সম্প্রতি বণিক বার্তার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিন দশকে প্রায় দুই হাজার মিটারের বেশি সৈকত এলাকা সমুদ্রগর্ভে হারিয়েছে। ফলে জোয়ারের সময় হাঁটার মতো বেলাভূমি থাকে না। এমনকি সৈকত রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) জিও টিউব ও জিও ব্যাগনির্ভর সমাধানও সমুদ্রের ঢেউ ও জোয়ারের তীব্রতা মোকাবেলায় উপযোগী নয়। এ কারণে সৈকতজুড়ে তৈরি হয়েছে বিপজ্জনক গর্ত। এমনকি শ্যাওলাযুক্ত জিও ব্যাগে পা পিছলে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকরা। এ বিষয়ে সতর্কতামূলক কোনো ব্যবস্থা নেই। কোটি কোটি টাকা ব্যাগে জিও ব্যাগ রিফিল করলেও তা অল্প সময়ে ফেটে কার্যকারিতা হারাচ্ছে। স্থায়ী সমাধানের বদলে বারবার অস্থায়ী পদ্ধতিতে অর্থ ব্যয় সামগ্রিক উপকূলীয় ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা। এ ব্যর্থতার জন্য কুয়াকাটার পর্যটন অর্থনীতি, দুর্যোগ মোকাবেলা সক্ষমতার পাশাপাশি উপকূলবাসীর জীবন-জীবিকার ওপরও ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে দ্রুত দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক উপকূল ব্যবস্থাপনা গড়তে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলে এ কাজটি কঠিন হবে না।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত জলোচ্ছ্বাস, উচ্চ জোয়ার ও ঘূর্ণিঝড় প্রবণতার কারণে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে ভাঙন বাড়ছে। সৈকতসংলগ্ন ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংস ও বেড়িবাঁধের কিছু অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে। অর্থাৎ প্রাকৃতিক ও কাঠামোগত উভয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই এখানে দুর্বল। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের জন্য বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। এমন বাস্তবতায় বেলাভূমির প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্ষয় হতে থাকা মানে দুর্যোগকালে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সুরক্ষার প্রথম স্তরটিই ভেঙে পড়া। এককালে বৃহত্তর সুন্দরবনের অংশ গঙ্গামতি সংরক্ষিত বন প্রাকৃতিক ঢাল হয়ে সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাত প্রশমিত করত। বনটির ক্রমাগত বিলুপ্তি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা ব্যবস্থা ক্ষয়ের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য শুধু সতর্কসংকেত বা আশ্রয় কেন্দ্র গড়লেই চলে না। উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণেও বাড়তি মনোযোগ দিতে হয়। সমুদ্রসৈকত ভাঙনের ফলে শুধু পর্যটকরাই নন, স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনেও দুর্ভোগ বাড়ছে। ভাঙা স্থাপনার কংক্রিট ও রড সৈকতজুড়ে ছড়িয়ে থাকায় অনেকের নিত্যদিনের চলাচল ও মাছ ধরার কাজও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। বেড়িবাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো থেকে জলোচ্ছ্বাসের সময় লোকালয়ে লবণাক্ত পানি ঢোকার আশঙ্কা বাড়ায়। উপকূলীয় ভাঙন একটি ধীরগতির দুর্যোগ—এর প্রভাব রাতারাতি দৃশ্যমান হয় না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা ভূমিহীনতা, জীবিকা হারানো ও অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের জন্ম দেয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প ও বরাদ্দের ঘোষণা শোনা গেলেও বাস্তবে টেকসই উদ্যোগের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
এদিকে কুয়াকাটার আঞ্চলিক অর্থনীতি সরাসরি পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। হোটেল, পরিবহন, মৎস্যজীবী সম্প্রদায় এমনকি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা নানাভাবে এ খাতে অবদান রাখেন। বেলাভূমি সংকুচিত হলে, নিরাপত্তার অভাব বাড়লে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে পর্যটকপ্রবাহ কমা স্বাভাবিক। এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, সমুদ্রসৈকতের ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কাঠামো বিক্ষিপ্ত পদক্ষেপ নিচ্ছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, কক্সবাজারের আদলে কুয়াকাটাকেও একটি একক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতায় আনা গেলে পর্যটন খাতে সেবার মানোন্নয়ন, শৃঙ্খলা রক্ষা ও সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত সম্ভব। তবে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর অভাব ও সুপরিকল্পিত বেসরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে না পারায় কুয়াকাটার আঞ্চলিক অর্থনীতি থেকে বিপুল রাজস্ব আহরণের সুযোগ হারাতে হচ্ছে।
কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের সংকট এড়াতে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল পক্ষকে অস্থায়ী মেরামতের চক্র থেকে বেরোতে হবে। এজন্য সমুদ্র উপযোগী প্রকৌশল নকশার মাধ্যমে সমুদ্রতীর সুরক্ষার উপযোগী কাঠামো গড়তে হবে। এক্ষেত্রে ভারতের তামিলনাড়ু বা কর্ণাটকের ধাঁচে আধুনিক গ্রোয়েন বাঁধ কিংবা নেদারল্যান্ডসের ‘বিচ নওরিশমেন্ট’ পদ্ধতি যাচাই করে একটি বাস্তবায়নযোগ্য মডেল তৈরি করার কথা ভাবা যেতে পারে। এছাড়া প্রস্তাবিত ৭৫৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকার ডিপিপি দ্রুত ভেটিং সম্পন্ন করে অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় আনতে হবে। সিদ্ধান্তহীনতায় সময় নষ্ট করা যাবে না। ম্যানগ্রোভ ও গঙ্গামতির মতো সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষা দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে সাশ্রয়ী ভাঙন-প্রতিরোধক কৌশল। পর্যটন কার্যক্রম ব্যাহত না করে সৈকতের নির্দিষ্ট অংশে কৌশলগত বনায়ন এবং খাসজমি উদ্ধার করে দ্রুত বর্ধনশীল বনাঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ বাড়াতে হবে। এমনকি স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি অর্থাৎ কক্সবাজারের আদলে একটি একক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা যেতে পারে। কারণ বর্তমানে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে বিভক্ত থাকায় জবাবদিহির জায়গা অস্পষ্ট থেকে যাচ্ছে।
জিআইএস ও রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভাঙনপ্রবণ ‘হটস্পট’ চিহ্নিতকরণের যে গবেষণা চলছে, তার ফলাফল নীতিনির্ধারণে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যুক্ত করতে হবে। দুর্যোগ মোকাবেলা পরিকল্পনায় উপকূলীয় ভূমিক্ষয়ের হারকে একটি স্থায়ী সূচক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এখানে বরাদ্দ ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হবে তথ্যের ভিত্তিতে, রাজনৈতিক বা মৌসুমি চাপের ভিত্তিতে নয়। সমন্বয়মূলক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলে সম্প্রদায়কে সরাসরি যুক্ত করতে হবে। এভাবে প্রকল্পগুলো রক্ষণাবেক্ষণে তারা নিজেরাই এগিয়ে আসবেন। অবিলম্বে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, বিপজ্জনক গর্ত চিহ্নিতকরণ ও জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা স্থাপন করে পর্যটক ও স্থানীয়দের তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ কাজটির জন্য বেশি ব্যয় হওয়ার কথা নয়। প্রশাসনিক সদিচ্ছা থাকলে অবিলম্বেই তা বাস্তবায়ন সম্ভব।
কুয়াকাটার ভাঙন কোনো বিচ্ছিন্ন স্থানীয় সমস্যা নয়, এটি বাংলাদেশের উপকূলীয় ব্যবস্থাপনা নীতির জন্য পরীক্ষা ক্ষেত্র। এখানকার সংকটগুলো কুয়াকাটার গণ্ডি ছাড়িয়ে পুরো উপকূলীয় বেল্টের জন্য প্রাসঙ্গিক। সরকার এরই মধ্যে ‘পায়রা-কুয়াকাটা কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান’ ও সংশ্লিষ্ট অ্যাকশন এরিয়া প্ল্যানের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে দুর্যোগ মোকাবেলা ও পরিবেশ সংরক্ষণের আঙ্গিক বিবেচনায় এগুলোকে দৃষ্টিভঙ্গিতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রয়োজন দ্রুত, স্বচ্ছ ও তদারকিযুক্ত বাস্তবায়ন। প্রকৃতি যে গতিতে কেড়ে নিচ্ছে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া তার চেয়ে ধীর হলে কুয়াকাটার মানচিত্র সংকুচিত হতেই থাকবে। এর মূল্য শুধু পর্যটন রাজস্বে নয়, মানুষের নিরাপত্তা ও জীবিকা দিয়েও পরিশোধ করতে হবে।










