এর মধ্যে হাম শনাক্ত হয়ে মারা গেছে ৯৫ জন। সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা প্রায় হাজার। হামের সংক্রমণ এখন আর শুধু স্বাস্থ্য খাতের সংকটে সীমাবদ্ধ নয়, একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ অসংখ্য পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি করে চলেছে।

হামের প্রাদুর্ভাবের পেছনে কিছু গুরুতর অসংগতি রয়ে গেছে। সরকারিভাবে বছরের পর বছর বলা হচ্ছে, দেশে হামের টিকার কাভারেজ প্রায় ৯৯ শতাংশ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাই প্রশ্ন তুলছেন, প্রকৃতপক্ষে কাভারেজ এতটা বেশি হলে মৃত্যুর সংখ্যা এভাবে বাড়ার কথা নয়। বাস্তব তথ্য এ সংশয়কে আরো জোরালো করে। বছরের পর বছর সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় হাম-রুবেলা টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের কাভারেজ ৮৬-১০০ শতাংশের মধ্যে থাকলেও ২০২৫ সালে তা নেমে আসে প্রায় ৫৬-৬০ শতাংশে। অর্থাৎ সরকারি পরিসংখ্যান আর প্রকৃত মাঠপর্যায়ের চিত্রের বিস্তর ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এমনটি হামের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা অর্জনের পথে বড় বাধা। বণিক বার্তার প্রতিবেদনেই এক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচি ও হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির আওতায় থাকা শিশুর সংখ্যার মধ্যে ফারাক ৪৬ লাখ। অর্থাৎ ৪৬ লাখ শিশু এখনো টিকার বাইরে। এ সংখ্যাই বলে দেয় ৯৯ শতাংশ টিকা কাভারেজের দাবিটি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে অনেকাংশে সাংঘর্ষিক।

সরকারের তরফে বলা হয়েছিল, হাম-ইবোলার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি সম্পন্ন হওয়ার তিন-চার সপ্তাহ পরই এর প্রকোপ কমতে শুরু করবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এ রোগের প্রকোপ বেড়েই চলেছে। হামের প্রাদুর্ভাবের পেছনে কাঠামোগত ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব একটি বড় কারণ। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সময়ে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম বারবার ব্যাহত হয়েছে। সাধারণত প্রতি চার বছর অন্তর যে হাম-রুবেলা গণটিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালিত হওয়ার কথা, তা এবার সময়মতো হয়নি। সর্বশেষ এমন কর্মসূচি হয়েছিল ২০২০ সালে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের কারণে সরবরাহে বিলম্ব। উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে যাওয়ার সিদ্ধান্তে টিকা কেনার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়ে টিকাদান কর্মসূচি থমকে যায়। এসব মিলিয়ে সামগ্রিক কাভারেজে যে ধস নেমেছে, তারই পরিণতি এখন দেখা যাচ্ছে হাসপাতালের ওয়ার্ডে, শিশুমৃত্যুর ক্রমবর্ধমান তালিকায়।

প্রশ্ন হচ্ছে, টিকার কাভারেজ সম্পূর্ণ করার পরও কেন এমনটি হয়েছে। মূলত কাঠামোগত ঘাটতির পাশাপাশি সচেতনতার অভাবও পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক অভিভাবক শিশুর অবস্থা গুরুতর না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালমুখী হন না। তাই চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয়ে যায় এবং জটিলতা বেড়ে মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো—বিশেষত ইউনিয়ন ও কমিউনিটি পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ ও দ্রুত রেফারের ব্যবস্থা দুর্বল থাকায় রোগ নিয়ন্ত্রণেও বিলম্ব হচ্ছে। সামগ্রিকভাবেই হাম একটি জটিল সমস্যায় রূপ নিয়েছে। সরকার এখনই এ বিষয়ে কার্যকর সমন্বয়মূলক ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরো নাজুক হতে পারে। বন্যা পরিস্থিতিতে এরই মধ্যে ডায়রিয়া, আমাশয়ের মতো পানিবাহিত রোগ বেড়ে চলেছে। সামনে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়ার শঙ্কাও রয়েছে। এমন সময়ে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়তে থাকলে স্বাস্থ্য খাতের ওপর ভয়াবহ চাপ তৈরি হবে।

বিদ্যমান সংকট মোকাবেলায় সবার আগে প্রয়োজন সরকারি পরিসংখ্যান ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় আনা। ৯৯ শতাংশ কাভারেজের দাবি নিয়ে সন্তুষ্ট না থেকে প্রকৃত ঘাটতি চিহ্নিত করে তা প্রকাশ্যে স্বীকার করাই কার্যকর নীতির প্রথম শর্ত। এর ভিত্তিতে বিশেষ ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন চালিয়ে টিকাবঞ্চিত প্রায় ৪৬ লাখ শিশুকে দ্রুত চিহ্নিত করে টিকার আওতায় আনতে হবে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির নাগাল সীমিত যেসব স্থানে অর্থাৎ পার্বত্যাঞ্চল, চরাঞ্চল, চা বাগান ও উপকূলীয় এলাকার মতো দুর্গম জনগোষ্ঠীর জন্য ভ্রাম্যমাণ টিকাদান দল গঠন করা জরুরি। একই সঙ্গে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে রোগ নজরদারি ও রেফারেল ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। এতে আক্রান্ত শিশু প্রাথমিক পর্যায়েই চিহ্নিত হয়ে দ্রুত চিকিৎসা পায়। জটিলতা ও মৃত্যুহার কমাতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুযায়ী ভিটামিন ‘এ’ সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদে টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে এমনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে, যাতে প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে সরবরাহে বিলম্ব বা কর্মসূচি স্থবির হয়ে না পড়ে। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানোও জরুরি, যাতে অভিভাবকরা সময়মতো টিকা নেন এবং লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান।

হাম একটি সহজে প্রতিরোধযোগ্য রোগ। টিকা যেখানে সহজলভ্য ও কার্যকর সমাধান, সেখানে একের পর এক শিশুর মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। সরকারি কাভারেজের পরিসংখ্যান আর বাস্তবতার মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত মেটাতে না পারলে সাম্প্রতিক এ ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আরো বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নেবে। এখনই প্রয়োজন সমন্বিত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ—যেখানে পরিসংখ্যানের চেয়ে শিশুর জীবন রক্ষাই হবে মূল অগ্রাধিকার।