বাইরে থেকে যেমনই দেখা যাক, ভিত শক্ত হলে ভবন দুর্যোগ সামলাতে পারে। আর দুর্বল হলে সামান্যতেই ঘটতে পারে বিপর্যয়। দেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা যেন অনেকটা তেমনই। অর্থমন্ত্রীর বাজেট ঘোষণায় আছে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন, বিনিয়োগনির্ভর উন্নয়ন, শিল্পায়নের উচ্চাশা, কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু অর্থনীতির ভিত্তি যে ব্যাংক খাত, তা বহুদিনের অনিয়ম, খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও সুশাসনের সংকটে ক্রমে ভঙ্গুর হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ব্যাংকনির্ভর। দেশের পুঁজিবাজারের গভীরতা কম, বন্ড মার্কেট এখনো শিশুকাল পার করছে, আর দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস খুবই সীমিত। ফলে শিল্প, বাণিজ্য, আমদানি, রফতানি, কৃষি, এসএমই, ভোক্তা অর্থায়ন, এমনকি সরকারের বাজেট ঘাটতির বড় অংশও ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল।

দেশের ব্যাংক খাতের সম্পদ জিডিপির প্রায় ৫০ শতাংশ। সেই সম্পদের ৮৫ শতাংশই আবার ঋণ ও বিনিয়োগ। সরকারও ব্যাংক থেকে অর্থ নেয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতির প্রায় ৪৬ শতাংশ অর্থ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে আসার কথা। ব্যাংক খাত দুর্বল হলে শুধু ব্যাংকাররা বিপদে পড়েন না, রাষ্ট্রের আর্থিক কাঠামো, ব্যবসার সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাও চাপে পড়ে।

এ সংকটের গভীরতা বোঝার জন্য কিছু সংখ্যার উপস্থাপনই আজ যথেষ্ট। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। মূলধন পর্যাপ্ততার হার নেমেছে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন পর্যায়ের একটি। জিডিপির তুলনায় বেসরকারি ঋণের অনুপাত মাত্র ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশ, গত এক যুগের মধ্যে সর্বনিম্ন।

ব্যাংক ব্যবস্থার প্রাণ হলো আস্থা। ভল্টে যত টাকা আছে, তার চেয়ে বড় সম্পদ হলো মানুষের বিশ্বাস। একজন আমানতকারী যখন ব্যাংকে টাকা রাখেন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের সততা, দক্ষতা ও স্থিতিশীলতার ওপর আস্থা রেখেই স্বাক্ষর করেন। সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরলে ব্যাংক সংকট তৈরি হয়।

বিশ্বের অভিজ্ঞতা আমাদের বারবার সতর্ক করেছে। জাপানের হারানো এক দশক, এশীয় আর্থিক সংকট, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক বিপর্যয়, সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, ব্যাংকের দুর্বলতা শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থনীতির গতি থামিয়ে দেয়। আইএমএফের গবেষক লুক লেভেন ও ফাবিয়ান ভ্যালেন্সিয়ার ১৫১টি ব্যাংক সংকট নিয়ে গবেষণায় দেখিয়েছেন, কোনো দেশে মোট ঋণের ২০ শতাংশের বেশি খেলাপি হয়ে গেলে বা ব্যাংক বাঁচাতে সরকারের ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলে সেটি গুরুতর সংকটের লক্ষণ। ব্যাংক সংকট শুরু হলে গড়ে প্রতি বছর জিডিপির প্রায় ৭ শতাংশ সমপরিমাণ উৎপাদন ক্ষতি হয়; সংকট সামলাতে সরকারের ব্যয় দাঁড়ায় গড়ে জিডিপির ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকের ভুলের দাম শেষ পর্যন্ত জনগণই দেয়। সেটা কখনো করের মাধ্যমে, কখনো মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে, কখনো বা চাকরি হারানোর মাধ্যমে।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের আজকের দুরবস্থা কি হঠাৎ করে তৈরি হয়েছে? মোটেই না। বহু বছরের রাজনৈতিক প্রভাব, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের দায়মুক্তি, দুর্বল তদারকি, পরিচালনা পর্ষদে অযোগ্যতা, ঋণ পুনঃতফসিলের অপব্যবহার, এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নানা চাপ মিলেই ব্যাংক খাতকে ধীরে ধীরে দুর্বল করেছে। একসময় ব্যাংক ছিল সঞ্চয়কে বিনিয়োগে রূপান্তরের কারখানা। আর এখন? অনেক ব্যাংক পুরনো ক্ষত ঢাকতেই ব্যস্ত, বিনিয়োগ করবে কোথা থেকে, যেখানে আমানতকারীর টাকাই ফেরত দিতে পারছে না! এ সংকটের একটা বড় উৎস রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো। সরকারি ব্যাংকগুলো ব্যাংক খাতের প্রায় ২৭ শতাংশ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে, যা জিডিপির প্রায় ১২ শতাংশের সমান। অথচ সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৪৬ শতাংশ। জনতা ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে সরকারের ভূমিকা, বেসিক ব্যাংকের দীর্ঘস্থায়ী ভঙ্গুরতা এবং কয়েকটি বেসরকারি ইসলামী ব্যাংকের গভীর দুর্দশা মিলিয়ে পুরো ব্যাংক ব্যবস্থা আজ ভারসাম্য হারানোর ঝুঁকিতে আছে। এ ভঙ্গুরতার মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ঘিরে নতুন সংকট পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকিং স্থাপত্যের প্রধান স্তম্ভ। প্রায় ১ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকার আমানত, ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার ঋণ ও বিনিয়োগ, ৫৯ হাজার ৬১৪ কোটি টাকার আমদানি, ৩১ হাজার ৫০৪ কোটি টাকার রফতানি, ২০২৫ সালে ৭৬ হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্স এবং প্রায় তিন কোটি গ্রাহক; এ পরিসর কোনো সাধারণ ব্যাংকের নয়। এর খেলাপি ঋণও প্রায় ৯৪ হাজার ৩২২ কোটি টাকা। দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংক একাই ব্যাংক খাতের ৮ দশমিক ৭ শতাংশ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে, যা জিডিপির প্রায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশের সমান। এমন একটি প্রতিষ্ঠান অস্থির হলে তা শুধু একটি ব্যাংকের নিজস্ব সমস্যা হিসেবে সীমায়িত থাকে না, হয়ে ওঠে সিস্টেমিক ঝুঁকি। ভবনের একটি প্রধান পিলারে ফাটল ধরলে স্থপতিরা শুধু সেই পিলারটিই দেখেন না, পুরো ভবনেরই ভারসাম্য পরীক্ষা করে থাকেন। ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও সেটি জরুরি।

সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে আমানত উত্তোলন, রাজনৈতিক টানাপড়েন, পরিচালনা ও মালিকানা নিয়ে বিভ্রান্তি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা চাওয়ার ঘটনা বাজারে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এক সপ্তাহে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত উত্তোলনের খবর, সিআরআর চাপ, জনসমক্ষে প্রতিবাদ, গ্রাহকের উৎকণ্ঠা এবং চেক ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্টে চাপ, সব মিলিয়ে সংকটের রূপ স্রেফ অভ্যন্তরীণ নয়।

প্রথম ঝুঁকি হলো মানুষের আস্থাহীনতা। ব্যাংক খাতে আতঙ্ক যুক্তির চেয়ে দ্রুত চলে। একজন গ্রাহক যখন শাখার সামনে লম্বা লাইন দেখেন, তিনি তখন ব্যালান্স শিট পড়েন না, নিজের সঞ্চয় নিয়ে ভাবেন। এভাবে একটি ব্যাংকের ভীতি অন্য ব্যাংকেও ছড়াতে পারে। বিশেষ করে আমানতকারীরা অনেক সময় পৃথক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা আলাদা করে বিচার করেন না, তারা পুরো ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থাকেই একসঙ্গে দেখেন। ফলে ইসলামী ব্যাংকের সংকট অন্য ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোতেও চাপ তৈরি করতে পারে।

দ্বিতীয় ঝুঁকি আন্তঃব্যাংক বাজারে, যেহেতু ব্যাংকগুলো একে অন্যের ওপর নির্ভর করে। আজ যার উদ্বৃত্ত তারল্য আছে, সে অন্য ব্যাংককে দেয়; কাল তার নিজের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু কোনো ব্যাংককে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে অন্য ব্যাংক তার সঙ্গে লেনদেন কমিয়ে দেয়। এর ফলে বাজারে তারল্য শুকিয়ে যায়, সুদের হার বা মুনাফার হার অস্থির হয়, দুর্বল ব্যাংক আরো দুর্বল হয়ে পড়ে।

তৃতীয় ঝুঁকি পেমেন্ট ও সেটেলমেন্ট ব্যবস্থায়। ইসলামী ব্যাংক জাতীয় পেমেন্ট অবকাঠামোর গভীরে যুক্ত। চেক ক্লিয়ারিং, ইএফটিএন, আরটিজিএস, এটিএম, পস, করপোরেট পেমেন্ট, এসব ক্ষেত্রে কোনো বড় ব্যাংকের চাপ পুরো ব্যবস্থায় ঢেউ তোলে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের চেক ফেরত বাড়ে, ইএফটিএন বিলম্বিত হয়, বা সেটেলমেন্ট ব্যালান্স নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়, তাহলে ব্যবসায়ীরা শুধু সেই ব্যাংকই নয়, পুরো পেমেন্ট সিস্টেমের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করেন।

চতুর্থ ঝুঁকি রেমিট্যান্সে। ইসলামী ব্যাংক দেশের অন্যতম বৃহৎ রেমিট্যান্স গ্রহণকারী ব্যাংক। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে এর শক্তিশালী উপস্থিতি আছে। প্রবাসী শ্রমিকরা যদি ব্যাংকের স্থিতিশীলতা নিয়ে সন্দিহান হন, রেমিট্যান্সের একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে চলে যেতে পারে। এতে বৈধ পথে ডলার প্রবাহ কমবে, রিজার্ভে চাপ বাড়বে, টাকার মান দুর্বল হবে এবং আমদানি ব্যয় বাড়বে। এর অভিঘাত শেষ পর্যন্ত বাজারে মূল্যস্ফীতি হিসেবে ফিরে আসবে।

পঞ্চম ঝুঁকি বাণিজ্য অর্থায়নে, আমদানি-রফতানি শুধু পণ্য আনা-নেয়ার কাজ নয়; এর পেছনে থাকে এলসি, গ্যারান্টি, বৈদেশিক ব্যাংকের আস্থা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারের বিশ্বাস। ইসলামী ব্যাংকের ইস্যু করা এলসি বা গ্যারান্টি নিয়ে যদি বিদেশী ব্যাংক বা সরবরাহকারীরা দ্বিধায় পড়ে, তাহলে কাঁচামাল আমদানি, রফতানি আয় প্রত্যাবাসন এবং শিল্প উৎপাদনে বাধা আসতে পারে। এতে পোশাক, খাদ্য, নির্মাণ, জ্বালানি, কৃষি-ইনপুটসহ বহু খাতে প্রভাব পড়বে।

ষষ্ঠ ঝুঁকি হলো ঋণ সংকোচন। তারল্য চাপে থাকা ব্যাংক স্বাভাবিকভাবেই নতুন ঋণ দেয়ার বদলে আমানত রক্ষা ও নগদ ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেয়। এতে ব্যবসা, এসএমই, ট্রেড ফাইন্যান্স, কৃষি ও ভোক্তা ঋণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থনীতির ইঞ্জিন তখন জ্বালানি পায় না। নতুন বিনিয়োগ কমে, কর্মসংস্থান থেমে যায়, উৎপাদন খরচ বাড়ে।

সপ্তম ঝুঁকি নৈতিক বিপদ বা মোরাল হ্যাজার্ড। যদি অনিয়ম, ঋণ অপব্যবহার, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতার দায়মুক্তি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের যথাযথ জবাবদিহি না হয়, তাহলে বাজারে বার্তা যায় যে ক্ষমতাবানদের শাস্তি নেই। তখন ব্যাংক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। সৎ ঋণগ্রহীতা নিরুৎসাহিত হন, অসৎ ঋণগ্রহীতা সাহস পান।

এ সংকটের মূল প্রশ্ন তাই তারল্য সহায়তা নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজন হলে তারল্য দিতে পারে; কিন্তু তারল্য ইনজেকশন হলো জ্বর কমানোর ওষুধ, রোগ সারানোর চিকিৎসা নয়। রোগ হলো সুশাসনের অভাব, মালিকানা ও পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাব, ঋণ বিতরণে পক্ষপাত, দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহির ঘাটতি।

সমাধানও তাই বহুমাত্রিক হতে হবে।

প্রথমত, ব্যাংককে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, ব্যাংক কোনো দলের কার্যালয় নয়, কোনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত কোষাগার নয়, কোনো প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতার নিরাপদ আশ্রয় নয়। ব্যাংক জনগণের আমানতের রক্ষক।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও পেশাদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপে সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে বাজারে আস্থা ফিরে আসে না। তদারকি, পরিদর্শন, শাস্তি, পুনর্গঠন, একীভূতকরণ, অবসায়ন, সব ক্ষেত্রেই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তথ্যভিত্তিক ও নিরপেক্ষ হতে হবে।

তৃতীয়ত, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, দেরি করলে খরচ বাড়ে। আজ যে ক্ষত অস্ত্রোপচারে সারানো যায়, কাল তা অঙ্গচ্ছেদের পর্যায়ে যেতে পারে। দুর্বল ব্যাংককে দীর্ঘদিন কৃত্রিম শ্বাসে রেখে দিলে ভালো ব্যাংকও আক্রান্ত হয়।

চতুর্থত, আমানত সুরক্ষা কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে। সাধারণ আমানতকারীর আস্থা রক্ষাই ব্যাংক স্থিতিশীলতার কেন্দ্র। মানুষকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে, তাদের সঞ্চয় নিরাপদ। তবে একই সঙ্গে বড় ঋণখেলাপি, দুর্বল পরিচালক, অনিয়মকারী ব্যবস্থাপনা এবং সুবিধাভোগী গোষ্ঠীকে দায়মুক্তি দেয়া যাবে না।

পঞ্চমত, শক্তিশালী ব্যাংক সংস্কার কমিশন প্রয়োজন। বাংলাদেশে সর্বশেষ ব্যাংক সংস্কার কমিশন হয়েছিল প্রায় তিন দশক আগে। এরপর বহুবার ঘোষণা এলেও বাস্তবায়ন হয়নি। এখন আর ঘোষণার সময় নেই; এখন কাজের সময়। অর্থনীতিবিদ, অভিজ্ঞ ব্যাংকার, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞ, করপোরেট গভর্ন্যান্স বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পেশাজীবীদের নিয়ে নিরপেক্ষ কমিশন গঠন জরুরি।

ষষ্ঠত, খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার। পুনঃতফসিলের সহজ রাস্তা বন্ধ করতে হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ও প্রকৃত ব্যবসায়িক ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতার মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। সম্পদ পুনরুদ্ধার, দেউলিয়াত্ব আইন, ঋণ আদালত, জামানত বাস্তবায়ন এবং ব্যাংক রেজল্যুশন কাঠামোকে কার্যকর করতে হবে।

বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক রূপান্তরের এক কঠিন সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে। একদিকে উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে ভঙ্গুর আর্থিক ভিত্তি। একদিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন, অন্যদিকে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। একদিকে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধির ঘোষণা, অন্যদিকে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির ঐতিহাসিক নিম্নগতি। এ বৈপরীত্য দূর না করলে উন্নয়নের ভাষণ কাগজেই পড়ে থাকবে।

ইসলামী ব্যাংকের সংকট সেই বৃহত্তর সত্যকে সামনে এনেছে। বর্তমান সংকট বাংলাদেশের আর্থিক স্থাপত্যেরই সতর্কঘণ্টা। এখন যদি দৃঢ়, স্বচ্ছ, পেশাদার ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া যায়, তাহলে সংকটকে পুনর্গঠনের সুযোগে বদলে দেয়া সম্ভব। আর যদি দেরি হয়, যদি রাজনৈতিক হিসাব অর্থনৈতিক বিচারের ওপর চেপে বসে, যদি দোষীদের রক্ষা করা হয়, তাহলে এ সংকট শুধু ব্যাংক খাত নয়, পুরো অর্থনীতির ভিত্তিকেই কাঁপিয়ে দিতে পারে।

ভবন ভেঙে পড়ার আগে দেয়ালে সূক্ষ্ম ফাটল দেখা যায়। প্রকৌশলীরা সেই ফাটল দেখেই মেরামত শুরু করেন। অদূরদর্শী মালিক শুধু রঙ করে ঢেকে রাখেন। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের দেয়ালে ফাটল আর সূক্ষ্ম নেই, রীতিমতো দৃশ্যমান। এখন প্রশ্ন হলো—আমরা কি ভিত্তি মেরামত করব, নাকি রঙিন ব্যানারে স্বপ্ন লিখে পরবর্তী কম্পনের জন্য অপেক্ষা করব?

আশানুর রহমান: ব্যাংকার ও কথাসাহিত্যিক