উপন্যাসটি এতটাই আবেগপ্রবণ যে গোটা ইউরোপে তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার হিড়িক পড়ে যায়। আত্মহত্যার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেল, আত্মহত্যার স্থানে গ্যেটের বইটি পাওয়া যাচ্ছে। যারা আত্মহত্যা করছেন তাদের বেশভূষাও উপন্যাসের আর্থারের মতো। ওই সময় সমাজবিজ্ঞানীরা অনুধাবন করলেন, আত্মহত্যা শুধু একটি ব্যক্তিগত সংকট নয়। এটি একটি সামাজিক সংকটও।
উন্নত বিশ্বে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে পর্যাপ্ত চিকিৎসা নিশ্চিত করার ফলে অনেক স্থানেই আত্মহত্যা নিম্নমুখী। কিন্তু বাংলাদেশে আত্মহত্যার হার এখনো তুলনামূলক বেশি। স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বাড়ছে আত্মহত্যার হিড়িক। তরুণদের আত্মহত্যার এ প্রবণতা নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে মানসিক চাপ, ভালোবাসার সম্পর্ককেন্দ্রিক জটিলতা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, বিষণ্নতা, মানসিক অবসাদ, আর্থিক সমস্যা ছাড়াও যৌন হয়রানিসহ বিভিন্ন ধরনের অপমানসূচক কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় আত্মহত্যার প্রবণতার কারণে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। তরুণ সমাজের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে ভালো কোনো উদ্যোগই টেকসই ও ফলপ্রসূ হবে না।
সম্প্রতি বেসরকারি সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশন এক জরিপে তরুণদের আত্মহত্যা প্রবণতার যে চিত্র তুলে ধরেছে তা উদ্বেগের। সংগঠনটির এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালে ৪০৩ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এর মধ্যে স্কুল পর্যায়ের ১৯০ জন, কলেজের ৯২, মাদ্রাসার ৮৮ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৭ জন। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সংখ্যা বেশি। সংগঠনের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৩-১৯ বছর বয়সীদের মধ্যেই এর প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। প্রতিবেদনটি পর্যবেক্ষণ করে আমরা অনুধাবন করেছি, আত্মহত্যার এ প্রবণতার পেছনে কাঠামোগত ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দুটো কারণই দায়ী। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ভয়াবহ প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে। সে তুলনায় মানবিক হতে পারেনি। প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ভালো ফল, অভিজাত প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, দ্রুত প্রতিষ্ঠা পাওয়ার মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষাই মানদণ্ড হয়ে ওঠে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে আসে আরো বড় পরিবর্তন।
অনেকে বলছেন প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপপ্রভাব এবং মেধা অনুযায়ী সম্মানজনক কর্মসংস্থানের ঘাটতি—সব মিলিয়ে তরুণ প্রজন্মের ওপর তৈরি হচ্ছে এক অদৃশ্য চাপ। সেই চাপ সামাল দিতে না পেরে কেউ কেউ বেছে নিচ্ছে চরম পথ। স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থী, কলেজগামী তরুণ-তরুণী বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী—তাদের বয়স অল্প, কিন্তু স্বপ্ন অনেক বড়। শিক্ষার্থী পরিচয় ধারণ করার ক্ষেত্রে তাদের বিভিন্ন পর্যায় পার করতে হয়। দীর্ঘদিনের হতাশা, অভিমান, পড়াশোনার চাপ, প্রেমঘটিত টানাপড়েন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, মানসিক অস্থিরতা, এমনকি যৌন নির্যাতনের মতো অভিজ্ঞতাও অনেকের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সে কষ্ট প্রকাশ পায় না। নীরবে সেই কষ্ট জমতে জমতে একসময় তা ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়।
অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং সেবা না থাকায় শিক্ষার্থীরা মনের কথা বলার নিরাপদ জায়গাও পায় না। শিক্ষাজীবন শেষে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ ও সামাজিক চাপ মানসিক বিষণ্নতা বাড়িয়ে তোলে। উচ্চশিক্ষা শেষে যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের অভাব তরুণদের হতাশ করছে। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, পরিবারের প্রত্যাশা ও সামাজিক তুলনা তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিস্থিতিকে আরো জটিল করছে। স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যা বাড়ার পেছনে সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন গেমিং এবং এমনকি অনলাইন জুয়ার প্রভাব রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের অভ্যাসটি আমাদের সমাজে এখনো ওইভাবে গড়ে ওঠেনি।
আত্মহত্যার মতো সমস্যা মোকাবেলায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। তরুণদের মধ্যে কর্মসংস্থান ও বেকারত্ব নিয়ে বাড়তি উদ্বেগ রয়েছে। বিষয়টি বিবেচনা করে মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী সম্মানজনক কর্মসংস্থান নিশ্চিতের জন্য রাষ্ট্রকে তদারকির দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার বয়সোপযোগী করার দিকেও নজর দিতে হবে। আত্মহননের প্রবণতা দেখা দিলে লোকলজ্জা না করে পেশাদার সহায়তা নেয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, আত্মহননের সিদ্ধান্ত হঠাৎ আসে না। প্রাথমিক পর্যায়ে কাউন্সেলিং ও পারিবারিক সমর্থন পেলে অধিকাংশ সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভরতা ও ব্যস্ততার কারণে প্রজন্মগত দূরত্ব বাড়ছে। অনেকে নিজেকে একা ভাবে। এক ধরনের অশ্রুত বোধ একসময় গভীর একাকিত্বে রূপ নেয়। এটিই হয়ে ওঠে বড় ঝুঁকি। এ ঝুঁকি বিবেচনায় পারিবারিক সহমর্মিতা বাড়ানো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর কাউন্সেলিং সেল চালু, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং শিক্ষাক্রমে জীবনদক্ষতা অন্তর্ভুক্তি অত্যন্ত জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় ছাড়া এ অদৃশ্য সংকট মোকাবেলা কঠিন হবে। আত্মহত্যা বিষয়ে আলোচনা এমনকি এ বিষয়ে তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে সংবেদনশীল হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের দায় বেশি। বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিখ্যাত কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে এবং সে খবর অনেক গুরুত্ব দিয়ে ছাপালে তার প্রভাব পড়ে সমাজে। অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যা প্রবণতা বেড়ে যায়। এসব বিষয় বিবেচনা করে আত্মহত্যার সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকেও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।
একজন শিক্ষার্থী প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে শিক্ষাজীবনে প্রবেশ করে। কিন্তু সে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে যখন সমন্বয় করতে পারে না, তখন সে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এছাড়া সামাজিক অস্থিরতা, বেকারত্ব ও সামাজিকভাবে স্বীকৃতি না পাওয়ায় সে একাকিত্বে ভোগে এবং আত্মহননের পথ বেছে নেয়। উন্নত দেশগুলোতে স্কুলের সিলেবাস অনুসরণ করে পড়াশোনার পাশাপাশি মানসিক কাউন্সেলিংও করানো হয়। আমাদের দেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেই ব্যবস্থা নেই। শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়) মানসিক কাউন্সেলিংয়ের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ দেয়া জরুরি। এ দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। আবার পরিবারকেও আলাদা দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ যখন কেউ আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি নিজেকে কোনো না কোনো ঘটনার জন্য দায়ী মনে করেন। তিনি নিজে অথবা অন্যকে সরাতে আত্মহত্যা করেন। এটা রোধ করার জন্য আমাদের পরিবার থেকে সমাজ পর্যন্ত সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রাথমিক পর্যায়ে হস্তক্ষেপ এবং কার্যকর প্রতিরোধকৌশল জীবন রক্ষাকারী হয়ে উঠতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া সর্বজনীন অধিকার। কিন্তু আমাদের দেশে এটিকে অনেকে বিলাসিতা ভেবে থাকেন। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যে বিলাসিতা নয় এ বিষয়টি সবাইকে বুঝতে হবে। এ দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যের সেবা দেয়ার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ও নার্সদেরও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সার্বিকভাবে প্রয়োজন সমন্বয়। এ সমন্বয়ই পারে সমাজে আত্মহত্যা প্রবণতা কমাতে।










