আবার খাদ্য উৎপাদনের বড় অংশও ভূমির ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে কৃষিপ্রধান দেশগুলোর জন্য। ফলে দক্ষ ভূমি ব্যবস্থাপনা ছাড়া এসব কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। এর উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশে কৃষিজমির সংখ্যা কমার বিষয়টি সামনে আনা যায়। আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইএফপিআরআই) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর শূন্য দশমিক ২ শতাংশ হারে কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। এর কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে কার্যকর ভূমি ব্যবস্থাপনার অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সম্প্রতি ভূমিসেবা মেলা ২০২৬-এর উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেও বিষয়টি উঠে এসেছে। তিনি উল্লেখ করেছেন ‘দেশের জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাথাপিছু জমির পরিমাণও কমে আসছে। ফলে জমির অর্থনৈতিক মূল্য যেমন বাড়ছে, তেমনি জমি নিয়ে বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা ও জটিলতাও বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব বিরোধ ব্যক্তি ও পরিবারের শান্তি নষ্ট করার পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও প্রতিবন্ধকতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় ভূমির পরিকল্পিত ব্যবহার, নির্ভুল রেকর্ড সংরক্ষণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা সময়ের অপরিহার্য দাবি।’ সরকারপ্রধানের এ উপলব্ধি কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকুক, সেটা প্রত্যাশা নয়। সরকার দক্ষ ভূমি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে যথাযথ উদ্যোগ নেবে সেটাই কাম্য। বিশেষ করে তিনি ওই অনুষ্ঠানে দুর্নীতি-হয়রানিমুক্ত, প্রযুক্তিনির্ভর ও নাগরিকবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করার যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন, সেগুলো বাস্তবায়ন হোক।

দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার বাস্তব চিত্র হলো স্বাধীনতার পর থেকে ভূমি সংস্কারের লক্ষ্যে কোনো সরকারের আমলে ফলপ্রসূ কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এ নিয়ে গত বছর বণিক বার্তায় একটি প্রতিবেদনও করা হয়েছিল। সে প্রতিবেদনে উঠে আসে অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন সংস্কার প্রয়াসেও অনুপস্থিত ছিল ভূমি সংস্কারের উদ্যোগ। মূলত গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে কোনো সরকারই ভূমির সংস্কারে হাত দেয়নি। কিছু আইন প্রণয়ন হলেও ভূমি মালিকানা কাঠামোয় কোনো কার্যকর পরিবর্তন যে আনা হয়নি সেই চিত্রই তুলে ধরা হয়েছিল। বিএনপি সরকার অতীতের এ চর্চা থেকে বেরিয়ে এসে টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলুক।

দেশের প্রায় ৫৬ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারের কোনো জমি নেই এবং মোট কৃষিজমির দুই-তৃতীয়াংশ মাত্র ১৫ শতাংশ পরিবারের হাতে কেন্দ্রীভূত। অথচ পৃথিবীর ইতিহাস বলে, ভূমির মালিকানা কাঠামো যে সমাজে কেন্দ্রীভূত থাকে, সেই সমাজে অর্থনৈতিক মুক্তি আসে না। মেক্সিকো, রাশিয়া, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, তাইওয়ান প্রতিটি দেশের রূপান্তরে পূর্বশর্ত হিসেবে কাজ করেছে ভূমি সংস্কার। দক্ষিণ কোরিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভূমি সংস্কারের মধ্য দিয়ে আধা-সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে দেয়। ফলে গ্রামীণ বৈষম্য কমে, কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ে এবং সেটিই পরবর্তীকালে দেশটির শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক উত্থানের ভিত্তি তৈরি করে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশ ভূমি মালিকানার বিকেন্দ্রীকরণ দূরের কথা, ভূমি সুরক্ষার জন্যও কার্যকর উদ্যোগের দিকে যেতে পারেনি। এ পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসুক। ভূমি মালিকানার কাঠামোগত প্রশ্নটির সমাধান হোক।

বাংলাদেশে যারা রাজনীতির মাঠে সক্রিয়, তাদের একটি বড় অংশই বড় ভূমির মালিক অথবা তাদের সঙ্গে স্বার্থের বিষয়টি যে জড়িত তা উপলব্ধি করা যায়। এ প্রেক্ষাপটে এটিও বোঝা যায় যে ভূমি সংস্কারের প্রশ্নটি এখানে শুধু নীতির প্রশ্ন নয়, ক্ষমতা কাঠামোর প্রশ্ন। তাই সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকারও প্রয়োজন ভূমি সংস্কারের জন্য।

বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন, দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪৫ শতাংশেরও বেশি কৃষি খাতে নিয়োজিত। কিন্তু তাদের বিপুল অংশের নিজের কোনো জমি নেই, অন্যের জমি বর্গা নিয়ে উৎপাদনের অর্ধেক মালিককে দিতে হয়। এ পরিস্থিতিতে কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো কঠিন, কৃষকের জীবনমানের উন্নতি অসম্ভব। খাদ্যনিরাপত্তার আলোচনায় প্রযুক্তি ও যন্ত্রায়ণের কথা আসে, কিন্তু কার জমিতে সেই প্রযুক্তি কাজ করবে, কে তার ফল পাবে সে প্রশ্নটি অনুপস্থিত থাকে। কৃষি অর্থনীতিবিদরাও এ বিষয়গুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন। ভূমি নিয়ে গবেষণা নেই, আলাপ নেই, নীতি নেই। অথচ এখনো জিডিপিতে প্রায় এক-চতুর্থাংশ অবদান রাখছে গ্রামীণ অর্থনীতি। তাই এ খাতকে উপেক্ষা করে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাস্তবিকই কঠিন।

যেসব দেশে ভূমি সংস্কার স্বেচ্ছায় ও পরিকল্পিতভাবে হয়েছে, সেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক স্থিতিশীলতাও এসেছে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, দেশে কোর্ট-কাছারিতে যত মামলা-মোকদ্দমা রয়েছে, তার সিংহভাগ ভূমিকে কেন্দ্র করেই। পরিবার, সমাজে যত বিবাদ তার বেশির ভাগের মূলেও রয়েছে ভূমি। এসব বিবাদের নিষ্পত্তি হওয়াটাও জরুরি। আবার সামাজিক সংকট হওয়ার পাশাপাশি এটি প্রশাসনিক সংকটেরও ফল। জমির মালিকানা, বণ্টন, রেকর্ড জটিলতা, নামজারি ও খাজনা-সংক্রান্ত দুর্ভোগ—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষকে বছরের পর বছর হয়রানির শিকার হতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মধ্যস্বত্বভোগী চক্র, দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক ধীরগতি। এগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, অনলাইন নামজারি, খতিয়ান ও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হবে।

তবে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু করাই যথেষ্ট নয়; এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও জরুরি। দেশের অনেক এলাকায় এখনো ডিজিটাল অবকাঠামো দুর্বল, ইন্টারনেট সুবিধা সীমিত এবং সাধারণ মানুষের প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতাও সমান নয়। ফলে অনলাইন সেবা বাস্তবে কতটা সহজলভ্য হচ্ছে তা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে ভূমি অফিসগুলোয় দুর্নীতি ও দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

পাশাপাশি সরকারকে ভূমির ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য ভূমির মালিকানা-সংক্রান্ত আইনি কাঠামো শক্তিশালী ও বাস্তবসম্মত করা জরুরি। বিদ্যমান ভূমি আইন পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। বিশেষ করে ভূমি সংস্কারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকের অধিকার নিশ্চিত করা এবং ভূমি পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে তাদের উৎপাদন ব্যবস্থায় সম্পৃক্ত করা।

একই সঙ্গে জমির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি। এজন্য গবেষণাভিত্তিক নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে ভূমি শুধু সম্পদ নয়, অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। তাই টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে ভূমি ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ও সমন্বিত নীতি গ্রহণ এখন অত্যন্ত জরুরি।