কোনো মৌসুমে কৃষিপণ্য উৎপাদন বেশি হলে এ থেকে সাধারণত কৃষকের আয় বেশি হওয়ার কথা। উদ্বৃত্ত পণ্য সংরক্ষণ করে অফ সিজনে পণ্য বাজারজাত করে ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আবার এতে অফ সিজনে নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের বাজারদরও স্থিতিশীল রাখা যায়। তবে এসব সম্ভব তখনই যখন সংরক্ষণ ব্যবস্থাও সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। তাছাড়া কৃষি উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো সংরক্ষণ। আর সংরক্ষণের কাজটি মূলত হিমাগারের মাধ্যমে করা হয়। তবে এবার উৎপাদিত কৃষিপণ্য, বিশেষত আলু হিমাগারে সংরক্ষণ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া ৬০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয় বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএসএ)। যদিও কৃষি বিপণন আইন ২০১৮ অনুযায়ী, কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পরামর্শক্রমে সরকারি গেজেটের মাধ্যমে হিমাগারের ভাড়া বৃদ্ধি বা নির্ধারণের নিয়ম। পরবর্তী সময়ে সরকারিভাবে ভাড়া ৬ টাকা ৭৫ পয়সা পুনর্নির্ধারণ করা হলেও কৃষকদের ভোগান্তি দূর হয়নি; লোকসানের আশঙ্কা রয়েই গেছে। কারণ এ বছর আলু আবাদ হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি জমিতে। উৎপাদন ১ কোটি ২০ লাখ টন ছাড়ানোর প্রাক্কলন রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই জোগান বেশি হলে বাজারদর নিম্নমুখী হয়। আলু উৎপাদন বেশি হওয়ায় এর দামও তাই নিম্নমুখী। এতে একদিকে আলুর বিক্রীত দামে কৃষকের উৎপাদন খরচও উঠে আসছে না। অন্যদিকে আগে ৭০ কেজির বস্তা ৩৫০ টাকায় রাখতে পারলেও এখন তা পারছেন না কৃষকরা। আবার অভিযোগ রয়েছে বর্তমানে ব্যবসায়ীরা হিমাগারে আলু সংরক্ষণের সুযোগ বেশি পাচ্ছেন। ফলে সংরক্ষণের ঝুঁকি না নিয়ে মাঠেই কম দামে আলু বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকরা। হিমাগারে সংরক্ষণ করতে না পেরে রাস্তায় আলু ফেলে প্রতিবাদের ঘটনাও ঘটেছে। সংরক্ষণের সুব্যবস্থাপনা না থাকায় আলু ছাড়া অন্য কৃষিপণ্যের বিক্রীত দামেও কৃষক তার উৎপাদন খরচ তুলতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, আলুর পাশাপাশি পেঁয়াজ, টমেটো, ফুলকপির দামও নেমে গেছে। কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ ১৪-১৫ টাকা। কিন্তু বর্তমানে ভরা মৌসুমে আলুর দাম খুচরা বাজারে কেজিতে ২০ টাকার নিচে নেমেছে। প্রতি কেজি টমেটো উৎপাদনে কৃষকদের ব্যয় হয়েছে ১২-১৩ টাকা। আর পণ্যটি রাজধানীর বাইরে বিক্রি হচ্ছে স্থান ও মানভেদে প্রতি কেজি ৮-১৮ টাকায়। পেঁয়াজের উৎপাদন ব্যয় কেজিতে ৩৮-৪০ টাকা হলেও কোনো কোনো স্থানে তা ৩৫ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে। এবার শীত মৌসুমে কৃষকরা ফুলকপিরও দাম পাননি। উৎপাদন খরচ ১০ টাকা হলেও ২-৩ টাকায় ফুলকপি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন তারা। এমনকি কোথাও বিক্রি না করে গরুকে খাওয়ানোর ঘটনার দেখাও মিলেছে। কৃষি অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, কৃষিপণ্যের মধ্যে নিত্যপণ্য হিসেবে চালের পরই আলুর অবস্থান। এর মূল্য পড়ে গেলে তা অন্যান্য কৃষিজাত ভোগ্যপণ্যের দামকে প্রভাবিত করবে।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, কৃষিপণ্যের উৎপাদন বেশি হওয়ায় হিমাগারে সংরক্ষণ ভাড়া বাড়ানোর মতো কারসাজি করা হচ্ছে। প্রভাবশালী হিমাগার মালিকরা আইন অমান্য করে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে হিমাগারের বাড়তি ভাড়া চাপিয়ে দিয়েছেন কৃষকের ওপর। এতে কৃষক উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না। এর মধ্যে ভাড়া বাড়ানোয় কৃষকের লোকসান আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থার সুযোগ নিতে পারে মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট। তারা কম দামে মাঠ থেকে কৃষিপণ্য সংগ্রহ করে মজুদ বাড়াতে চায়, যাতে সামনের দিনগুলোয় পণ্যগুলোর বাজারদর প্রভাবিত করতে পারে। আবার সংরক্ষণের অভাবে ফসল নষ্ট হয়ে গেলে আলু-পেঁয়াজের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্য আমদানির প্রয়োজন পড়তে পারে। এতেও মৌসুম শেষে কৃষিপণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে।

দেশের অর্থনীতির নানামুখী সংকটে নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের বাজারদর অস্থিতিশীল হওয়ার নজির সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সবাই প্রত্যক্ষ করেছে। বিশেষত গত নভেম্বরের শেষ দিকে পুরনো আলুর দাম কেজিতে ৭৫ টাকা ছাড়িয়ে যায়, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল। ২০২৩ সালের ২৩ নভেম্বর বাজারে আলুর কেজিপ্রতি মূল্য ছিল ৫০ টাকার মধ্যে। আলুর বাজারদর ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার পেছনে সে সময়ও অন্যতম দায় ছিল সরবরাহ সংকট ও হিমাগার পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধি। সে সময় কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, দেশী ও আমদানীকৃত আলুর দাম কোনো অবস্থায়ই ৩৫-৪০ টাকার বেশি হওয়ায় কথা না। মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের পাশাপাশি আরো অনেকেই আলুর বাজারদরে অস্থিতিশীলতা তৈরি হওয়ায় ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিকদের কারসাজিকে দায়ী করেছিলেন।

এ প্রেক্ষাপটে আবারো কৃষিপণ্যের জোগান সংকট ও বাজারদর অস্থিতিশীল হওয়ার যে আশঙ্কা রয়েছে তা এড়ানো কঠিন। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের উদ্যোগ প্রয়োজন, যা কৃষকের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। কৃষকের সুরক্ষায় কৃষিপণ্যের যেমন যৌক্তিক দাম নির্ধারণ প্রয়োজন, তেমনি সর্বনিম্ন দাম নির্ধারণও আবশ্যক। এজন্য কৃষি বিপণন অধিদপ্তরকে সক্রিয় করতে হবে। এছাড়া প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বিশেষ সংরক্ষণ সুবিধা দেয়া যেতে পারে। সরকার হিমাগারগুলোর একটা নির্দিষ্ট শতাংশ জায়গা প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সংরক্ষিত রাখার নীতি নিতে পারে, যাতে তারা কম খরচে পচনশীল পণ্য সংরক্ষণ করতে পারেন। কেজিপ্রতি ভর্তুকি দেয়াও হতে পারে একটি সমাধান। এতে কৃষকদের সংরক্ষণ ব্যয় অনেকটাই কমে আসবে। আর কখনই আকস্মিকভাবে যেন হিমাগারের ভাড়া না বাড়ে, সেটি নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক। পাশাপাশি কৃষি মন্ত্রণালয় বা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) সরাসরি ন্যায্য মূল্যে কৃষিপণ্য কিনে মজুদ করতে পারে, যাতে পরবর্তী সময়ে তা বাজারে সরবরাহ করে বাজারদরে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যায়। সেই সঙ্গে উদ্বৃত্ত যেকোনো পণ্য রফতানির জন্য সরকার সহজ শর্তে নীতিমালা ঘোষণা করতে পারে। মোট কথা, কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের সংরক্ষণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে সরকারের এগিয়ে আসা প্রয়োজন এবং এটি রাষ্ট্রের দায়িত্বও বটে। এতে কৃষকের স্বার্থ বজায় থাকবে এবং ভোক্তাও সহনীয় মূল্যে পণ্য কিনতে পারবে।