বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যালান্স অব পেমেন্ট (বিওপি) সংক্রান্ত সর্বসাম্প্রতিক পরিসংখ্যান জানাচ্ছে যে চলতি অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে দেশে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) ও মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমেছে যথাক্রমে ২৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ ও ২৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। বিষয়টি উদ্বেগজনক হলেও ধারণা-বহির্ভূত নয়। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে দেশের প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেভাবে বহুলাংশে মব দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে তাতে করে এমনটি হওয়া মোটেও অস্বাভাবিক নয়। বস্তুত এ হচ্ছে স্থানীয় বিনিয়োগের প্রতি সরকারের ধারাবাহিক উপেক্ষা ও এর বিপরীতে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের একতরফা অবাস্তব প্রচেষ্টারই ফল। কিন্তু এটি তো সর্বজনবিদিত যে নির্ভরযোগ্য আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সংবলিত স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও স্থানীয় বিনিয়োগে দৃশ্যমান গতিশীলতা না থাকলে হাজারো প্রণোদনা বা অন্য কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়েই বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব নয়। অথচ সরকার সেটিই করার চেষ্টা করছে।
প্রণোদনা দিয়ে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য সরকার গত ২৯ মে অর্থ উপদেষ্টাকে আহ্বায়ক করে উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করেছে। সরকারের এরূপ অস্বাভাবিক উদ্যোগকে ঘিরে একসঙ্গে অনেকগুলো প্রশ্নের অবতারণা ঘটেছে, যেগুলোর জবাব পাওয়া খুবই জরুরি। এক. বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য রাষ্ট্রের আওতায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান (বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিডা) থাকা সত্ত্বেও এ বিষয়ে নতুন করে কমিটি গঠনের প্রয়োজন হলো কেন? দুই. বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে সর্বাগ্রে স্থানীয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গতিশীলতা আনয়নের চেষ্টা না করে প্রণোদনা দিয়ে হলেও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের অর্থহীন চেষ্টা কোন প্রয়োজনে? তিন. বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের অন্যতম পূর্শবর্ত যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, সেদিকে অধিকতর মনোযোগী না হয়ে জনগণের সম্পদে বিদেশীদের প্রণোদনাদানের ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ দেখানোর কারণ কী? চার. উল্লিখিত গুরুতর প্রশ্নগুলো সামনে থাকা সত্ত্বেও সেসবকে উপেক্ষা করে যুক্তিহীনভাবে প্রণোদনার প্রতি ঝুঁকে পড়ার পেছনে বিশেষ কোনো বিদেশী কোম্পানিকে বিশেষ কোনো সুবিধাদানের উদ্দেশ্য নেই তো?
প্রথমেই আসা যাক প্রথম প্রশ্নে, অর্থাৎ বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বিডার আওতায় নিয়মিত কার্যক্রম অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও এ ক্ষেত্রে নতুন করে কমিটি গঠনের কেন প্রয়োজন হলো? এ প্রসঙ্গে তথ্য হিসেবে উল্লেখ করা দরকার যে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে বিডা সেই ১৯৮০-এর দশকের গোড়া থেকেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে (শিল্প অধিদপ্তর, বিনিয়োগ বোর্ড বা বিওআই, বিডা ইত্যাদি) নানা মাত্রার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাতে সাফল্যের চেয়ে প্রচারের মাত্রাই সম্ভবত অধিক এবং তার চেয়েও অধিক এ বাবদ অর্থ ব্যয়ের পরিমাণ। আর বৈদেশিক বিনিয়োগসংক্রান্ত গত সাড়ে চার দশকের অগ্রগতি বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের ফলাফল বলছে: ক. স্থানীয় বিনিয়োগের তুলনায় এ ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের হার অনেক কম; খ. লব্ধ মুনাফার একটি বড় অংশই পুনর্বিনিয়োগ না হয়ে অন্য দেশে চলে যাচ্ছে; গ. স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের তুলনায় বিদেশী বিনিয়োগকারীরা অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা ও প্রণোদনা ভোগ করছে এবং ঘ. বিদেশী বিনিয়োগকারীরা যত দ্রুত বিভিন্ন বিনিয়োগ-সেবা পেয়ে থাকেন, সে তুলনায় স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা তা পান অনেক দেরিতে অথবা তারা তা আদৌ পানই না। এতসব ঘটনার পরও এক্ষেত্রে যদি বাড়তি অগ্রগতি সাধন করতে হয়, তাহলে সেটি বিডার বিদ্যমান কার্যক্রমে দক্ষতা ও গতিশীলতা আনয়নের মাধ্যমেই করতে হবে। হঠাৎই অর্থনৈতিক যুক্তি-বহির্ভূত প্রণোদনা বৃদ্ধির মাধ্যমে নয়। এ অবস্থায় কেউ যদি এর উদ্দেশ্যের সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অথবা এটিকে অর্থনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে বিচক্ষণতার ঘাটতি হিসেবে দেখেন তাহলে এজন্য তাকে বা তাদের মোটেও দোষ দেয়া যাবে না।
এবার আসা যাক দ্বিতীয় প্রশ্নে, অর্থাৎ ম্রিয়মাণ ও সমস্যাসংকুল স্থানীয় বিনিয়োগের প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়ে প্রণোদনা দিয়ে হলেও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা কতটুকু বাস্তবসম্মত? এটা তো বিশ্বজনীন প্রমাণিত অভিজ্ঞতা যে কোনো দেশের স্থানীয় বিনিয়োগ পরিস্থিতি যথেষ্ট গতিশীল না হলে বা সেখানে শিল্প ও ব্যবসাসংক্রান্ত যথেষ্ট কর্মতৎপরতা না থাকলে কোনো বিদেশী উদ্যোক্তাই সে দেশে বিনিয়োগে উৎসাহ দেখায় না। এ অবস্থায় বাংলাদেশের স্থানীয় বিনিয়োগ পরিস্থিতিকে এক রকম নাজুক অবস্থায় রেখে অঢেল প্রণোদনা জোগালেই কি বিদেশী উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আসবে? বিদেশীরা যখন দেখবে যে বাংলাদেশের স্থানীয় উদ্যোক্তারাই যেখানে স্বেচ্ছায় সে দেশে বিনিয়োগ করেছে না, তখন কোন ভরসায় তারা এখানে বিনিয়োগ করতে চাইবে? আসলে তারা তা চাইছেও না। বিষয়টি যে সরকারের বাকপটু নীতিনির্ধারকরা বোঝেন না, এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। তা সত্ত্বেও কেন তারা স্থানীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়টিকে ক্রমাগত উপেক্ষা করে যাচ্ছেন, তা সত্যি এক রহস্যময় ব্যাপার বৈকি! তার চেয়েও অধিক রহস্যময় ঘটনা হচ্ছে, খোদ প্রধান উপদেষ্টা বিডার চেয়ারম্যান হওয়া সত্ত্বেও অত্র দপ্তরের আওতাধীন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের কৌশল নির্ধারণের জন্য অন্য উপদেষ্টাদের নিয়ে কমিটি গঠনের বিষয়টি। তাহলে কি বিডার চেয়ারম্যান বা নির্বাহী চেয়ারম্যান এ দপ্তরের কাজের ব্যর্থতার দায় এড়ানোর জন্য এর কিছুটা হলেও অন্যের ঘাড়ে চাপাতে চাইছেন?
তৃতীয় প্রশ্ন, ধারাবাহিকতাপূর্ণ স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি বৈদেশিক বিনিয়োগের অন্যতম পূর্বশর্ত হলেও দেশকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিয়মিত রাজনৈতিক সরকার ব্যবস্থার অধীনে ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে এতদিন পর্যন্ত আগ্রহের যে ঘাটতি ছিল, সেটি কেন? তবে এ নিয়ে দেশে যে রাজনৈতিক বিতর্ক বিরাজমান রয়েছে, সে আলোচনাকে এর বাইরে রেখে এখানে বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রসঙ্গে শুধু এটুকু বলব যে দেশে একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো নিষ্ঠাবান দায়িত্বশীল বিদেশী কোম্পানিই বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আসবে না বা তা আসার কোনো কারণও নেই। সে ক্ষেত্রে বাড়তি প্রণোদনা দিয়ে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ-চেষ্টার পেছনকার কারণ হতে পারে: হয় লোকজনকে দেখানো যে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য সরকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কিংবা প্রমাণের চেষ্টা করা যে বাড়তি বৈদেশিক বিনিয়োগ সংগ্রহের জন্য নতুন নেতৃত্বাধীন বিডা বহুমাত্রিক তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত অথবা এমনও হতে পারে যে বিশেষ কোনো বিনিয়োগকারীকে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে সুবিধাদানের জন্য এটি করা হচ্ছে।
তবে কারণ যাই হোক না কেন, এটি প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায় যে দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে প্রণোদনা বাড়িয়ে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ধারণা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। তাহলে এ বিষয়ে যে কমিটি গঠন করা হলো তারা কী করবে? তারা এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন অবশ্যই দেবে। তবে সে প্রতিবেদনে কী থাকবে, আমরা কেউই তা জানি না। বস্তুনিষ্ঠতাকে গুরুত্ব দিলে এমনও হতে পারে যে কমিটি হয়তো এটাই বলবে যে প্রণোদনা বাড়িয়ে এ মুহূর্তে দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই বা এ ধারণা বাস্তবায়নযোগ্যও (ফিজিবল) নয়, যেমনটি অত্র নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সেখানে যা কিছুই বলা হোক না কেন, তা নিয়ে এ ক্ষেত্রে নতুন করে আশাবাদী হওয়ার কিছু নেই। আর তাই কমিটির কাছে অনুরোধ, দেশে স্থানীয় ও বৈদেশিক উভয়বিধ বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার যে সাধারণ মানুষের ভাত-কাপড়ের মতোই জরুরি, সেটি যেন তারা তুলে ধরেন। আর সে প্রতিবেদনে তারা যেন এটাও বলার চেষ্টা করেন যে বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের জন্যই সর্বাগ্রে স্থানীয় বিনিয়োগকে জোরদার করার চেষ্টা করতে হবে।
আবু তাহের খান: সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), শিল্প মন্ত্রণালয়










