বাংলাদেশে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে আমি দুটো দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করি। প্রথমত, জুলাই-আগস্টের গণ-আন্দোলন, তার পরের গণ-অভ্যুত্থান, সরকারের পতন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেয়া, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির টানাপড়েন—সব মিলিয়ে দেশে একটা দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। সে অস্থিরতা কেবল অর্থনীতি বা নিরাপত্তার কারণে না, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক স্পেস সংকুচিত থাকারও ফল। এ প্রেক্ষাপটে একটা অন্তত গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই ছিল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে ফেরার তুলনামূলকভাবে বৈধ পথ।
হ্যাঁ, আমি মোটেও বলছি না যে এ নির্বাচন শতভাগ গ্রহণযোগ্য বা নিখুঁত। তবে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের ভোটের তুলনায় এটি স্পষ্টভাবেই তুলনামূলক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক। বিদেশী সাংবাদিক এসেছে, দেশী ও বিদেশী পর্যবেক্ষক এসেছে, গণমাধ্যম তুলনামূলক স্বাধীনভাবে মাঠ কভার করেছে। আওয়ামী লীগ ছাড়া প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দলই অংশ নেয়ার সুযোগ পেয়েছে। অন্যদিকে, জাতীয় পার্টিকে ঘিরে সরকারের কিছু পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ, আবার আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখা। এগুলো ভবিষ্যতে প্রশ্ন তুলবেই। তবু বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এ নির্বাচনকে আমি এক ধরনের ‘ট্রানজিশন নির্বাচন’ হিসেবে দেখি, যেখানে পথ একেবারে পরিষ্কার না, কিন্তু এগোনোর মতো আর কোনো বাস্তব বিকল্পও চোখে পড়ছে না।
এখন পর্যন্ত যা দেখলাম, তাতে মনে হয়েছে প্রশাসন তুলনামূলকভাবে সক্রিয় থেকেছে এবং নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেছে। এ নিরপেক্ষতা কতটা ছিল, সেটা আসলে ভালোভাবে বোঝা যাবে ফল ঘোষণা, ভোট গণনা এবং সে প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছভাবে সামনে আসে তার ওপর নির্ভর করে। একটি বিষয় স্পষ্ট, সেনাবাহিনী মাঠে গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য রক্ষার ভূমিকা নিয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উপজেলা নির্বাচন কিংবা অনেক সিটি করপোরেশন নির্বাচনে যেমন সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়, তার তুলনায় এ জাতীয় নির্বাচনে এখন পর্যন্ত সহিংসতা তুলনামূলক কম। এর পেছনে প্রশাসনের সক্রিয়তা ও সেনাবাহিনীর উপস্থিতি—দুটোই কাজ করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকটাই নির্ভর করবে ভোটার টার্নআউটের ওপর। যদি দেখা যায় খুব কম মানুষ ভোট দিয়েছে, তাহলে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন থাকবে। আবার যদি অন্তত ৫০ শতাংশের মতো অংশগ্রহণ হয়, তাহলে বর্তমান বাস্তবতায় এটাকে অন্তত ‘রক্ষা পাওয়া’ এক ধরনের গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বলা যায়।
বাংলাদেশে আমাদের একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংস্কৃতি আছে: যে দল হারে, সে ফলাফল পুরোপুরি মেনে নিতে চায় না। কখনো প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে অভিযোগ, কখনো ভোট কারচুপির অভিযোগ, কখনো নানা শব্দ ব্যবহার করে পুরো প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা। এবারো সে প্রবণতা দেখা যেতে পারে, এটাই আমাদের বাস্তবতা। তবে আমার আশা, এ সংকটময় সময়ে অন্তত বিজয়ী ও পরাজিত উভয় পক্ষ বুঝবে যে গণতন্ত্র মানে শুধুই জেতার রাজনীতি না, হারের পরও দায়িত্ব থাকে।
আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারণা খুব স্পষ্ট: সরকারের কাজ শাসন করা, আর বিরোধী দলের কাজ সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কিন্তু ১৯৯০ সালের পর আমরা দেখেছি, আওয়ামী লীগ সরকারে থাকলে বিএনপি সংসদ বর্জন করেছে, আর বিএনপি সরকারে থাকলে আওয়ামী লীগ বর্জন করেছে। ফলে সংসদ রাস্তার রাজনীতির তুলনায় গুরুত্ব হারিয়েছে, আলাপ-আলোচনার প্রধান মঞ্চ হওয়ার বদলে অনেক সময় প্রতীকী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এ নির্বাচন–পরবর্তী সময়ে আমি চাই বিজয়ী ও বিরোধী দল দুপক্ষই অন্তত এ জায়গায় পরিবর্তন আনুক। সংসদকে কেন্দ্র করেই রাজনীতি হবে, রাস্তাকে নয়; হরতাল, অবরোধ, কেবল উচ্চ গলায় বক্তব্যের বদলে প্রস্তুতি নিয়ে সংসদে গিয়ে বিতর্ক হবে।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বিজয়ী জোটের প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ হবে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করা এবং উল্লাস বা প্রতিশোধের নামে যেন কোনো রাজনৈতিক সহিংসতা না হয়, তা ঠেকানো। বাংলাদেশের সমাজ এরই মধ্যে অনেক ধরনের সহিংসতার অভিজ্ঞতা নিয়ে ক্লান্ত। প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে এনে ‘রিভেঞ্জ পলিটিকস’ বন্ধ করা নতুন সরকারের নীতিগত পরীক্ষাও বটে। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, কারা সরকার গঠন করবে, সে টিমটি কীভাবে গড়া হয়। যদি শুরুতেই দেখা যায় যোগ্য, নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও প্রশাসনিক দক্ষতাসম্পন্ন মানুষ দায়িত্ব নিচ্ছে, তাহলে সমাজে এক ধরনের নৈতিক আশাবাদ তৈরি হবে, যা এ কঠিন সময়ে খুব প্রয়োজন।
পরাজিত দলের দায়িত্বও কম না। তারা যদি আবার পুরনো প্যাটার্নে ফিরে গিয়ে অকারণ বর্জন, লাগাতার অচলাবস্থা আর কেবল বক্তৃতাকেন্দ্রিক বিরোধিতার পথে হাঁটে, তাহলে তারা জনগণের সঙ্গেই দূরত্ব তৈরি করবে। আমার প্রত্যাশা, পরাজিত দলও সংসদে তাদের শক্ত উপস্থিতি দেখাবে, বিষয়ভিত্তিক সমালোচনা করবে, বিকল্প প্রস্তাব দেবে এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে দায়িত্বশীল আলোচনায় অংশ নেবে।
সবশেষে, আমি এ নির্বাচনকে নিখুঁত কিছু হিসেবে দেখি না। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটাকে একটা প্রয়োজনীয় ধাপ মনে হয়, যার মাধ্যমে আমরা হয়তো আবার নির্বাচিত গণতন্ত্রের পথে ফিরতে পারি। যারা সরকারে থাকবে আর যারা বিরোধীতে থাকবে, উভয় পক্ষ যদি একে অন্যেকে শত্রু হিসেবে না দেখে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে, সংসদকে আবার কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে পারে, তাহলে হয়তো ধীরে ধীরে এমন এক বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে, যেখানে মতবিরোধ থাকবে, কিন্তু সে মতবিরোধ শান্তিপূর্ণ ও রাজনৈতিক উপায়ে মীমাংসা করার ন্যূনতম সংস্কৃতিটা ফিরে আসবে। আমার প্রত্যাশা, এ নির্বাচনে সে পথচলার শুরু হোক।
আসিফ বিন আলী: জিওপলিটিক্যাল অ্যানালিস্ট ও ডক্টরাল ফেলো, জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি










