ওই সময় থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবসায়িক খাতের যাত্রা শুরু। এখন আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানির যে অবস্থা দেখছি সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। আমি জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর বিষয়ে কথা বলতে চাচ্ছি না। কারণ উত্তরটা সবারই মুখস্থ। আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরের দিকেই এগোতে হবে।
এক্ষেত্রে একটি ছোট ডেটা দিই। বৈশ্বিক টোটাল পাওয়ার জেনারেশনের প্রায় ৪৯ শতাংশই আসছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত থেকে। অন্য জ্বালানির ক্ষেত্রে তা ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশের জ্বালানির ক্ষেত্রে সেটি আড়াই থেকে ৩ শতাংশ। আর টোটাল ইনস্টলেশনে ৫ শতাংশ। অর্থাৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার খুবই নগণ্য পর্যায়ে আছে। তাই যখন আমরা বুঝি যে আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরের দিকেই যেতে হবে তখন আমাদের সামনে একটিই প্রশ্ন দাঁড়ায়। আমরা কীভাবে যাব?
আমি মূলত শিল্প খাতের আঙ্গিকে আলোচনা করছি। এ কনক্লেভেই একজন উপস্থিত রয়েছেন যাকে ১৮০ মেগাওয়াটের একটি প্লান্ট দেয়া আছে। সেটার এলওআই করা হয়েছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেও আলাপ এসেছে, এ বিষয়ে নজর দেয়া হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। এখন পর্যন্ত এ খাতে অনেকগুলো টেন্ডার আহ্বান হয়েছে। আইপিপিতে প্রায় ৫৫টি টেন্ডার হয়েছে। তাও বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আসছেন না। এর মূল কারণ পেমেন্ট গ্যারান্টি নেই। ব্যাংক উপযোগী নথি নেই। অনেক বিনিয়োগকারীর সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়। কিন্তু বিনিয়োগ আকর্ষণ ও ব্যবহারের সুযোগ এখনো তৈরি হয়নি।
পিপিপি অর্থাৎ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের প্রসঙ্গে আসা যাক। এটা দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রক্রিয়া। এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ পিপিপি হয়েছে এমন কোনো উদাহরণ আমাদের সামনে নেই। সেটি কবে আসবে তাও আমাদের জানা নেই। অর্থাৎ এখানেও বিনিয়োগের সুযোগ নেই। এরপর রয়েছে এমপিপি বা মার্চেন্ট পাওয়ার প্লান্ট। এ প্রসঙ্গে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল। তিনিই জানিয়েছেন এসএলডি বা সিঙ্গেল লাইন ডায়াগ্রাম এমনকি হুইলিং চার্জ পর্যন্ত এখনো নিশ্চিত হয়নি। এ বিষয়ে কিছুদিন আগেই একটি আইন হয়েছে, তবে প্রক্রিয়াগতভাবে তা শেষ হয়নি।
এসবের পরও সোলার হোম সিস্টেম ও রুফটপ নিয়ে অনেক আলাপ হয়েছে। অনেক বড় লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। কৌশলপত্র হয়েছে। বাজেটও দেয়া হয়েছে। সেখানে বলা হলো জিরো ট্যাক্স। বাজেটেও ঘোষণা দেয়া হলো এ খাতে শূন্য কর থাকবে। কিন্তু কয়েকদিন ধরেই আমরা বিএসআরইএর ওয়েবসাইটে একটি তথ্য প্রচার করছি। আগে সোলার জেনারেশন সেট হিসেবে আনতাম। সেখানে আমাদের ১ শতাংশ শুল্ক দিতে হতো। অর্থাৎ ১ শতাংশ ইন্ডাস্ট্রি আইআরসিতে ক্যাপিটাল মেশিনারি হিসেবে আনার সুযোগ ছিল। সেটা এখন ১৭ শতাংশে এসে ঠেকেছে। এ কনক্লেভে উপস্থিত একজনের প্রসঙ্গ টানতে পারি। তিনি কিছুদিন আগে রেক্সো মডেলে সেট আনতে গিয়েছিলেন। তাকে ১৭ শতাংশ শুল্ক দিয়েই তা আনতে হয়েছে। ওখানে ১৫ শতাংশ শুল্কের সঙ্গে ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) যুক্ত করা হয়েছে। শুল্কের বিষয়টি বোঝা গেল। কিন্তু অগ্রিম আয়কর কেন? নীতিনির্ধারকদের তরফে বলা হয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে যে প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করবে তাদের করছাড় সুবিধা দেয়া হবে। আগামী ১০ বছরের জন্য কর পুরোপুরি মওকুফ করা হবে। এসব কথার পরও অগ্রিম আয়কর কেন দিতে হবে?
আসলে এ বিষয়গুলো খুবই জটিল। এখন যদি আলাপ তোলা হয়, এ পলিসি কনক্লেভে উপস্থিত ব্যবসায়ীদের মধ্যে অন্তত ৫০ জন এ খাতে বিনিয়োগ করবেন কিনা। সেটি যত দ্রুত সম্ভব। কিন্তু তাদের বিনিয়োগের জায়গা আসলে কোথায়? কোন প্রকল্পেই বা বিনিয়োগ হবে? এ প্রশ্নের উত্তর কি কেউ দিতে পারবেন? একটি সম্ভাবনার জায়গা ছিল। সেটা ছাদের ওপর। রুফটপ ইন্ডাস্ট্রির মালিকরা নিজ পয়সায় এ উদ্যোগ নিচ্ছিলেন। সেখানেও বাধা দেয়া হলো। কারণ ১৫ শতাংশ ভ্যাট আর ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর। এ ধরনের কর কাঠামো দিয়ে শেষ পর্যন্ত আমরা কোন দিকে এগোচ্ছি?
পলিসি কনক্লেভে একটি প্রেজেন্টেশন দেখানো হয়েছে। সেখানে তিনটি ক্ষেত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আমাদের কয়লা আছে কিন্তু তা উত্তোলনের পরিকল্পনা নেই। কবে তা উত্তোলন হবে, কীভাবে হবে তার দিকনির্দেশনা বা পরিকল্পনা নেই। গ্যাসের ব্লকগুলোতে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। কবে নাগাদ তা আসবে আর কতটুকু গ্যাস পাব তার লক্ষ্যমাত্রা নেই। সোলার একটি ভালো উৎস। বায়ুবিদ্যুতেরও সুযোগ আছে। এগুলোকে কাজে লাগানো যায়। কিন্তু নীতিমালার মাধ্যমে এগুলোকে আমরা আটকে দিচ্ছি।
এভাবে জ্বালানি রূপান্তর করা একেবারেই অসম্ভব। অন্তত এমন নীতিমালার মাধ্যমে। শিল্প খাতের দৃষ্টিকোণ থেকেই বলছি, এমনটি সম্ভব নয়। এজন্য দুটো জিনিস জরুরি। প্রথমত, একটি সমন্বয় দরকার। সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ভাবনা থাকতে হবে, এটা করা হবেই। এ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে বলতে পারলে ভালো হয়। বাস্তবতা ভিন্ন। এক জায়গায় শূন্য করের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আবার পরবর্তী সময়ে ‘তবে শর্ত থাকে যে’ এমন নীতিমালা দিয়ে রাখা হয়েছে। তাই কেউ আর এ নীতিমালায় যুক্ত হতে পারছেন না।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি পণ্যের দাম কমানোর কথা বলা হয়েছে। ট্যাক্স বাড়ানো হয়েছে। ফলে কোনো কোম্পানি এখন দাম কমাবে এমনটি আশা করা যায়? অনেকেই সোলারের দাম নিয়ে কথা বলে যান। এ নিয়ে কারো হয়তো অভিযোগও থাকতে পারে। কিন্তু কর বাড়ালে কি সোলারের দাম কমতে পারে?
আমরা কেউই এ জায়গাটিতে লক্ষ করছি না। একটি সমন্বিত প্রক্রিয়ায় না গেলে আর সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে জ্বালানি রূপান্তর আখেরে হবে না। আর নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে আমাদের যে লক্ষ্য সেটিও বাস্তব রূপ দেয়া সম্ভব হবে না। গোটা বিশ্বের দিকেই তাকানো যাক। এখন সবই উন্মুক্ত। আমাদের সমুদ্র উপকূলটির দিকে তাকানো যাক। এখানে বড় আকারে অফশোর সোলার করা সম্ভব। আমার অফশোর উইন্ডের সুযোগ আছে। এ জায়গাগুলো নিয়ে কোনো ধরনের গবেষণা আমাদের নেই। অথচ এসব ক্ষেত্রে সম্ভাবনা অনেক। আমি এমনও দেখেছি সমুদ্রে ১ হাজার মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ প্লান্ট করা হয়েছে।
এসব জায়গায় সুনির্দিষ্ট ও সদিচ্ছা নিয়ে না এগোলে হবে না। সরকার যদি এসব ক্ষেত্রে ধীরগতিতে এগোয় তাহলে কী হবে? জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না করায় শিল্প খাতের বড় ক্ষতি হবে। সম্প্রতি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে সমস্যা দেখা দিয়েছে। এ এলএনজির জন্য গাড়িগুলোর দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। এমনটি তো বাস্তবতা। এমন সমস্যা ক্রমেই বাড়তে থাকবে। এজন্যই সমন্বিত ও সাহসী উদ্যোগ এখন বেশি দরকার। সেগুলো বাস্তবায়নের দৃঢ় ইচ্ছাও থাকা জরুরি। কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয়ে মনোযোগ দিয়ে দ্রুত সমাধান করতে হবে।
এ সবকিছু বাদেও আরেকটি বিষয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যদি এগিয়ে না আসে তাহলে সামাজিক আন্দোলন গড়বে না। এটা এখন আমাদের বেশি জরুরি। কিছু একটা হতেই হবে। তবু আমাদের হচ্ছে না। সাগর থেকে কখন আমাদের গ্যাস আসবে, কয়লা কোথা থেকে উত্তোলন করা হবে সেটার একটা হিসাব করা যেতেই পারে। এগুলো লাগবে। তবে সুযোগ এ মুহূর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে। গোটা বিশ্ব এ সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে ভুল করেনি। আমরা একা ভুল করে যাচ্ছি কিনা সেটা এখন প্রশ্ন। আমাদের এজন্যই এগোতে হবে এবং সুযোগগুলোকে কাজে লাগাতে হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগকারী নেই এমনটি বলা যাবে না। প্রতিদিনই আমাদের সঙ্গে বিদেশ থেকে বিনিয়োগকারীরা আলাপ করেন। কিন্তু তাদের কোনো প্রজেক্ট দেয়া যায় না। প্রজেক্টই নেই, তাদের দেয়া হবে কীভাবে? সুযোগই বা কোথায়? নেই তো। আইপিপি, এমপিপি বা পিপিপি—কোনো ক্ষেত্রেই তো বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হয়নি। তাহলে বিনিয়োগ আসবে কোথা থেকে?
মোস্তফা আল মাহমুদ: সভাপতি, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)
[বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]










