পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এগুলো মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায়ও জরুরি। নিরাপদ পানি, উন্নত স্যানিটেশন সুবিধা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি ছাড়া মানুষ বিভিন্ন রোগের কাছে অরক্ষিত হয়ে পড়ে। বিশেষত শিশু ও নারীরা বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকে। এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সুপেয় বা নিরাপদ পানির সংকট তীব্রভাবে দেখা দিয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলগুলোয় পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে চলেছে। অথচ পানি স্যানিটেশন ও হাইজিন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এমন এক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে সর্বস্তরের নাগরিককে যথাযথভাবে ওয়াশ সুবিধার আওতায় আনতে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের দেয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ওয়াশ খাতে বড় বৈষম্য হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি ছিল।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) তথ্য জানাচ্ছে, ওয়াশ খাতে বরাদ্দ ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১৮২ দশমিক ২৮ বিলিয়ন থেকে কমে ২০২৫-২৬ প্রস্তাবিত অর্থবছরে ১০৯ দশমিক শূন্য ১ বিলিয়ন টাকায় দাঁড়িয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের (৯১ দশমিক ৪১ বিলিয়ন টাকা) তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি হলেও তা বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য পর্যাপ্ত নয়। এছাড়া পিপিআরসি এবং ওয়াটারএইডের যৌথ প্রতিবেদনে শহর ও গ্রাম, এমনকি বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও দুর্গম অঞ্চলের মধ্যেও বাজেট বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে। ঢাকা ওয়াসা প্রায় সম্পূর্ণ বরাদ্দই পেয়ে আসছে, যেখানে রাজশাহী, রংপুর, কুমিল্লা ও সিলেটের মতো বড় শহর বরাদ্দের বাইরে রয়ে গেছে। একইভাবে হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলে কিছু বরাদ্দ বাড়লেও চরাঞ্চল বা পাহাড়ি এলাকাগুলোয় এক্ষেত্রে উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। বৈষম্যবিরোধী বাজেট প্রণয়নে অঙ্গীকারবদ্ধ সরকার থেকে বাজেট বরাদ্দে এ ধরনের বৈষম্য তাদের স্ববিরোধী আচরণের বহিঃপ্রকাশ। অথচ দেশে উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থার প্রচলন ও উন্মুক্ত স্থানে মলত্যাগ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা ও এর গুণগত মান সন্তোষজনক পর্যায়ে নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে (এইচআইইএস) অনুযায়ী, ৯২ দশমিক ৩২ শতাংশ পরিবারে উন্নত শৌচাগার সুবিধা রয়েছে। কিন্তু পানির গুণগত মান, স্যানিটেশন অবকাঠামো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট দুর্বলতাগুলো ওয়াশ খাতের উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আবার স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন স্ট্যাটিসটিকস (এসভিআরএস) ২০২৩-এ দেখা যায়, দেশের প্রায় ৭১ দশমিক ২২ শতাংশ মানুষের নিরাপদ পানীয় জলের সুবিধা থাকলেও বিভিন্ন গবেষণায় অনেক পানির উৎসেই ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা মলদ্বারা দূষণের ইঙ্গিত দেয়। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে পানির সংকট আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততার কারণে মিঠা পানির উৎসগুলো দূষিত হচ্ছে, ফলে নারী ও কিশোরীদের নিরাপদ পানি সংগ্রহে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় এবং এতে তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অর্থাৎ ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া দূষণ, লবণাক্ততার বিস্তার ও দুর্বল অবকাঠামো ওয়াশের ক্ষেত্রে পুরোপুরি সফলতা অর্জনের পথে বড় অন্তরায়। এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ওয়াশ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি এর যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি, যাতে সর্বস্তরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত হয়।

সরকারের উচিত শহর-গ্রাম, দুর্গম অঞ্চল ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মধ্যে ওয়াশ পরিষেবার বণ্টনে বৈষম্য দূর করা। নারী, কিশোরী, আদিবাসী ও দলিত জনগোষ্ঠীর বিশেষ প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায্য বাজেট কাঠামো নিশ্চিত করা। পানি ও স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যবিধি খাতে বাজেট বৈষম্য স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরির পাশাপাশি সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিতের প্রক্রিয়াকেও ব্যাহত করে। তাছাড়া বাজেট বরাদ্দে যে নিম্নমুখী প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে তা দেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দেয়। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি-৬) অনুযায়ী, বাংলাদেশকে সবার জন্য ‘সেফলি ম্যানেজড স্যানিটেশন’ নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের যৌথ পরিবীক্ষণ কর্মসূচি ২০২২ অনুযায়ী, বাংলাদেশ নিরাপদ ব্যবস্থাকৃত পানির কভারেজে ৫৯ দশমিক শূন্য ১ এবং নিরাপদ ব্যবস্থাকৃত স্যানিটেশনে ৩১ শতাংশে আছে। অর্থাৎ এখনো দেশের অর্ধেক অঞ্চল নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার বাইরে। এ লক্ষ্য পূরণে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক বিনিয়োগ ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ২০৩০ সালের মধ্যে বাকি অঞ্চলগুলোকে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার আওতায় আনতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন। যেখানে ওয়াশ খাতে আরো বিনিয়োগ প্রয়োজন, সেখানে বরাদ্দ কমে যাওয়াটা হতাশাজনক। বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে রাষ্ট্র তার নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে ওয়াশ খাতের বরাদ্দ কমানোর অর্থ হলো সরকারের অগ্রাধিকারে পিছিয়ে রয়েছে এ খাত। এতে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ছে। স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস (এসভিআরএস) ২০২২-এর তথ্যমতে, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির অভাবে বছরে প্রতি লাখে ১৬৭ জন মারা যায়।

নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে অপরিহার্য। উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখা প্রয়োজন, সুস্বাস্থ্য ছাড়া কখনো জনগণকে জনসম্পদে রূপান্তর করা যায় না। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী মানুষ যেমন নিজস্ব জীবনমান উন্নত করতে পারে, তেমনি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নেও সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। তাই এ খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও সঠিক নির্দেশনার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা সরকারের থাকতে হবে।