে শুল্ক কর ছাড় দিয়েছে। তাতেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। কর-জিডিপির অনুপাত বাড়াতে হলে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের আওতা বাড়ানো জরুরি। এদিকে গত অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ কোটি ৪ লাখ করদাতা শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) ছিল। কিন্তু আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন মাত্র ৪৩ লাখ। নিবন্ধিত করদাতার সংখ্যা বাড়লেও রিটার্ন জমা দেয়া ব্যক্তির সংখ্যা সেই তুলনায় বাড়েনি। কমসংখ্যক রিটার্ন জমা দেয়ার জন্য অপর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ, স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত করদাতা জরিপের অনুপস্থিতি এবং কর প্রশাসনের অটোমেশনের ধীরগতিই দায়ী। এছাড়া রিটার্ন দাখিলে প্রমাণও (পিএসআর) যথাযথভাবে তদারকি হচ্ছে না। সামগ্রিকভাবে দেশে কর আদায় ব্যবস্থা যথাযথভাবে সম্প্রসারণ না হওয়ায় কর প্রদানে মানুষের আগ্রহ কম। প্রত্যক্ষ কর উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বৃদ্ধি না পাওয়া কর ব্যবস্থাপনায় এনবিআরের দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। এনবিআরের দুর্বলতাগুলো শনাক্ত করে কর কাঠামোর সংস্কার আবশ্যক। প্রত্যক্ষ কর আহরণের ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা হলো কর জমাদানের প্রক্রিয়াটি এখনো জটিল। করদাতাদের স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উদ্বুদ্ধকরণের পাশাপাশি জটিলতা কমিয়ে আনতে হবে। করারোপ, হিসাবায়ন ও জমাদান পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া করদাতাবান্ধব হতে হবে। এছাড়া করদাতা ও আহরণকারীর মধ্যে সম্পর্কের মিথস্ক্রিয়া বাড়াতে হবে।

আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক এনবিআর রাজস্বের প্রধান তিনটি খাত। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এনবিআরের মোট রাজস্বের ৫৩ দশমিক ৪০ শতাংশই আসে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক থেকে। আয়কর খাত থেকে আসে প্রায় ৩৪ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। আরো কয়েক খাত থাকলেও সেখান থেকে সামান্য রাজস্ব আদায় হয়। সরকারের পরোক্ষ করের ওপর অধিক নির্ভরশীলতায় প্রতিনিয়ত নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। কারণ ধনী-দরিদ্র সবাইকে একই হারে ভ্যাট প্রদান করতে হয়। আয়কর প্রদান না করলেও দেশে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ও ভোক্তা হিসেবে দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ মূসক, পণ্য আমদানিতে পরোক্ষ কর, সম্পূরক শুল্কসহ অন্যান্য ভ্যাট, চার্জ হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে কর দেয়। অর্থাৎ জাতীয় বাজেটেও দরিদ্র শ্রেণীর মানুষের অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি। এনবিআরের কর আহরণ সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আয়বৈষম্য কমিয়ে কর ন্যায্যতা ও প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা জরুরি। ভ্যাটের মতো পরোক্ষ করভিত্তিক রাজস্ব বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির জন্য আদর্শ নয়। কারণ এ ধরনের কর ধনী-গরিব সবাইকে সমানভাবে দিতে হয়। এতে দরিদ্র মানুষের ওপর চাপ বাড়ে। পরোক্ষ করের ওপর ভিত্তি করে কোনো সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা পেতে পারে না। পরোক্ষ কর ও ভ্যাটের ওপর নির্ভরশীলতা এবং সম্পদের ওপর কর না থাকা মৌলিক বৈষ্যমের একটি উৎস। বৈষম্য কমাতে এবং বিদ্যমান মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিয়ে পরোক্ষ কর বা ভ্যাট বাড়ানোর উদ্যোগ পুনর্বিবেচনা করা দরকার।