কয়েক বছর ধরেই জলবায়ু বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া আর
ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে
নানা ধরনের দূষণ। তবে এর মধ্যে বিগত বছরগুলোয় বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সবচেয়ে
ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বায়ুমান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের মানদণ্ড অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বাতাসের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের
নাম উঠে আসে। আর প্রতিদিনকার বাতাসের মান হিসাব করা হলে প্রথম তিনটি শহরের মধ্যে প্রায়ই
ঢাকার নাম চলে আসে। বিশেষজ্ঞরা এ বায়ুদূষণের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন।
এর মধ্যে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো: গাড়ির দূষিত কালো ধোঁয়া।
দেখা যাচ্ছে, ঢাকার রাস্তায় যেসব গাড়ি
চলছে তার বেশির ভাগই মেয়াদোত্তীর্ণ।
গত বছর ডিসেম্বরে এ নিয়ে বিবিসি বাংলা প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বুয়েটের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান
কথা বলেন। তিনি জানান, ঢাকার ৭০ শতাংশ বাসেরই অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল (ইকোনমিক লাইফ) শেষ,
এগুলো মেরামত করে ঠিকঠাক করার মতো পর্যায়েও নেই। উন্নত বিশ্বে একটি বাসের আয়ুষ্কাল
ধরা হয় ১০-১৫ বছর; এরপর এগুলো সড়ক থেকে সরিয়ে ফেলা হয়।
এ তো গেল গণপরিবহনের কথা, ব্যক্তিগত যানবাহনের
ক্ষেত্রেও বিষয়টি সমানভাবে আশঙ্কাজনক। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের এ বছরের এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৬০
লাখ ৫৮ হাজারেরও বেশি; অথচ এর মধ্যে নিবন্ধিত বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) সংখ্যা মাত্র ২৫০টি।
দেশের সড়ক বিভাগের ‘বাংলাদেশ ইলেকট্রিক
মোবিলিটি রোডম্যাপ’ অনুযায়ী, দেশের ১৫ শতাংশ কার্বন নিঃসরণের পেছনে আমাদের পরিবহন খাত
দায়ী। এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত প্যারিস চুক্তির অধীনে বেশকিছু
অঙ্গীকার করে সরকার। এর মধ্যে জলবায়ু
বিপর্যয় মোকাবেলা এবং পরিবেশবান্ধব
উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের পরিবহন খাতে কার্বন নিঃসরণ ৩ দশমিক ৪ মিলিয়ন টন কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আর এ
অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হলে দেশে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ বিদ্যুচ্চালিত যানবাহন (ইভি) চলাচল
নিশ্চিত করতে হবে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এবিএম আমিন উল্লাহ নুরী জানান,
বর্তমানে দেশে বিক্রি হওয়া জ্বালানি তেলের ৬৩ শতাংশই পরিবহন খাতে ব্যবহৃত হয়। একই সঙ্গে এ অনবায়নযোগ্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর থেকে নির্ভরতা কমিয়ে আনতে চেষ্টা করে যাচ্ছে
সরকার।
অথচ সরকারের অঙ্গীকার ও পরিকল্পনার
সঙ্গে নীতি ও প্রয়োগের কিছুটা অসামঞ্জস্য
রয়েছে। আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির ওপর আমদানি শুল্কহার ৮৯ শতাংশ
ধরা হচ্ছে। অথচ আমাদের পাশেই নেপালে এ হার ১০-৬০ শতাংশ, পাকিস্তানে ২৫ শতাংশ, থাইল্যান্ডে
৪০ শতাংশ। ভারতে স্থানীয় বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি উৎপাদন
শিল্পের স্বার্থ সুরক্ষায় আমদানি শুল্ক শতভাগ রাখা হলেও স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বা বিনিয়োগের
শর্তসাপেক্ষে এ হার মাত্র ১৫ শতাংশ ধরা হয়। এ অতিরিক্ত আমদানি শুল্কহারের কারণে সরকারের
২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ ইভি নিশ্চিত করার লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
পরিবেশের সুরক্ষা ও জলবায়ু বিপর্যয়
মোকাবেলায় বিশ্বের অনেক দেশই নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর
গাড়ির ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে। ইভির ক্ষেত্রে বলা যায়, স্ক্যান্ডিনেভীয় কল্যাণ রাষ্ট্র নরওয়ে এক্ষেত্রে বেশ ইতিবাচক উদাহরণ
তৈরি করেছে। ২০১৩ সালে দেশটিতে মাত্র ৬
দশমিক ১
শতাংশ ইভি গাড়ি ছিল, যার পরিমাণ ২০২৩ সালে বেড়ে হয় ৯০ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে এর পেছনে নরওয়ে সরকারের কিছু নীতিগত
সিদ্ধান্ত ও প্রচেষ্টা বেশ কার্যকরভাবে কাজে লেগেছে। যেমন ওই দেশে ইভি কেনা বা আমদানির
ক্ষেত্রে কোনো ট্যাক্স নেই; ১৯৯৬-২০২১ পর্যন্ত কোনো রোড ট্যাক্স ফি দেয়া লাগত না, ১৯৯৭-২০২১
পর্যন্ত কোনো রোড টোল প্রযোজ্য ছিল না; ২০০৯-১৭ পর্যন্ত ফেরি পারাপারে কোনো চার্জ ছিল
না, ২০১৭ সালের পর থেকে অর্ধেক
ফেরি চার্জ। আরো সুযোগের মধ্যে
রয়েছে—শহর এলাকায় বিনামূল্যে পার্কিং, বাসের
লেন ব্যবহার করার সুবিধা, ইভি কেনার ক্ষেত্রে ২০০১ সাল থেকে ২৫ শতাংশ ভ্যাট ছাড় ইত্যাদি।
প্রায় কাছাকাছি পরিমাণ ট্যাক্স ছাড় ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ইউরোপের প্রায় সব দেশই প্রয়োগ করেছে।
তবে বাংলাদেশও এরই মধ্যে বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিআরটিসি
(বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন) ৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচটি ইভি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে রয়েছে ১০০টি ডাবল ডেকার এসি বাস কেনা, ২০০টি সিঙ্গেল ডেকার এসি বাস কেনা এবং ৫৫টি চার্জিং স্টেশন স্থাপন।
দেশে বর্তমানে ১৬টি চার্জিং স্টেশন রয়েছে। আরো বেশ কয়েকটি চার্জিং স্টেশন স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। তবে
এখনো এগুলোর তেমন
চাহিদা তৈরি হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সমস্যা দুই দিকেই। একটি হলো চার্জিং
স্টেশনের অপ্রতুলতা ছিল বলে আসেনি। এখন চার্জিং স্টেশন করা হচ্ছে। কিন্তু সেভাবে গাড়ি
পাওয়া যাচ্ছে না। এ সমস্যা থেকে উত্তরণে এখনই দুটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
প্রথমেই প্রয়োজন, বর্তমানে দেশে যেসব
গাড়ির ফিটনেস নেই, সেগুলো সড়ক থেকে প্রত্যাহার করে নেয়া। এরপর জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর
গাড়ি আমদানিকে নিরুৎসাহিত করা। আর এরপর দেশে ইভির প্রসারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া।
বৈদ্যুতিক গাড়ি জনপ্রিয় করতে হলে সব ধরনের ইভিতে
ট্যাক্স ছাড়সহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান
ইভি ব্যবহার করলে তাকে ট্যাক্স বা ভ্যাট ছাড় দেয়া, সরকারি সংস্থার জন্য ইভি গাড়ির ব্যবহার
বাড়ানো, গণপরিবহনে ইভি সংযোজন করা—এ রকম কিছু উদ্যোগ হতে পারে। এছাড়া রেজিস্ট্রেশন ট্যাক্স,
রোড ট্যাক্স, কোম্পানি কার ট্যাক্সে ছাড় দেয়া জরুরি।
পাশাপাশি দেশজুড়ে সর্বাধুনিক চার্জিং
স্টেশন স্থাপনসহ অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ প্রোগ্রামার
ও দক্ষ মেকানিক গড়ে তোলা এবং ইভি সম্পর্কিত
সব ধরনের যন্ত্রাংশ ও সেবা খাতকে পুরোপুরি বিকশিত করার মতো সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ
করতে হবে। বিআরটিএ (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ), আরটিএইচডি (সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক
বিভাগ), স্রেডা (টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ- এসআরইডিএ), আইইইএফএ
(ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল
অ্যানালাইসিস) ও এনবিআর (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড)সহ এ খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত সব পক্ষকে একযোগে আলোচনায় বসতে হবে; সামনের
দিনের করণীয় ঠিক করতে হবে এবং জলবায়ু বিপর্যয় মোকাবেলায় ইভি-বান্ধব নীতি নির্ধারণ ও তা যথাযথভাবে প্রয়োগ
করতে হবে।
গত মাসে এক বাজেট পর্যবেক্ষণ সভায় বাংলাদেশ অটোমোবাইলস অ্যাসেম্বলার
অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বামা) ও বাংলাদেশ ইলেকট্রিক মোবিলিটি অ্যাসোসিয়েশন (বেমা-প্রস্তাবিত) দেশে ইভির প্রসার বাড়াতে
বেশকিছু প্রস্তাব দেয়। এর মধ্যে রয়েছে—বিনিয়োগের
শর্তসাপেক্ষে আগামী দুই বছরের জন্য
সম্পূর্ণ প্রস্তুত (সিবিইউ) গাড়ি আমদানির ওপর সম্পূরক শুল্ক মওকুফ করা, সর্বনিম্ন কাস্টমস
ডিউটি নির্ধারণ করা, পরবর্তী ১০ বছর ইভির প্রোগ্রেসিভ ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের ওপর ভিত্তি
করে কর কাঠামো নির্ধারণ করা, নতুন ইভি রেজিস্ট্রেশন এবং প্রতি বছর গাড়ির ফিটনেস ও ট্যাক্স টোকেন দেয়ার ক্ষেত্রে অ্যাডভান্স
ইনকাম ট্যাক্স মওকুফ করা, ইভিতে ব্যবহৃত লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি ও চার্জিং স্টেশন স্থাপনে
প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ওপর সর্বনিম্ন হারে আমদানি
শুল্ক নির্ধারণ করা ইত্যাদি।
পরিবেশবান্ধব নীতি নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে
সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর একযোগে কাজ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। এতে করে একদিকে যেমন
জলবায়ু বিপর্যয় মোকাবেলা করা সম্ভব
হবে, অন্যদিকে তেমনি দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্প বিকশিত করা সহজ হবে। সরকারি নীতিসহায়তা
পেলে এ খাতে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়বে, ইভির সঙ্গে সম্পর্কিত
সংযোজন শিল্প গড়ে উঠবে এবং নতুন কর্মসংস্থান গড়ে উঠবে। পর্যাপ্ত সহায়তা পেলে এ খাত
অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় হয়ে উঠতে পারে।
ইমতিয়াজ নওশের: হেড, ক্যাটাগরি ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড মার্কেটিং
সিজি রানার বাংলাদেশ লিমিটেড










